কোন এলাকায় কোন বিষধর সাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের গ্রাম, কৃষিজমি, জলাভূমি, বন, পাহাড় ও ম্যানগ্রোভসহ বিভিন্ন পরিবেশে সাপের বসবাস রয়েছে। তবে দেশের সব অঞ্চলে একই ধরনের বিষধর সাপ দেখা যায় না। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির সাপ বেশি পাওয়া যায়, তা জানা থাকলে সাপের কামড়ের ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া এবং দ্রুত চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় এমনই এক ঘটনার মুখোমুখি হন চা-বাগান শ্রমিক অর্জুন চাষা। গত ১১ সেপ্টেম্বর সকালে কোদালার একটি বাগানে চা-পাতা তুলছিলেন তিনি। হঠাৎ পায়ে কিছু একটা কামড়ানোর অনুভূতি হলে নিচে তাকিয়ে একটি সাপ দেখতে পান। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সাপটির রং ছিল পাতার মতো সবুজ।
সাপের কামড়ের প্রায় ১৫ মিনিট পর পায়ে ব্যথা শুরু হয়। দ্রুত তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকদের কাছে সাপটির রং ও আকৃতির বর্ণনা দেন অর্জুন। তাঁর দেওয়া তথ্য এবং কামড়ের পর দেখা দেওয়া উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসকেরা সাপটিকে পিট ভাইপার হিসেবে শনাক্ত করেন। পরে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান ৩০ বছর বয়সী অর্জুন।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল অনেক ক্ষেত্রেই একে অপরের কাছাকাছি। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে সাপের উপস্থিতি থাকায় অঞ্চলভেদে বিষধর সাপের ধরন সম্পর্কে ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে কত প্রজাতির সাপ আছে
দেশের সাপের প্রজাতির তালিকা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন প্রজাতির তথ্য সামনে আসা এবং পুরোনো তথ্য নতুন করে যাচাইয়ের কারণে এ তালিকায়ও পরিবর্তন এসেছে।
২০২৫ সালের ‘রিভিজিটিং দ্য স্নেকস অব বাংলাদেশ: এ সিস্টেমেটিক রিভিউ অব স্পিসিজ ডাইভারসিটি অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন প্যাটার্নস’ শীর্ষক গবেষণায় বাংলাদেশে ৮৯টি সাপের প্রজাতির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি বিষধর এবং ৬২টি নির্বিষ প্রজাতি।
গবেষণায় গত পাঁচ দশকের বিভিন্ন তথ্য ও সাপ দেখার রেকর্ড বিশ্লেষণ করা হয়। এতে তিনটি প্রজাতিকে বাংলাদেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত বলে মনে করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে আরও ১৬টি প্রজাতিকে দেশের সাপের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৭ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং ৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ২৭টি বিষধর প্রজাতির মধ্যে আটটি প্রজাতিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কোন এলাকায় কোন বিষধর সাপ পাওয়া যায়
২০২৩ সালের ‘ইমপ্লিমেন্টেশন অব ইকোলজিক্যাল ডিস্ট্রিবিউশন অব ভেনোমাস স্নেকস ফর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব স্নেকবাইট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের সব অঞ্চলে বিষধর সাপের বিস্তার একরকম নয়। কৃষিজমি, বসতি, বন, জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভের মতো পরিবেশের সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বিস্তারের সম্পর্ক রয়েছে।
পাতি কালাচ বা কমন ক্রেইট
পাতি কালাচ দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই পাওয়া যায়। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকায় এর উপস্থিতি তুলনামূলক কম। গ্রামাঞ্চলের বসতি এলাকায় এ সাপ দেখা যায় এবং এটি মূলত স্থলভূমিতে বসবাস করে।
ছোট কৃষ্ণ কালাচ বা লেসার ব্ল্যাক ক্রেইট
দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট কৃষ্ণ কালাচ পাওয়া যায়। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটের মিশ্র চিরহরিৎ বন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এ সাপের উপস্থিতির রেকর্ড নেই। সমতলের স্থলভূমির সঙ্গে এ প্রজাতির বসবাসের সম্পর্ক বেশি।
বড় কৃষ্ণ কালাচ বা গ্রেটার ব্ল্যাক ক্রেইট
বড় কৃষ্ণ কালাচের বিস্তার তুলনামূলকভাবে সীমিত। চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মিশ্র চিরহরিৎ বন এবং সুন্দরবনে এ সাপ পাওয়া যায়।
সিন্ধু কালাচ বা ওয়ালস ক্রেইট
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন এলাকায় সিন্ধু কালাচের দেখা মেলে। এ সাপ মূলত সমতলের স্থলভূমিতে বসবাস করে।
পদ্ম গোখরা বা কেউটে
পদ্ম গোখরা বা কেউটে দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই রয়েছে। তবে রাজশাহী অঞ্চলে এর উপস্থিতি তুলনামূলক কম। কৃষিজমি, জলাভূমি ও মানুষের বসতিপূর্ণ এলাকা, বিভিন্ন পরিবেশেই এ সাপ দেখা যায়।
খৈয়া গোখরা বা স্পেকট্যাকলড কোবরা
খৈয়া গোখরাও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া যায়। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটে এর উপস্থিতি তুলনামূলক কম। সমতলের স্থলভূমি, কৃষিজমি ও গ্রামীণ এলাকায় এদের বেশি দেখা যায়।
চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার
রাসেলস ভাইপারের বিস্তার তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে বেশি। রাজশাহী বিভাগের বেশিরভাগ এলাকায় এ সাপের উপস্থিতি রয়েছে। তবে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ এর ব্যতিক্রম।
এ ছাড়া কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় রাসেলস ভাইপার পাওয়া যায়। বরিশাল বিভাগের কিছু এলাকাতেও এর উপস্থিতি রয়েছে।
ঘাসে ঢাকা সমতল এলাকা, ফসলের জমি, নদীর তীর এবং বাড়ির আশপাশের জায়গা রাসেলস ভাইপারের পছন্দের আবাসস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দাগি লেজি সবুজ বোড়া বা স্পট-টেইলড পিট ভাইপার
এই প্রজাতির সাপ মূলত চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মিশ্র চিরহরিৎ বন এবং সুন্দরবনে পাওয়া যায়।
কেন জানা জরুরি কোন এলাকায় কোন সাপ থাকে
সাপের বিস্তার ও আবাসস্থল সম্পর্কে ধারণা থাকলে কোন এলাকায় সাপের কামড়ের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, তা বোঝা সহজ হয়। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতা বাড়ানো, হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা এবং সাপে কাটার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতেও এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ইব্রাহিম খলিল আল হায়দার বলেন, সাপে কাটার সন্দেহ হলেই দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ বিষধর সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
তিনি জানান, বিষধর সাপের কামড়ে সবসময় সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা নাও হতে পারে। যেমন কেউটে কামড়ানোর পর শুরুতে তেমন ব্যথা অনুভূত নাও হতে পারে এবং অনেক সময় মশার কামড়ের মতো মনে হতে পারে।
অন্যদিকে ভাইপারের কামড়ে সাধারণত দ্রুত ব্যথা ও ফোলা দেখা দেয়। তবে শুধু ব্যথা বা ফোলা হয়েছে কি না, তা দেখে সাপটি বিষধর কি না নিশ্চিত হওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, মানুষের আশপাশে থাকা প্রতিটি সাপ চেনার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের এলাকায় কোন কোন বিষধর সাপ পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এতে সাপের কামড়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা যায় এবং কেউ সাপে কাটলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাপে কাটার পর সাপটি শনাক্ত করার জন্য সময় নষ্ট না করে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া।
সোহাগ/
