জমির রেকর্ড নিজের নামে থাকলেই কি মালিক হওয়া যায়? জানুন আইন কী বলে
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে, জমির দলিল একজনের নামে থাকলেও সরকারি খতিয়ান বা রেকর্ড অন্য কারও নামে হলে প্রকৃত মালিক কে? জমির মালিকানা প্রমাণে দলিলের গুরুত্ব বেশি, নাকি সরকারি রেকর্ডের? এ বিষয়ে সঠিক ধারণা না থাকায় অনেকেই জমি নিয়ে আইনি জটিলতায় পড়েন।
আইনগতভাবে জমির মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দলিল ও খতিয়ান দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু সরকারি রেকর্ডে নাম থাকলেই কোনো ব্যক্তি জমির চূড়ান্ত মালিক হয়ে যান না। একইভাবে, দলিল থাকলেই সব ক্ষেত্রে মালিকানা নিশ্চিত হয় না। জমির বৈধ মালিকানা নির্ধারণে দলিলের বৈধতা, পূর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিকতা, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি বিবেচনা করা হয়।
জমির রেকর্ড অন্যের নামে হলে কী হবে?
ধরা যাক, একটি জমির পূর্ববর্তী মালিকের নামে সিএস, এসএ ও আরএস খতিয়ান রয়েছে। ওই মালিকের কাছ থেকে একজন ব্যক্তি ২০ বছর আগে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমিটি কিনেছেন। পরে তিনি বিদেশে চলে যাওয়ায় জমিটির নিয়মিত দেখাশোনা করতে পারেননি। এই সুযোগে অন্য একজন বিএস জরিপে জমিটি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে নিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু বিএস খতিয়ানে নিজের নাম থাকার কারণে নতুন রেকর্ডধারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমির বৈধ মালিক হয়ে যাবেন না। জমিটি আগে বৈধভাবে হস্তান্তর করা হয়েছিল কি না, বিক্রেতার মালিকানা ছিল কি না এবং পরবর্তী রেকর্ড কীভাবে তৈরি হয়েছে, সেসব বিষয় যাচাই করতে হবে।
অর্থাৎ, জমির রেকর্ডে নাম থাকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই মালিকানা নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তি নয়।
জমির দলিল ও খতিয়ানের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
জমির দলিল ও খতিয়ানের ভূমিকা আলাদা। নিবন্ধিত দলিল জমি কেনাবেচা বা হস্তান্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। অন্যদিকে, খতিয়ানে জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত তথ্যসহ জরিপের বিভিন্ন বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে।
তবে কোনো দলিলের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি করা হলে সেটির বৈধতা যাচাই করা জরুরি। বিক্রেতার জমি বিক্রির আইনগত অধিকার ছিল কি না, দলিলের মাধ্যমে যথাযথভাবে স্বত্ব হস্তান্তর হয়েছে কি না এবং আগের মালিকানার ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কি না, এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।
একইভাবে, সরকারি রেকর্ডে ভুল থাকলে আইন অনুযায়ী তা সংশোধনের সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হবে, তা নির্ভর করে বিরোধের ধরন ও সংশ্লিষ্ট নথির ওপর।
নিজের নামে জমির রেকর্ড করালেই কি মালিকানা নিশ্চিত?
না, শুধু নিজের নামে জমির রেকর্ড করালেই জমির চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। রেকর্ডে ভুল তথ্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আবার বৈধ মালিকের জমি অন্য কারও নামে রেকর্ড হলেও তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকৃত মালিকানা বদলে যায় না।
জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট দলিল, সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান, নামজারি-সংক্রান্ত নথি, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং দখলের প্রমাণসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, নামজারি বা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের নথিও এককভাবে চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ নয়। এসব নথি অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা হয়।
জমির রেকর্ড ও দলিলে বিরোধ থাকলে করণীয়
জমির দলিল এক ব্যক্তির নামে এবং খতিয়ান অন্য ব্যক্তির নামে থাকলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট জমির সব দলিল ও জরিপের রেকর্ড সংগ্রহ করে যাচাই করা উচিত। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সহায়তা নিতে হবে।
রেকর্ড সংশোধনের বিষয় হলে প্রযোজ্য আইন ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী আবেদন করা যেতে পারে। আর বিরোধটি যদি প্রকৃত মালিকানা বা স্বত্ব নিয়ে হয়, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত আদালতের শরণাপন্ন হতে হতে পারে।
এ ধরনের বিরোধে জমির অবস্থান, রেকর্ডের ধরন, দলিলের ইতিহাস ও দখলের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শেষ কথা
জমির রেকর্ড নিজের নামে থাকলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমির বৈধ মালিক হয়ে যান না। আবার শুধু দলিল দেখিয়েও সব ক্ষেত্রে মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায় না। প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে দলিলের বৈধতা, পূর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিকতা, খতিয়ান, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
তাই জমি কেনা, বিক্রি বা মালিকানা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে শুধু একটি নথির ওপর নির্ভর না করে সব কাগজপত্র যাচাই করা এবং প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
সোহাগ/
