বাংলাদেশিদের জন্য সৌদি এক গজবের নাম
নিজস্ব প্রতিবেদক: সৌদি আরবে ভ্রমণের সময় ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হাতে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশি ভ্রমণকারী কাজী আসমা আজমেরী। তাঁর দাবি, দেশটিতে কয়েকবার ভ্রমণের সময় তাঁকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি সীমান্তে তল্লাশির সময় শারীরিক ও যৌন হয়রানির চেষ্টাও করা হয়েছিল বলে অভিযোগ তাঁর। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
সৌদি আরব নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কাজী আসমা আজমেরী বলেছেন, দেশটির বিভিন্ন জায়গায় তাঁর অভিজ্ঞতা এক রকম ছিল না। কিছু তরুণ সৌদি নাগরিকের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন, আবার কিছু কর্মকর্তা ও বয়স্ক ব্যক্তির আচরণ তাঁর কাছে অপমানজনক মনে হয়েছে।
জাগোনিউজ২৪-এ প্রকাশিত তাঁর বক্তব্যে সৌদি আরবে ভ্রমণের সময়কার বিভিন্ন ঘটনা উঠে এসেছে। তবে তাঁর অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
কাজী আসমা আজমেরীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জর্ডান থেকে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। প্রথমে আকাবা হয়ে তাবুক যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও যাতায়াতের উপযুক্ত ব্যবস্থা না পাওয়ায় তাঁকে আম্মানে ফিরতে হয়। পরে আম্মান থেকে রিয়াদগামী বাসে যাত্রা করেন।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সীমান্তে পৌঁছানোর পর প্রাথমিক ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষ হলেও ব্যাগ তল্লাশির সময় সমস্যায় পড়েন তিনি। অস্ট্রেলিয়া থেকে কেনা প্রসাধনসামগ্রীতে অ্যালকোহল থাকার কারণে তাঁকে জরিমানা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুটি বোতলের জন্য মোট ৬০০ ডলার জরিমানার কথা বলা হয়।
এ সময় একজন বাংলাদেশিকে অনুবাদের জন্য ডেকে আনা হলেও তিনি নিজের বক্তব্য সঠিকভাবে তুলে ধরেননি বলে অভিযোগ করেন আজমেরী। এতে পরিস্থিতি আরও অপ্রীতিকর হয়ে ওঠে বলে জানান তিনি।
আজমেরীর অভিযোগ, সীমান্তে তল্লাশির সময় এক কর্মকর্তা তাঁকে শারীরিকভাবে পরীক্ষা করার নামে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। তাঁর কাছে তখন শুধু বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকায় প্রতিবাদ করলে আরও জটিলতায় পড়তে পারেন, এমন আশঙ্কায় তিনি ঘটনাটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এগোননি বলে জানান।
এ ছাড়া মদিনায় যাওয়ার পথে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা এবং পরে অর্থের বিনিময়ে সেখান থেকে বের হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও বর্ণনা করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই পরিস্থিতিতে বাসের চালক তাঁকে সহায়তা করেছিলেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
সৌদি আরব ভ্রমণের সময় মক্কায় যাওয়ার পথেও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেছেন আজমেরী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেয়ার ট্যাক্সিতে এক বয়স্ক যাত্রী বারবার তাঁকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন।
পরে মরুভূমির একটি সড়কে বাসের সমস্যার কারণে অন্য গাড়ি থামিয়ে সহায়তা চাওয়ার সময় পুলিশের কাছ থেকেও হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। সে সময় এক সৌদি নাগরিকের সহযোগিতায় পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন বলে জানান আজমেরী।
তাঁর এসব অভিজ্ঞতা থেকেই সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মপরিবেশ নিয়েও সমালোচনা করেছেন আজমেরী। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেখানে অনেক বাংলাদেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রান্নাঘরের সহকারী ও শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর কাজে নিয়োজিত। তুলনামূলক ভালো পদে বাংলাদেশিদের কম দেখা যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া কিছু প্রবাসী কর্মীর পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার কাছে রেখে দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরেছেন তিনি। তবে এসব অভিজ্ঞতা ও দাবি দিয়ে সৌদি আরবে সব বাংলাদেশি কর্মীর পরিস্থিতি নির্ধারণ করা যায় না। বিষয়টির ব্যাপকতা বুঝতে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
সৌদি আরব নিয়ে কঠোর সমালোচনা করলেও দেশটির সব মানুষের প্রতি একই ধরনের মনোভাব পোষণ করেন না আজমেরী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির অনেক তরুণ ও শিক্ষিত নাগরিক বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহযোগিতাপরায়ণ।
ভ্রমণের সময় সৌদি বন্ধুদের কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, সৌদি আরবের সামাজিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের ইতিবাচক দিক থাকলেও বিদেশি শ্রমিক এবং বাংলাদেশিদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে আরও সম্মানজনক মনোভাব প্রয়োজন।
কাজী আসমা আজমেরীর বক্তব্যে বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। বিশেষ করে নারী ভ্রমণকারী ও প্রবাসী কর্মীরা কোনো ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হলে কোথায় অভিযোগ করবেন এবং কীভাবে সহায়তা পাবেন, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো দেশের সব নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আশা/
