নিজস্ব প্রতিবেদক: নতুন জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে পে-ফিক্সেশন নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা জানতে চাইছেন, নতুন স্কেলে তাদের মূল বেতন কত হবে এবং iBAS++-এ কীভাবে সেই বেতন নির্ধারণ করা হবে।
পে-ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে শুধু নতুন বেতনস্কেলের প্রারম্ভিক বেতন দেখলেই হবে না। একজন কর্মচারীর ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন, পুরোনো বেতনস্কেলে তার অবস্থান, নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপ এবং ১ জুলাইয়ের প্রযোজ্য বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়েই নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে।
১১–২০ গ্রেডের নতুন প্রারম্ভিক বেতন
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ অনুযায়ী ২০টি গ্রেডই বহাল রয়েছে। ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
| গ্রেড | পুরোনো প্রারম্ভিক বেতন | নতুন প্রারম্ভিক বেতন |
|---|---|---|
| ১১ | ১২,৫০০ টাকা | ২৫,০০০ টাকা |
| ১২ | ১১,৩০০ টাকা | ২৪,৩০০ টাকা |
| ১৩ | ১১,০০০ টাকা | ২৪,০০০ টাকা |
| ১৪ | ১০,২০০ টাকা | ২৩,৫০০ টাকা |
| ১৫ | ৯,৭০০ টাকা | ২২,৮০০ টাকা |
| ১৬ | ৯,৩০০ টাকা | ২১,৯০০ টাকা |
| ১৭ | ৯,০০০ টাকা | ২১,৪০০ টাকা |
| ১৮ | ৮,৮০০ টাকা | ২১,০০০ টাকা |
| ১৯ | ৮,৫০০ টাকা | ২০,৫০০ টাকা |
| ২০ | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা |
তবে নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন মানেই ওই গ্রেডের প্রত্যেক কর্মচারীর নতুন মূল বেতন একই হবে না। কর্মচারী পুরোনো স্কেলের কোন ধাপে ছিলেন, সেটিও পে-ফিক্সেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পে-ফিক্সেশনে ৩০ জুনের বেতন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে কোনো কর্মচারীর নতুন মূল বেতন নির্ধারণের সময় প্রথমেই দেখা হবে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তার প্রকৃত মূল বেতন কত ছিল।
এরপর পুরোনো বেতনস্কেলে ওই কর্মচারীর অবস্থান বিবেচনা করে নতুন বেতনস্কেলে সংশ্লিষ্ট ধাপ নির্ধারণ করা হবে।
অর্থাৎ শুধু গ্রেড জানা থাকলেই নতুন বেতন নির্ধারণ করা যাবে না। একই গ্রেডে কর্মরত দুই কর্মচারীর মূল বেতনও আলাদা হতে পারে।
একটি উদাহরণে বিষয়টি বুঝে নিন
ধরা যাক, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ১৩,৭৯০ টাকা মূল বেতন পাচ্ছেন। ওই গ্রেডের পুরোনো প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১২,৫০০ টাকা।
তাহলে প্রারম্ভিক বেতনের তুলনায় তার অতিরিক্ত বেতন:
১৩,৭৯০ - ১২,৫০০ = ১,২৯০ টাকা
নতুন স্কেলে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২৫,০০০ টাকা হলে এই পার্থক্য যোগ করে পাওয়া যায়:
২৫,০০০ + ১,২৯০ = ২৬,২৯০ টাকা
তবে নতুন বেতনস্কেলে যদি ২৬,২৯০ টাকা নামে কোনো নির্ধারিত ধাপ না থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করতে হবে। প্রকাশিত উদাহরণ অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে পরবর্তী ধাপ ২৬,৩০০ টাকা হতে পারে।
তাই পে-ফিক্সেশনের সময় হিসাবের ফল সরাসরি চূড়ান্ত বেতন হয়ে যায় না। নতুন স্কেলের নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করতে হয়।
১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্টও গুরুত্বপূর্ণ
পে-ফিক্সেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১ জুলাই ২০২৬-এর বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট।
নতুন বেতন স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ায় যেসব কর্মচারীর ক্ষেত্রে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রযোজ্য, তাদের হিসাবেও এটি বিবেচনা করতে হবে।
সহজভাবে বিষয়টি হলো:
৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন → নতুন স্কেলে পে-ফিক্সেশন → ১ জুলাই ২০২৬-এর প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্ট
তাই শুধু ৩০ জুনের বেতন দেখে নিজের নতুন বেতন হিসাব করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই গ্রেডে সবার বেতন এক হবে না
একই গ্রেডে কর্মরত হলেও দুই কর্মচারীর নতুন মূল বেতন আলাদা হতে পারে। কারণ একজন কর্মচারী একই গ্রেডে দীর্ঘদিন চাকরি করে একাধিক বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকতে পারেন, আবার অন্যজন একই গ্রেডে নতুন যোগ দিয়ে প্রারম্ভিক ধাপে থাকতে পারেন।
একই গ্রেড মানেই একই মূল বেতন নয়।
পুরোনো বেতনস্কেলে একজন কর্মচারী যত উঁচু ধাপে অবস্থান করবেন, নতুন স্কেলে তার বেতন নির্ধারণও সেই অনুযায়ী হবে।
২০তম গ্রেডে নতুন বেতন কত?
