নতুন পে স্কেলে নিজের বেতন যেভাবে হিসাব করবেন
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। এতে ২০টি গ্রেডের নতুন বেতনক্রমের পাশাপাশি পুরোনো বেতন থেকে নতুন মূল বেতন নির্ধারণের নিয়মও স্পষ্ট করা হয়েছে।
নতুন স্কেলে গ্রেডভেদে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গ্রেড ১ থেকে ১১ পর্যন্ত প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ শতাংশ এবং গ্রেড ১২ থেকে ২০ পর্যন্ত ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সিনিয়র সচিবদের জন্য আলাদা নির্ধারিত মূল বেতন রাখা হয়েছে।
শুধু গ্রেড জানলেই নতুন বেতন জানা যাবে না
নতুন স্কেলে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মূল বেতন কত হবে, তা জানতে শুধু তাঁর বর্তমান গ্রেড জানলেই হবে না। ২০২৬ সালের ৩০ জুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী তাঁর মূল বেতন কত ছিল, সেটিও জানতে হবে।
কারণ একই গ্রেডে থাকা দুজন কর্মচারীর মূল বেতন এক নাও হতে পারে। একজন কয়েক বছর চাকরি করে একাধিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে বেশি বেতন পেতে পারেন, আবার একই গ্রেডে সদ্য যোগ দেওয়া কর্মচারীর বেতন হতে পারে তুলনামূলক কম।
তাই নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
- ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বর্তমান মূল বেতন
- সংশ্লিষ্ট গ্রেড
- নতুন বেতন স্কেলে ওই গ্রেডের বেতনক্রম
এরপর প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত পে ফিক্সেশন বা বেতন নির্ধারণের নিয়ম অনুসারে নতুন মূল বেতন ঠিক হবে।
যেভাবে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ হবে
নতুন প্রজ্ঞাপনে মূলত দুটি পদ্ধতিতে পে ফিক্সেশনের নিয়ম রাখা হয়েছে।
প্রথম পদ্ধতি: পুরোনো স্কেলের শুরুতে বেতন থাকলে
কোনো কর্মচারী যদি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর বর্তমান বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে মূল বেতন পান, তাহলে নতুন স্কেলেও সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে তাঁর বেতন নির্ধারণ করা হবে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মচারী যদি ৩০ জুন ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২২ হাজার ৪৯০ টাকা বেতনক্রমের প্রারম্ভিক ধাপ অর্থাৎ ৯ হাজার ৩০০ টাকা মূল বেতন পেয়ে থাকেন এবং তিনি ১৬তম গ্রেডের হন, তাহলে ১ জুলাই থেকে তাঁর নতুন মূল বেতন হবে ২১ হাজার ৯০০ টাকা।
কারণ নতুন বেতন স্কেলে ১৬তম গ্রেডের বেতনক্রম ২১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা।
অর্থাৎ পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে থাকা কর্মচারী নতুন স্কেলেও সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে যাবেন।
দ্বিতীয় পদ্ধতি: বর্তমান বেতন প্রারম্ভিক ধাপের চেয়ে বেশি হলে
কোনো কর্মচারীর ৩০ জুনের মূল বেতন যদি পুরোনো বেতনক্রমের প্রারম্ভিক বেতনের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে প্রথমে তাঁর বর্তমান মূল বেতন ও পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের পার্থক্য বের করতে হবে।
এরপর সেই পার্থক্য নতুন বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করতে হবে।
যোগফল যদি নতুন বেতনক্রমের কোনো নির্ধারিত ধাপের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে সেটিই নতুন মূল বেতন হবে। আর যোগফল যদি নির্ধারিত কোনো ধাপের সঙ্গে না মেলে, তাহলে তার পরবর্তী উচ্চতর ধাপকে নতুন মূল বেতন হিসেবে নিতে হবে।
একটি উদাহরণে বুঝুন
ধরা যাক, ৩০ জুন একজন কর্মচারীর ইনক্রিমেন্টসহ মূল বেতন ছিল ১৩ হাজার ৭৯০ টাকা। তাঁর পুরোনো বেতনক্রম ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার ২৩০ টাকা পর্যন্ত।
১ জুলাই থেকে তাঁর জন্য প্রযোজ্য নতুন বেতনক্রম ২৫ হাজার টাকা থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা।
