ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টিপসই, পরে জানলেন বিয়ে হয়েছে!
নিজস্ব প্রতিবেদক: ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে এক বিধবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি ও টিপসই নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে ওই নারীর নামে বিয়ের কাবিননামা ছড়িয়ে পড়লে তিনি জানতে পারেন, তাঁর বিয়ে হয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। তবে তাঁর দাবি, তিনি কোনো বিয়েতে সম্মতি দেননি এবং কোনো কাজির সামনেও উপস্থিত হননি।
সম্প্রতি ফুলবাড়িয়া উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া আবদুস ছাত্তার কৌশলে তাঁর টিপসই নেন। পরে সেই টিপসই ব্যবহার করে জাল কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় বর হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুসের নাম উল্লেখ রয়েছে। ভুক্তভোগী নারীর দাবি, কুদ্দুস বিভিন্ন সময়ে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেও তিনি কখনো রাজি হননি। কুদ্দুসের স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনি রয়েছে।
প্রায় ১৩ বছর আগে ওই নারীর স্বামী মারা যান। এরপর মানুষের জমিতে কাজ করে দুই ছেলেকে বড় করেন এবং তাঁদের বিয়ে দেন। বর্তমানে তাঁর নাতি-নাতনিও রয়েছে।
নিজের বাড়িতে কথা বলার সময় ওই নারী বলেন, তিনি কোথাও বিয়ে করতে যাননি এবং কোনো কাজিকেও দেখেননি। তাঁর অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে নেওয়া টিপসই ব্যবহার করেই তাঁর নামে বিয়ের কাগজ তৈরি করা হয়েছে।
অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে ওই নারীর কাছ থেকে তিনি কোনো টিপসই নেননি। জমিজমা নিয়ে বিরোধের কারণে তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক বলেন, বিষয়টি জানার পর স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, আবদুস ছাত্তার জামায়াতের পদধারী নেতা নন; গত নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন। আগে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও জানান ফজলুল হক।
তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত। তবে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আবদুল কুদ্দুসের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন জানান, তাঁর স্বামী আগে কখনো তাঁকে বিয়ের বিষয়ে কিছু বলেননি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তাঁর স্বামী ‘কোর্ট ম্যারেজ’ করেছেন বলে দাবি করেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি কারও কথা শোনেননি বলে জানান সুফিয়া খাতুন।
প্রচারিত কাবিননামায় বিয়ের কাজি হিসেবে গোলাম মোস্তফার নাম উল্লেখ রয়েছে। সেখানে দেনমোহর আড়াই লাখ টাকা এবং ৫০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা লেখা আছে। সাক্ষী হিসেবে আবদুল মান্নান ও সাইফুল ইসলামের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি কোনো বিয়ের সাক্ষী হননি।
কাজি গোলাম মোস্তফা বলেন, তিনি এই বিয়ে সম্পন্ন করেননি। তাঁর দাবি, ছড়িয়ে পড়া কাগজটি সম্পূর্ণ জাল। এর আগে ২০২০ সালেও তাঁর নামে এমন একটি জাল কাগজ তৈরি করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। ওই ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। এবার কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
ঘটনাটি নিয়ে গত সোমবার ও বুধবার গ্রামে দুই দফা সালিস বৈঠক হয়েছে। তবে বৈঠকে অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার ও আবদুল কুদ্দুস উপস্থিত ছিলেন না। তাঁদের শুক্রবার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এরপরও আবদুস ছাত্তার নিজের অবস্থান স্পষ্ট না করলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সালিসে নেতৃত্ব দেওয়া মোহাম্মদ রুস্তম আলী।
তিনি বলেন, কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে, তা যাচাই করা হচ্ছে। সালিসের মাধ্যমে সমাধান না হলে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।
ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান বলেন, ঘটনাটি তাঁরা বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সোহাগ/
