নতুন পে-স্কেলের হিসাব শুরু কাল, আইবাস++-এ পে ফিক্সেশন যেভাবে করবেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের (পে ফিক্সেশন) কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আগামীকাল সোমবার (৫ অক্টোবর)। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
নতুন কাঠামোয় কার মূল বেতন কত হবে এবং বকেয়া হিসেবে কত টাকা পাবেন, তা নির্ধারণ হবে পে ফিক্সেশনের মাধ্যমে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে আইবাস++-এর নির্ধারিত ব্যবস্থায় সম্পন্ন করতে হবে।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে প্রায় তিন মাসের বকেয়া পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সবার বকেয়ার পরিমাণ এক হবে না। নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্য, বেতন কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর গ্রেডসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বকেয়ার পরিমাণ নির্ভর করবে।
আইবাস++-এ কীভাবে প্রবেশ করবেন
নবম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অনলাইনে বেতন নির্ধারণের এই প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে অনলাইনে বেতন নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে।
পদমর্যাদা অনুযায়ী আইবাস++-এ প্রবেশের পদ্ধতিও আলাদা।
গেজেটেড কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যবহারকারী পরিচয় ও গোপন সংকেত ব্যবহার করে সরাসরি সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারবেন।
অন্যদিকে নন-গেজেটেড কর্মচারীরা জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে সিস্টেমে প্রবেশ করবেন। এ সময় নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে একবার ব্যবহারযোগ্য সংকেত বা OTP পাঠানো হবে। সেটি ব্যবহার করে লগইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
বিদেশে অবস্থানরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত ই-মেইল ঠিকানায়ও একবার ব্যবহারযোগ্য সংকেত পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তাদের পে ফিক্সেশনের আগে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
পে ফিক্সেশন যেভাবে করবেন
আইবাস++-এর নির্ধারিত পে ফিক্সেশন অপশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার আগে সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত নতুন মূল বেতনের পরিমাণ দেখা যাবে।
তথ্য যাচাই করে আবেদন জমা দেওয়ার পর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি খুদে বার্তা পাঠানো হবে। এরপর দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট বেতন ও হিসাব পরিশোধ কর্মকর্তার কাছে যাবে।
গেজেটেড কর্মকর্তাদের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে পাঠাবেন। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে চাকরির নথিতে থাকা আগের চাকরি ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যাচাই করবেন।
হিসাবরক্ষণ কার্যালয় দেবে চূড়ান্ত অনুমোদন
দেওয়া তথ্য সঠিক থাকলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় অনলাইনে তা যাচাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি বিশেষ যাচাই নম্বর তৈরি হবে।
এর ফলে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার আলাদা হাতে লেখা বা প্রচলিত স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে না। অনলাইন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর চাকরির নথিতে যাচাই নম্বর ও নির্ধারিত নতুন বেতন লিপিবদ্ধ করা হবে। এরপর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেখানে স্বাক্ষর করবেন।
যেসব তথ্য দিতে হবে, সতর্ক থাকুন
পে ফিক্সেশনের সময় চাকরিজীবীদের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, বর্তমান পদ, গ্রেড, বর্তমান মূল বেতনসহ বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে। পাশাপাশি পদোন্নতি, বদলি, সময় স্কেল, বাছাই গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেডের তথ্যও প্রয়োজন হবে।
এসব তথ্যের পক্ষে থাকা অফিস আদেশ ও প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখা উচিত। বিশেষ করে নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে দেখতে হবে।
কোনো তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ থাকলে বেতন নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। শুধু অনলাইনে তথ্য পূরণ করলেই প্রক্রিয়া শেষ হবে না। আগের চাকরির ইতিহাস ও বেতন নির্ধারণের তথ্যের সঙ্গে নতুন দেওয়া তথ্যের সামঞ্জস্যও যাচাই করা হবে।
বেতন ও বকেয়া হিসাব হবে যেভাবে
৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে মূল বেতন ছিল, সেটিকে ভিত্তি ধরে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণ করা হবে।
নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেওয়া হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ওই পার্থক্যের ৭০ শতাংশ কার্যকর হবে।
২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পুরো নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। নতুন কাঠামোর ভাতা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
নতুন বেতন নির্ধারণ চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বেতন বিল তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে বকেয়া পাওনার হিসাবও চূড়ান্ত হবে। এরপর অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে প্রায় তিন মাসের বকেয়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
নতুন বেতনকাঠামোয় সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ১১ বছর পর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে নতুন বেতন ও ভাতা কার্যকর হবে। চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ দেওয়ার জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
উচ্চতর গ্রেডেও থাকছে নতুন হিসাব
নতুন বেতন আদেশ অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর চাকরি করলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে আগের বেতনকাঠামোয় সময় স্কেল, বাছাই গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগের কাঠামোয় একই পদে দুই বা ততোধিক বাছাই গ্রেড, সময় স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন কাঠামোয় ওই পদে আর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত একই পদে মাত্র একটি উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাওয়া থাকলে পরবর্তী ছয় বছর পূর্তির পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে।
এ কারণে পে ফিক্সেশনের সময় বর্তমান বেতনের পাশাপাশি আগের পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড এবং বেতন নির্ধারণের ইতিহাসও সঠিকভাবে যাচাই করা জরুরি।
হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ
নতুন বেতনকাঠামোর বেতন নির্ধারণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অর্থ বিভাগের ‘সেবা দেওয়া সক্ষম করতে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ কর্মসূচি’র আওতায় আইবাস++ এই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং দ্রুত সবার বেতন নির্ধারণ নিশ্চিত করতেই পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল করা হয়েছে।
তবে পে ফিক্সেশনের সময় ভুল তথ্য দিলে পরবর্তী সময়ে সংশোধন বা জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি তথ্য ও নথি ভালোভাবে যাচাই করার পর আবেদন জমা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আশা/
