শিশুদের ক্যানসারের ৭ লক্ষণ, যেগুলো অবহেলা করা উচিত নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক: শিশুদের শরীরে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অনেক সময় সাধারণ অসুস্থতা ভেবে এড়িয়ে যান অভিভাবকরা। দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অকারণে কালশিটে দাগ, হাড়ে ব্যথা, শরীরে গুটি কিংবা চোখের মণিতে সাদা প্রতিফলন—এসব লক্ষণের কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর রোগের ইঙ্গিত হতে পারে। কোন লক্ষণগুলো খেয়াল রাখবেন এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন, জেনে নিন।
শিশুরা অসুস্থ হলে জ্বর, ক্লান্তি, ব্যথা কিংবা ক্ষুধামন্দার মতো উপসর্গ দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব সমস্যার পেছনে সাধারণ রোগ বা সংক্রমণ থাকতে পারে। তবে কিছু উপসর্গ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকলে সেগুলোকে অবহেলা করা উচিত নয়।
শিশুদের কিছু ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণ অসুস্থতার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। এ কারণে শুরুতে রোগ শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, কোনো একটি লক্ষণ দেখেই ক্যানসার হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরীক্ষা ও মূল্যায়নের মাধ্যমেই রোগের কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব।
শিশুদের ক্যানসারের লক্ষণ সহজে চোখে পড়ে না কেন?
শিশুরা অনেক সময় তাদের শারীরিক সমস্যার কথা স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারে না। আবার ক্লান্তি, পায়ে ব্যথা, জ্বর বা ক্ষুধামন্দার মতো উপসর্গকে অভিভাবকরা স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা কিংবা সাময়িক অসুস্থতার অংশ বলে মনে করতে পারেন।
শিশুদের ক্যানসারের ধরনও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যানসার থেকে আলাদা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এর নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। তাই কোনো একটি লক্ষণের ওপর নির্ভর না করে শিশুর স্বাভাবিক আচরণ, শারীরিক পরিবর্তন এবং উপসর্গ কত দিন ধরে থাকছে, সেদিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের ক্যানসারের ৭টি সম্ভাব্য সতর্কসংকেত
১. অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
শিশু আগের তুলনায় বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়লে, খেলাধুলায় আগ্রহ হারালে কিংবা ত্বক ও ঠোঁট অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে দেখালে বিষয়টি খেয়াল করুন।
লিউকেমিয়াসহ কিছু রোগে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে দুর্বলতা ও ফ্যাকাশে ভাব তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি অকারণে কালশিটে দাগ, ত্বকে ছোট লালচে বিন্দু বা বারবার নাক ও মাড়ি থেকে রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এসব লক্ষণের পেছনে পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য রোগও থাকতে পারে। তাই নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
২. কোনো আঘাত ছাড়াই হাড় বা গিঁটে ব্যথা
শিশুর বেড়ে ওঠার সময় মাঝেমধ্যে পায়ে ব্যথা হতে পারে। তবে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমে বাড়লে, রাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিলে কিংবা শিশুর হাঁটাচলায় সমস্যা তৈরি করলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না।
কিছু ক্ষেত্রে লিউকেমিয়া বা হাড়ের ক্যানসারের সঙ্গে হাড় ও গিঁটে ব্যথার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে আঘাত, সংক্রমণ এবং অন্যান্য সাধারণ সমস্যাতেও এ ধরনের ব্যথা হয়।
শিশু যদি খুঁড়িয়ে হাঁটে, কোনো অঙ্গে ভর দিতে না পারে কিংবা ব্যথার কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
৩. শরীরের কোনো অংশে অস্বাভাবিক গুটি বা ফোলাভাব
শিশুর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া কিংবা গলা, ঘাড় বা বগলে গুটি দেখা দিলে সেটির পরিবর্তন লক্ষ্য করুন। গুটি দীর্ঘদিন থাকলে, আকারে বাড়লে, শক্ত মনে হলে বা সঙ্গে অন্য উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কিছু ক্ষেত্রে উইলমস টিউমার, নিউরোব্লাস্টোমা বা লিম্ফোমার মতো ক্যানসারে অস্বাভাবিক গুটি বা ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। তবে লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া, সংক্রমণসহ বিভিন্ন সাধারণ কারণেও গুটি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে শিশুর পেটে নতুন কোনো গুটি বা অস্বাভাবিক ফোলাভাব দেখা গেলে নিজে থেকে চাপ দিয়ে পরীক্ষা না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
৪. চোখের মণিতে সাদা প্রতিফলন বা নতুন করে টেরা ভাব
শিশুর চোখে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তোলার সময় এক চোখের মণিতে বারবার সাদা প্রতিফলন দেখা গেলে, নতুন করে টেরা ভাব তৈরি হলে কিংবা দৃষ্টিশক্তিতে পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
