যে দুই গুণ মানুষকে জান্নাতের পথে এগিয়ে নেয়
নিজস্ব প্রতিবেদক: জান্নাতে যাওয়ার জন্য একজন মানুষের মধ্যে কোন গুণগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? এ প্রশ্নের উত্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাকওয়া ও উত্তম চরিত্রের কথা বলেছেন। অন্যদিকে, মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মুখ ও লজ্জাস্থানের অপব্যবহার।
সুনানে তিরমিজির ২০০৪ নম্বর হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন কাজ মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে নিয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র।’ আর কোন কাজ মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাবে—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘মুখ ও লজ্জাস্থান।’
এই হাদিসে পরকালীন সফলতার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ গুণের শিক্ষা রয়েছে। তাকওয়া মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখে, আর উত্তম চরিত্র মানুষের সঙ্গে সুন্দর ও ন্যায়সংগত আচরণ করতে শেখায়।
তাকওয়া: আল্লাহভীতির প্রকৃত পরিচয়
তাকওয়া অর্থ আল্লাহকে ভয় করে তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এটি শুধু বাহ্যিক পোশাক, বেশভূষা কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; বরং মানুষের অন্তরের বিশ্বাস, নিয়ত ও কাজের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সহিহ মুসলিমের ২৫৬৪ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের বুকের দিকে ইশারা করে তিনবার বলেছেন, ‘তাকওয়া এখানে।’ একই হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; তিনি মানুষের অন্তর ও আমল দেখেন।
এ থেকে বোঝা যায়, কে কতটা আল্লাহভীরু, তা বাহ্যিক অবস্থা দেখে নিশ্চিতভাবে বিচার করা যায় না। তাই নিজের ধার্মিকতা নিয়ে অহংকার করা কিংবা অন্য কাউকে ছোট করে দেখা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি কোরো না। কে তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তিনি তা ভালো জানেন।’ (সুরা আন-নাজম, আয়াত ৩২)
অর্থাৎ প্রকৃত তাকওয়ার মূল্যায়ন আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। তবে অন্তরে তাকওয়া থাকলে তার প্রভাব মানুষের আচরণেও প্রকাশ পাওয়ার কথা। একজন আল্লাহভীরু মানুষ অন্যের অধিকার নষ্ট করা, অপমান করা কিংবা অন্যায় আচরণ থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন।
উত্তম চরিত্র কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইসলামে উত্তম চরিত্র শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি ঈমানের পূর্ণতারও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, সত্য বলা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, অন্যের সম্মান বজায় রাখা এবং ক্ষমাশীল হওয়া সুন্দর চরিত্রের অংশ।
সুনানে আবু দাউদের ৪৬৮২ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনদের মধ্যে ঈমানে সবচেয়ে পরিপূর্ণ সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।
সুনানে তিরমিজির ২০০২ নম্বর হাদিসে উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন মুমিনের আমলনামার পাল্লায় উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কিছু থাকবে না।
অন্য এক হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটবর্তী হবেন উত্তম চরিত্রের অধিকারীরা। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২০১৮)
এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে আচরণও একজন মুসলিমের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট ভালো কাজও অবহেলা নয়
উত্তম চরিত্র গড়ে তুলতে সব সময় বড় কোনো কাজের প্রয়োজন হয় না। কারও সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো, কাউকে সান্ত্বনা দেওয়া কিংবা প্রয়োজনের সময় সাহায্য করাও ভালো কাজের অন্তর্ভুক্ত।
সহিহ মুসলিমের ২৬২৬ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়—এমনকি নিজের ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও।
তাই পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করার মধ্য দিয়েও একজন মানুষ উত্তম চরিত্রের চর্চা করতে পারেন।
জিহ্বার হেফাজত: পাপ থেকে বাঁচার গুরুত্বপূর্ণ উপায়
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মুখের কথা বা জিহ্বার অপব্যবহারের কথা এসেছে। কারণ, মানুষের মুখ থেকেই অনেক সময় মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, কটূক্তি, উপহাস ও অপমানজনক কথা প্রকাশ পায়।
কথার মাধ্যমে যেমন মানুষের মনে আঘাত দেওয়া যায়, তেমনি সুন্দর কথার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করা এবং বিরোধ মিটিয়ে ফেলাও সম্ভব। তাই কথা বলার আগে তার সত্যতা, প্রয়োজনীয়তা ও পরিণতি বিবেচনা করা জরুরি।
সহিহ বুখারির ৬০১৮ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।
আর সহিহ বুখারির ১০ নম্বর হাদিসে প্রকৃত মুসলিমের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।
এই শিক্ষাগুলো মনে করিয়ে দেয়, ইবাদতের পাশাপাশি নিজের কথা ও আচরণের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
লজ্জাস্থানের হেফাজত কেন জরুরি?
হাদিসে উল্লেখ করা দ্বিতীয় বিষয়টি হলো লজ্জাস্থানের হেফাজত। মানুষের জৈবিক চাহিদা স্বাভাবিক, তবে ইসলাম এ চাহিদা পূরণের বৈধ পথ নির্ধারণ করেছে এবং অবৈধ যৌনাচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নুরের ৩০ নম্বর আয়াতে মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরের আয়াতে মুমিন নারীদেরও একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
লজ্জাস্থানের হেফাজত মানে শুধু প্রকাশ্য অনৈতিক কাজ থেকে দূরে থাকা নয়; বরং নির্জনেও আল্লাহর বিধান মেনে চলা এবং নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা। এ ক্ষেত্রেও তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
সহিহ বুখারির ৬৪৭৪ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর কাছে দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ—জিহ্বা—এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গ—লজ্জাস্থান—হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, তিনি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেবেন।
জান্নাতের পথে চলতে যে শিক্ষা মনে রাখবেন
তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র পরস্পরের পরিপূরক। তাকওয়া মানুষকে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলতে সাহায্য করে, আর উত্তম চরিত্র সেই বিশ্বাসের সুন্দর প্রকাশ ঘটায়। জিহ্বা সংযত রাখা এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করা—এই দুই গুণকে রক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই জান্নাতের প্রত্যাশী একজন মানুষের উচিত নিয়মিত ইবাদত করার পাশাপাশি মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, অশ্লীলতা ও অন্যের অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা। মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করা, নিজের ভুল সংশোধন করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।
সবশেষে, এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালন এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, দুটিই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। তাকওয়া অন্তরকে শুদ্ধ রাখে, উত্তম চরিত্র সম্পর্ককে সুন্দর করে, আর জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত মানুষকে বহু পাপ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে।
সোহাগ/