প্রথমে পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন থেকে বর্তমান বেতনের পার্থক্য বের করতে হবে।
১৩,৭৯০ - ১২,৫০০ = ১,২৯০ টাকা
এরপর নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন ২৫ হাজার টাকার সঙ্গে ১ হাজার ২৯০ টাকা যোগ করতে হবে।
২৫,০০০ + ১,২৯০ = ২৬,২৯০ টাকা
কিন্তু নতুন বেতনক্রমে ২৬ হাজার ২৯০ টাকা কোনো নির্ধারিত ধাপ নয়। তাই পরবর্তী উচ্চতর ধাপ হিসেবে তাঁর নতুন মূল বেতন হবে ২৬ হাজার ৩০০ টাকা।
এভাবেই ৩০ জুনের মূল বেতন থেকে নতুন স্কেলে পে ফিক্সেশন করতে হবে।
যাঁদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। সিনিয়র সচিবের মূল বেতন ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
এ ছাড়া গ্রেড-১-এর মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সমমর্যাদার নির্ধারিত পদগুলোর ক্ষেত্রেও আলাদা মূল বেতন রয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে সাধারণ দুই পদ্ধতির পে ফিক্সেশন নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
নতুন বেতন একবারে পুরোটা কার্যকর হচ্ছে না
নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হলেও বর্ধিত বেতনের পুরো অংশ একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। ধাপে ধাপে নতুন বেতন বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী:
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত
- নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন
- ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন
১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত
- নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত বেতনের ৭০ শতাংশ পাবেন
- ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতনের ৭৫ শতাংশ পাবেন
১ জুলাই ২০২৭ থেকে
নতুন বেতন কাঠামোয় নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধির ১০০ শতাংশ কার্যকর হবে।
নতুন স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ায় বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রাপ্য বকেয়া বেতনও পাবেন।
প্রেষণ ও ছুটিতে থাকলে কী হবে?
নিজ দপ্তরের বাইরে অন্য দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও নতুন বেতন নির্ধারণের নিয়ম রাখা হয়েছে।
প্রেষণে না থাকলে নিজ মূল দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে যে বেতন পাওয়ার অধিকারী হতেন, সেই ভিত্তিতেই তাঁর নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে।
এ ছাড়া ছুটিতে থাকা, সাময়িক বরখাস্ত থাকা এবং অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের জন্যও আলাদা বিধান রাখা হয়েছে।
তবে কোনো কর্মচারীর অবসর-উত্তর ছুটি ৩০ জুন শেষ হয়ে ১ জুলাই অবসর কার্যকর হলে তিনি ১ জুলাই থেকে কার্যকর জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী নতুন বেতন নির্ধারণের সুবিধা পাবেন না।
একই পদে ৮ বছর পূর্ণ হলে উচ্চতর গ্রেড
নতুন বেতন কাঠামোয় পদোন্নতি ছাড়াই একই পদে দীর্ঘদিন কাজ করা কর্মচারীদের জন্যও বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং তাঁর চাকরি সন্তোষজনক হলে নবম বছরে তাঁর পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে এভাবে উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়া পদোন্নতি হিসেবে গণ্য হবে না।
নিজের নতুন বেতন জানতে যা লাগবে
নতুন বেতন স্কেলে নিজের মূল বেতন নির্ধারণ করতে শুধু গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন দেখলে হবে না। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে নিজের মূল বেতন কত ছিল, পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন কত এবং নতুন স্কেলে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের বেতনক্রম কী, এই তথ্যগুলো মিলিয়ে হিসাব করতে হবে।
অর্থাৎ নতুন পে স্কেলে গ্রেড + ৩০ জুনের মূল বেতন + পে ফিক্সেশন নিয়ম অনুসরণ করেই প্রকৃত নতুন মূল বেতন নির্ধারণ হবে।
