প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারে ০.৫% ছাড়, রিচার্জের আগে জেনে নিন যেসব তথ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের অবশিষ্ট অর্থের ওপর ০.৫ শতাংশ রিবেট বা ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি মিটারের ব্যালেন্স দেখা, প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহকেরা। তবে রিচার্জের সময় ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও মিটার ভাড়া সমন্বয় হওয়ায় পুরো টাকা বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য জমা হয় না।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটার ব্যবহারে গ্রাহকেরা আগে থেকেই বিদ্যুৎ খরচের হিসাব রাখতে পারেন। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর রাজস্ব আদায় সহজ হয় এবং মিটার রিডিং, বিল তৈরি ও বিতরণের কাজে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
প্রিপেইড মিটারে কীভাবে পাওয়া যায় ০.৫% রিবেট?
প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ করার সময় প্রথমে প্রযোজ্য ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সমন্বয় করা হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থের ওপর ০.৫ শতাংশ রিবেট যোগ করার ব্যবস্থা রয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য তুলে ধরা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, গ্রাহক যত টাকা রিচার্জ করবেন, পুরো অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যালেন্স হিসেবে জমা হবে না। অনুমোদিত লোড, মিটারের ধরন এবং প্রযোজ্য চার্জের ওপর নির্ভর করে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।
১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে কত টাকা থাকবে?
প্রতিবেদনে দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, ২ কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের একজন আবাসিক গ্রাহক জানুয়ারিতে প্রথমবার ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া বাবদ ১৭১ টাকা ৬২ পয়সা সমন্বয় করা হবে। এরপর রিবেট যোগ হওয়ার পর বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে ৮৩২ টাকা ৫২ পয়সা জমা থাকার কথা বলা হয়েছে।
তবে এই হিসাব নির্দিষ্ট উদাহরণের ভিত্তিতে দেওয়া। গ্রাহকের মিটারের ধরন, অনুমোদিত লোড এবং প্রযোজ্য চার্জ অনুযায়ী প্রকৃত হিসাব ভিন্ন হতে পারে।
প্রিপেইড মিটারের প্রধান সুবিধা কী কী?
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারে গ্রাহকেরা বেশ কয়েকটি সুবিধা পান।
-
খরচের হিসাব রাখা: মিটারের ব্যালেন্স দেখে বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
-
ইচ্ছেমতো রিচার্জ: মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, ভেন্ডিং স্টেশন, পিওএস এজেন্ট ও ব্যাংকের বুথের মাধ্যমে রিচার্জের সুযোগ রয়েছে।
-
ব্যালেন্সের সতর্কসংকেত: ব্যালেন্স কমে এলে মিটারে সতর্কবার্তা পাওয়া যায়।
-
জরুরি ক্রেডিট: নির্ধারিত শর্তে ব্যালেন্স শেষ হলেও জরুরি ক্রেডিট সুবিধা ব্যবহার করা যায়।
-
ফ্রেন্ডলি আওয়ার: নির্ধারিত সময়ে ব্যালেন্স শেষ হলেও সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে।
-
বকেয়া বিলের ঝামেলা কম: অগ্রিম অর্থ পরিশোধের কারণে মাস শেষে বড় অঙ্কের বিল জমার আশঙ্কা কমে।
তবে এসব সুবিধার শর্ত মিটার ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
পোস্টপেইডের তুলনায় প্রিপেইড মিটারে খরচ কি কম?
প্রিপেইড মিটারের অন্যতম সুবিধা হলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ও অবশিষ্ট ব্যালেন্স নিয়মিত দেখা যায়। ফলে গ্রাহক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
বগুড়ার নেসকো গ্রাহক মুজাহিদ শেখের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিপেইড মিটার বসানোর পর তিনি পরিকল্পনা অনুযায়ী রিচার্জ করতে পারছেন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও সচেতন হয়েছেন।
তবে প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করলেই বিদ্যুতের মূল ইউনিট মূল্য কমে যায়—এমন নয়। প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ, প্রযোজ্য тариф ও অন্যান্য চার্জের ওপর। সচেতনভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে।
মাসে রিচার্জ না করলে কী হবে?
মিটারে আগের রিচার্জের টাকা অবশিষ্ট থাকলে তা দিয়ে পরবর্তী মাসেও বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। তবে কোনো মাসে নতুন করে রিচার্জ না করলে ওই মাসের এবং আগের মাসগুলোর প্রযোজ্য ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া পরবর্তী রিচার্জের সময় সমন্বয় করা হতে পারে।
এ কারণে দীর্ঘ সময় রিচার্জ না করলেও চার্জের হিসাব সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
দেশে কত গ্রাহক ব্যবহার করছেন প্রিপেইড মিটার?
প্রতিবেদনে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহক ইতোমধ্যে প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছেন।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) প্রায় ২০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ১২ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) জানিয়েছে, তাদের ২৩ লাখের বেশি গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ প্রিপেইড মিটারের আওতায় রয়েছেন।
ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো)–এর ১৪ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ জন গ্রাহকের মধ্যে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮১ জন প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৪ জন গ্রাহকের মধ্যে ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৭ জনের প্রিপেইড মিটার রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বাবিউবো) ৪৬ লাখ ৫ হাজার ১৯ জন গ্রাহকের মধ্যে ৩৬ লাখ ৮ হাজার ৩৩১ জন প্রিপেইড মিটারের আওতায় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীন প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন।
প্রিপেইড মিটার নিয়ে অভিযোগ জানাবেন কোথায়?
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারসংক্রান্ত তথ্য বা অভিযোগের জন্য কেন্দ্রীয় হটলাইন ১৬৯৯৯ চালু রয়েছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব হটলাইনেও যোগাযোগ করা যায়।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলমের মতে, প্রিপেইড মিটারের সুবিধা ও ব্যবহারবিধি সম্পর্কে গ্রাহকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রচার কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান জানিয়েছেন, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সব গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নূর আহমও বলেছেন, রিবেটসহ বিভিন্ন সুবিধার পাশাপাশি ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রিপেইড মিটারের ০.৫ শতাংশ রিবেটের পাশাপাশি ব্যালেন্স পর্যবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে। তবে রিচার্জের আগে প্রযোজ্য চার্জ, মিটার ভাড়া ও রিবেটের হিসাব জেনে নিলে গ্রাহকেরা নিজেদের ব্যয় সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাবেন।
সোহাগ/
