নস্টালজিয়া জাগাবে ৯০ ও ২০০০ দশকের ৪ ফ্লিপ ফোন
নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় মোবাইল ফোন মানেই ছিল কল করা, ছোট বার্তা পাঠানো আর পকেটে রাখা যায়—এমন একটি সহজ যোগাযোগের মাধ্যম। স্মার্টফোনের উন্নত ক্যামেরা, বড় ডিসপ্লে ও অসংখ্য অ্যাপের যুগে সেই পুরোনো ফোনগুলোর ব্যবহার কমে গেলেও অনেকের কাছে সেগুলো এখনো নস্টালজিয়ার অংশ। বিশেষ করে ফোনের ঢাকনা বন্ধ করে কল শেষ করার আলাদা অনুভূতি আজও অনেকের মনে আছে।
বর্তমানে ফোল্ডেবল স্মার্টফোন নতুন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে আধুনিক ফোল্ডেবল ফোন আর নব্বইয়ের দশক কিংবা ২০০০ সালের শুরুর দিকের ফ্লিপ ফোন এক নয়। তখনকার ফোনগুলোতে ছিল ছোট ডিসপ্লে, সীমিত মেমোরি, সাধারণ ক্যামেরা এবং বোতামচালিত কিপ্যাড। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও নকশা ও ব্যবহারের ধরনে ফোনগুলো তৈরি করেছিল আলাদা পরিচিতি।
প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট স্ল্যাশগিয়ারের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চারটি পুরোনো ফ্লিপ ফোনের কথা, যেগুলো মোবাইল ফোনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
১. LG VX-6000: ক্যামেরা ফোনের শুরুর দিকের একটি নাম
২০০০ সালের শুরুর দিকে ক্যামেরাসহ মোবাইল ফোন ছিল নতুন প্রযুক্তির আকর্ষণ। LG VX-6000 ছিল সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য একটি মডেল। ফোনটি যুক্তরাষ্ট্রে Verizon Wireless-এর গ্রাহকদের জন্য বাজারে আনা হয়েছিল।
ফোনটিতে ছিল ০.৩ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা। এতে সর্বোচ্চ ২০টি ছবি সংরক্ষণ করা যেত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান স্মার্টফোনের ক্যামেরার সঙ্গে তুলনা করলে ছবির মান খুবই সীমিত মনে হতে পারে, তবে তখন মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তোলার সুযোগই ছিল বড় আকর্ষণ।
নীল ও রুপালি রঙের নকশার এই ফোনে বাইরের দিকে ছোট ডিসপ্লে ছিল। সেখানে নেটওয়ার্ক সিগন্যাল, ব্যাটারির অবস্থা ও কলদাতার তথ্য দেখা যেত। ফোন খুললে পাওয়া যেত ছয় লাইনের রঙিন ডিসপ্লে।
এ ছাড়া এতে ছিল এসএমএস, ফোনবুক, অ্যালার্ম, ক্যালেন্ডার, ক্যালকুলেটর এবং ৩১টি রিংটোনের সুবিধা। অর্থাৎ স্মার্টফোনের আগের যুগেও সাধারণ যোগাযোগের পাশাপাশি বেশ কিছু প্রয়োজনীয় ফিচার ব্যবহার করা যেত।
২. Motorola Razr V3: স্টাইলিশ ডিজাইনে বদলে দিয়েছিল ফোনের ধারণা
২০০৪ সালে বাজারে আসা Motorola Razr V3 ছিল ফ্লিপ ফোনের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত মডেল। পাতলা গড়ন, ধাতব রঙের নকশা এবং ব্যতিক্রমী কিপ্যাডের কারণে ফোনটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।
এর ফ্ল্যাট কিপ্যাড অন্ধকারেও আলো ছড়াত। বাইরের ডিসপ্লেটিও ছিল তুলনামূলক সমতল এবং কাচ দিয়ে সুরক্ষিত। সে সময়ের অনেক ফোনের তুলনায় এর নকশা ছিল আধুনিক ও আকর্ষণীয়।
Razr V3 দিয়ে ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করা যেত। তবে এতে আলাদা সেলফি ক্যামেরা ছিল না। ফোনটিতে কলের ইতিহাস সংরক্ষণ, এসএমএস পাঠানো, ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং, গেম ডাউনলোড এবং এমপি৩ রিংটোন ব্যবহারের সুবিধাও ছিল।
স্ল্যাশগিয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে আসার সময় ফোনটির দাম ছিল প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার। পরে দাম কমলেও মডেলটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মূল Razr V3-এর বিক্রি ১০ কোটির বেশি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান সময়েও Motorola Razr নামে ফোল্ডেবল ফোন বাজারজাত করে। তবে সেগুলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্টফোন, পুরোনো Razr V3-এর মতো সাধারণ ফিচার ফোন নয়।
