এক দিনে সফল হননি মিস্টার বিস্ট, সাফল্যের পেছনে ৫ শিক্ষা
নিজস্ব প্রতিবেদক: সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় মনে হয়, একটি ভাইরাল ভিডিওই বদলে দিতে পারে জীবনের গতিপথ। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ইউটিউবার মিস্টার বিস্টের সাফল্যের গল্প বলছে ভিন্ন কথা। বছরের পর বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিজের ভুল খুঁজে বের করা এবং প্রতিটি কাজ আগের চেয়ে ভালো করার চেষ্টা তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
মিস্টার বিস্টের আসল নাম জিমি ডোনাল্ডসন। তাঁর মতে, পেশাগত জীবনে বড় সাফল্য পেতে শুধু প্রতিভা বা ভালো ধারণা যথেষ্ট নয়। নিজের কাজকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ব্যর্থতার পরও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি একটি পডকাস্টে নিজের অভিজ্ঞতা ও কাজের দর্শন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি এই বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
মিস্টার বিস্টের সাফল্যের দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের কাজের মূল্যায়ন করা। কোনো ভিডিও বা উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল না দিলে সেটিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেই থেমে যাওয়া নয়, বরং কেন সেটি কাজ করেনি, তা খুঁজে বের করা জরুরি।
কোন অংশ দর্শকের ভালো লাগছে, কোথায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং কীভাবে উপস্থাপন আরও উন্নত করা যায়, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পরবর্তী কাজে পরিবর্তন আনতে হয়। নিজের কাজের দুর্বলতা স্বীকার করতে পারলে উন্নতির সুযোগ তৈরি হয়।
এই পদ্ধতি শুধু ইউটিউব বা কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রেই নয়, ব্যবসা, সৃজনশীল কাজ এবং ব্যক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে।
আজকের মিস্টার বিস্টের সঙ্গে তাঁর শুরুর দিকের কাজের তুলনা করলে বড় ধরনের পার্থক্য চোখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় কিশোর বয়সে ইউটিউবে ভিডিও তৈরি শুরু করেছিলেন তিনি। গেমিং এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মন্তব্যধর্মী ভিডিও প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্ল্যাটফর্মটি সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে।
শুরুতেই নিখুঁত ভিডিও তৈরি করার পরিবর্তে তিনি বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। কোন ধরনের ভিডিও দর্শককে আকৃষ্ট করে, কোন উপস্থাপনা বেশি কার্যকর এবং কীভাবে দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখা যায়, তা বুঝতে সময় দিয়েছেন।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, কোনো কাজে দক্ষ হয়ে ওঠার জন্য শুরু থেকেই সবকিছু জানা জরুরি নয়। বরং নিয়মিত কাজ করা, ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা এবং শেখা বিষয়গুলো পরবর্তী কাজে প্রয়োগ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
মিস্টার বিস্টের জনপ্রিয়তার ইতিহাসে ২০১৭ সালের একটি ভিডিও বিশেষভাবে আলোচিত। ওই ভিডিওতে তিনি ১ থেকে ১ লাখ পর্যন্ত গুনে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই ব্যতিক্রমী ভিডিওটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায় এবং তাঁর পরিচিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে একটি ভিডিওর ভাইরাল হওয়াকে তাঁর পুরো সাফল্যের ব্যাখ্যা হিসেবে দেখলে গল্পের বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কনটেন্ট তৈরি, নতুন ধারণা পরীক্ষা এবং দর্শকের পছন্দ বোঝার চেষ্টা করেছেন।
অর্থাৎ, আলোচনায় আসা একটি ভিডিওর পেছনেও থাকতে পারে বহু বছরের প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক উন্নতির অভিজ্ঞতা।
কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের পর মিস্টার বিস্ট বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও সামাজিক উদ্যোগেও যুক্ত হয়েছেন। তাঁর উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনাকারী **বিস্ট ফিলানথ্রপি, স্ন্যাকস ব্র্যান্ড ফিস্টেবলস এবং প্রতিযোগিতাভিত্তিক আয়োজন বিস্ট গেমস।
এসব উদ্যোগ তাঁর কর্মকাণ্ডের পরিসরকে ইউটিউব ভিডিওর বাইরেও বিস্তৃত করেছে। তবে প্রতিটি উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করে আলাদা পরিকল্পনা, পরিচালনা এবং বাস্তবায়নের ওপর।
তাঁর দীর্ঘ পথচলা থেকে বোঝা যায়, একটি ক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতা নতুন উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু নতুন ক্ষেত্রে সফল হতে সেখানকার চ্যালেঞ্জগুলোও বুঝতে হয়।
মিস্টার বিস্টের সাফল্য থেকে যে ৫টি শিক্ষা পাওয়া যায়
১. নিজের কাজ নিয়মিত পর্যালোচনা করুন। কী ভালো হচ্ছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা খুঁজে বের করুন।
২. ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিন। প্রত্যাশিত ফল না এলে কারণ বিশ্লেষণ করে পরবর্তী প্রচেষ্টায় পরিবর্তন আনুন।
৩. পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভয় পাবেন না। নতুন ধারণা ও পদ্ধতি চেষ্টা করলে কোনটি কার্যকর, তা বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।
৪. ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন। দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা গড়ে উঠতে সময় লাগে। নিয়মিত কাজ করার অভ্যাস তাই গুরুত্বপূর্ণ।
৫. অভিজ্ঞতাকে উন্নতির কাজে লাগান। প্রতিটি কাজ থেকে পাওয়া শিক্ষা পরবর্তী কাজকে আরও ভালো করার জন্য ব্যবহার করুন।
মিস্টার বিস্টের পথচলার মূল শিক্ষা হলো, বড় অর্জনের পেছনে অনেক সময় এমন দীর্ঘ প্রস্তুতি থাকে, যা দর্শকের চোখে পড়ে না। একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার মুহূর্তটি দৃশ্যমান হলেও তার আগে তৈরি হওয়া অভিজ্ঞতা, ভুল সংশোধন এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আড়ালেই থেকে যায়।
তাই কোনো কাজে দ্রুত সাফল্য না এলে সেটিকে শেষ বলে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের কাজের মান যাচাই করা, ভুল থেকে শেখা এবং ধাপে ধাপে উন্নতি করার মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।
মিস্টার বিস্টের গল্প মনে করিয়ে দেয়, সফল হওয়ার জন্য শুরুতেই সেরা হতে হয় না। বরং শেখার আগ্রহ ধরে রেখে প্রতিটি প্রচেষ্টায় আগের চেয়ে ভালো হওয়ার চেষ্টা করাই হতে পারে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কার্যকর পথ।
সিদ্দিকা/