এ ধরনের কিছু লক্ষণ রেটিনোব্লাস্টোমা নামের বিরল চোখের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে ছবিতে একবার সাদা প্রতিফলন দেখা গেলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। আলোর কোণ বা ছবির পরিস্থিতির কারণেও প্রতিফলন ভিন্ন হতে পারে।
তবু একই ধরনের অস্বাভাবিক প্রতিফলন বারবার দেখা গেলে অপেক্ষা না করে পরীক্ষা করানো উচিত।
৫. বারবার মাথাব্যথা ও বমি
শিশুর মাথাব্যথা বারবার হলে, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথাব্যথার সঙ্গে বমি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এর সঙ্গে হাঁটার সময় ভারসাম্য হারানো, দৃষ্টিতে পরিবর্তন, কথা জড়িয়ে যাওয়া, আচরণে অস্বাভাবিকতা কিংবা শরীরের কোনো অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের টিউমারের কারণে এ ধরনের উপসর্গ হতে পারে। তবে মাইগ্রেন, সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণেও মাথাব্যথা ও বমি দেখা যায়। উপসর্গের ধরন, স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করবেন।
৬. দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অকারণে ওজন কমা ও রাতে অতিরিক্ত ঘাম
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই জ্বর দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, শিশুর ওজন কমতে থাকলে কিংবা রাতে অতিরিক্ত ঘামে পোশাক বা বিছানা ভিজে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে এসব উপসর্গের সঙ্গে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, গুটি, ফ্যাকাশে ভাব বা অকারণে রক্তপাত দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
লিউকেমিয়া ও লিম্ফোমার মতো কিছু ক্যানসারে এসব উপসর্গ দেখা যেতে পারে। তবে যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন সংক্রমণ ও অন্যান্য রোগেও একই ধরনের লক্ষণ হতে পারে। তাই উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।
৭. কান থেকে দীর্ঘদিন তরল পড়া বা রক্তপাত
শিশুর কান থেকে দীর্ঘদিন পানি, পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল পড়লে কিংবা রক্ত দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সাধারণ কানের সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে।
চিকিৎসা নেওয়ার পরও সমস্যা না কমলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা কানে ব্যথা, শ্রবণশক্তির পরিবর্তন বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
কান থেকে তরল পড়া শিশুদের ক্যানসারের কোনো সাধারণ বা নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা রক্তমিশ্রিত স্রাবের কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেবেন?
শিশুর শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে লক্ষণটি কত দিন ধরে রয়েছে এবং তা বাড়ছে কি না, সেদিকে নজর দিন। নিচের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:
-
শরীরে গুটি বা ফোলাভাব দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে কিংবা আকারে বাড়লে।
-
কোনো আঘাত ছাড়াই হাড়ে ব্যথা হলে বা শিশু খুঁড়িয়ে হাঁটলে।
-
দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা অকারণে ওজন কমতে থাকলে।
-
অকারণে কালশিটে দাগ, ত্বকে ছোট লালচে বিন্দু বা বারবার রক্তপাত হলে।
-
চোখের মণিতে বারবার সাদা প্রতিফলন বা নতুন করে টেরা ভাব দেখা দিলে।
-
বারবার মাথাব্যথার সঙ্গে বমি হলে।
-
কান থেকে দীর্ঘদিন তরল পড়লে বা রক্তপাত হলে।
শিশুর হঠাৎ খিঁচুনি, চেতনা কমে যাওয়া, শরীরের একপাশ দুর্বল হয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো গুরুতর আকস্মিক উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন।
শিশুদের ক্যানসার কি চিকিৎসায় ভালো হতে পারে?
শিশুদের ক্যানসারের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন, পর্যায়, শিশুর বয়স এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর। অনেক ধরনের শিশু ক্যানসারের ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সব ক্যানসারের ফলাফল এক নয়।
তাই লক্ষণ দেখে নিজে থেকে ক্যানসার ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী বা বাড়তে থাকা উপসর্গকে অবহেলা করাও উচিত নয়। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা, ইমেজিং বা অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন।
আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
শিশুদের শরীরে অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে—এমন নয়। অনেক সাধারণ রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। তবে কোনো লক্ষণ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে বা সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সন্তানের স্বাভাবিক আচরণ ও শারীরিক পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা, প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভয় নয়, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসাই শিশুর সুস্থতার পথে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সিদ্দিকা/