৩. Ericsson T28: পাতলা নকশা ও নিজস্ব রিংটোন তৈরির সুবিধা
১৯৯৯ সালে বাজারে আসা Ericsson T28 ছিল সে সময়ের পাতলা ও হালকা মোবাইল ফোনগুলোর একটি। তখনকার অনেক ফোন দেখতে বড় ও ভারী হলেও T28-এর বাঁকানো নকশা একে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল।
ফোনটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল পাশের একটি বোতাম চাপলে সামনের ঢাকনা খুলে যাওয়ার ব্যবস্থা। ঢাকনাটি বন্ধ অবস্থায় কিপ্যাড ঢেকে রাখত। এতে এসএমএস পাঠানো ও গ্রহণের পাশাপাশি গেম খেলার সুবিধাও ছিল।
আরেকটি আকর্ষণীয় ফিচার ছিল নিজের রিংটোন তৈরির সুযোগ। ফোনের My Melody মেনু ব্যবহার করে ব্যবহারকারীরা নিজস্ব সুর তৈরি করতে পারতেন। তখনকার সময়ে এই সুবিধা ছিল বেশ ব্যতিক্রমী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, Ericsson T28-এ প্রথম দিককার লিথিয়াম-পলিমার ব্যাটারি প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল, যা ফোনের নকশা তুলনামূলক পাতলা রাখতে সহায়তা করেছিল।
৪. Motorola StarTAC: পকেটে রাখা যায় এমন ফ্লিপ ফোনের পথিকৃৎ
১৯৯৬ সালে বাজারে আসা Motorola StarTAC মোবাইল ফোনের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। এটিকে বিশ্বের প্রথম পকেটে রাখা যায় এমন ক্ল্যামশেল বা ফ্লিপ ফোনগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফোনটি বাজারে আনার সময় Motorola একে ‘ওয়্যারেবল সেলুলার টেলিফোন’ হিসেবে প্রচার করেছিল। ছোট আকার, ভাঁজ করা যায় এমন নকশা এবং সহজে বহন করার সুবিধা একে সে সময়ের ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।
StarTAC-এর নিচের অংশে ছিল কিপ্যাড ও মাইক্রোফোন। ফোন খুললে ওপরের অংশে থাকা ইয়ারপিস কানে ব্যবহারের উপযোগী অবস্থানে চলে আসত। এতে ছিল ছোট একরঙা ডিসপ্লে, ১২ বোতামের কিপ্যাড এবং অ্যান্টেনা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, StarTAC ছিল কম্পন বা ভাইব্রেশন মোড সুবিধা দেওয়া প্রথম দিককার ফোনগুলোর একটি। প্রথম সংস্করণে কথা বলার সময় ছিল প্রায় ৬০ মিনিট, যা বর্তমান ফোনের তুলনায় খুবই কম।
ফোনটির প্রাথমিক দাম ছিল প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার। পরে Motorola এর বিভিন্ন সংস্করণ বাজারে আনে। ২০০৭ সালে StarTAC III-এর পর এই সিরিজের পথচলা থেমে যায়।
পুরোনো ফ্লিপ ফোনের প্রতি এত আগ্রহ কেন?
পুরোনো ফ্লিপ ফোনের আকর্ষণ শুধু স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছোট আকার, সহজে বহন করার সুবিধা, বোতামচালিত কিপ্যাড এবং সীমিত ফিচারের কারণে এসব ফোনের ব্যবহার ছিল তুলনামূলক সরল। বিশেষ করে ফোন বন্ধ করে কল শেষ করার অনুভূতি আধুনিক টাচস্ক্রিন ফোনে পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, বর্তমান ফোল্ডেবল স্মার্টফোনে বড় ও উন্নত ডিসপ্লে, শক্তিশালী প্রসেসর, উন্নত ক্যামেরা এবং নানা অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। ফলে পুরোনো ফ্লিপ ফোন ও আধুনিক ফোল্ডেবল ফোনের মধ্যে নকশাগত মিল থাকলেও প্রযুক্তিগত পার্থক্য অনেক।
সব মিলিয়ে Motorola StarTAC, Ericsson T28, LG VX-6000 ও Motorola Razr V3 শুধু পুরোনো মোবাইল ফোন নয়; এগুলো মোবাইল প্রযুক্তির পরিবর্তনের বিভিন্ন ধাপের স্মারক। আজকের স্মার্টফোনের উন্নত ফিচার উপভোগ করার পাশাপাশি এসব ফোনের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, অল্প কিছু সুবিধা নিয়েও একসময় মোবাইল প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছিল।
সিদ্দিকা/