২০তম গ্রেডের পুরোনো প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ৮,২৫০ টাকা। নতুন বেতনস্কেলে এই গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ২০,০০০ টাকা।
তবে ২০তম গ্রেডের সব কর্মচারীর নতুন মূল বেতন ২০,০০০ টাকা হবে, এমন নয়।
কোনো কর্মচারী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে পুরোনো স্কেলে ৮,২৫০ টাকার বেশি বেতন পেলে তার পুরোনো স্কেলের ধাপ ও নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপ বিবেচনা করেই নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে।
একইভাবে ১৯ থেকে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও এই হিসাব প্রযোজ্য হবে।
iBAS++-এ হবে পে-ফিক্সেশন
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ হলো iBAS++-এ পে-ফিক্সেশন।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২০২৬ সালের পে-ফিক্সেশন কার্যক্রম ৫ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি রয়েছে। কর্মচারীদের iBAS++-এ থাকা তথ্য যাচাই করে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করতে হবে।
যেসব তথ্য যাচাই করবেন
পে-ফিক্সেশনের আগে নিজের তথ্যগুলো অফিসের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাচাই করতে হবে:
- নামের বানান
- জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর
- জন্মতারিখ
- পদবি
- বর্তমান গ্রেড
- চাকরিতে যোগদানের তারিখ
- ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন
- আগের পে-ফিক্সেশনের তথ্য
- বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের তথ্য
- পদোন্নতির তথ্য
- বদলির তথ্য
- টাইমস্কেল
- সিলেকশন গ্রেড
- আগের উচ্চতর গ্রেডের তথ্য
কোনো তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ থাকলে পে-ফিক্সেশনের ফলাফলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই তথ্য চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের বাড়তি সতর্কতা
দীর্ঘদিন চাকরি করা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের তথ্য নতুন বেতন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তাই শুধু বর্তমান মূল বেতন জানলেই হবে না। আগে কখন কীভাবে বেতন নির্ধারণ হয়েছে, সেটির তথ্যও প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যাদের আগে উচ্চতর গ্রেড, টাইমস্কেল বা সিলেকশন গ্রেড দেওয়া হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদেশ ও নথি যাচাই করে পে-ফিক্সেশন করা উচিত।
নতুন বেতন ও হাতে পাওয়া টাকা এক বিষয় নয়
নতুন বেতনস্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হলেও বর্ধিত বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার বিষয়টি কর্মচারীদের মনে রাখা জরুরি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১১–২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বর্ধিত বেতনের একটি অংশ প্রথম পর্যায়ে কার্যকর হবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে এর পরিমাণ বাড়বে এবং নির্ধারিত সময়ের পর পুরো বর্ধিত অংশ কার্যকর হবে।
তাই iBAS++-এ নির্ধারিত নতুন মূল বেতন এবং নির্দিষ্ট মাসে হাতে পাওয়া মোট বেতন একই বিষয় নয়।
বকেয়া বেতনের হিসাব কীভাবে হবে?
নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ায় ওই তারিখ থেকে প্রাপ্য বেতন পার্থক্য বা বকেয়া হিসাবেও পে-ফিক্সেশনের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
পে-ফিক্সেশন শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নতুন ও পুরোনো বেতনের পার্থক্য, কার্যকর তারিখ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে বকেয়ার হিসাব করা হবে।
তাই প্রত্যেক কর্মচারীর বকেয়ার পরিমাণ এক হবে না। গ্রেড, পুরোনো মূল বেতন, নতুন স্কেলে নির্ধারিত বেতন এবং কার্যকর সময়ের ওপর বকেয়ার পরিমাণ নির্ভর করবে।
কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৫ বিষয়
- ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আপনার মূল বেতন কত ছিল, তা নিশ্চিত করুন।
- ১ জুলাইয়ের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না যাচাই করুন।
- পুরোনো স্কেলে আপনার বেতন কোন ধাপে ছিল এবং নতুন স্কেলে সংশ্লিষ্ট ধাপ কোনটি, তা মিলিয়ে দেখুন।
- পদোন্নতি, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেডের তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি প্রস্তুত রাখুন।
- iBAS++-এ প্রদর্শিত তথ্যের সঙ্গে সার্ভিস বুক ও বেতনসংক্রান্ত নথির মিল নিশ্চিত করুন।
শেষ কথা
১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের পে-ফিক্সেশনে শুধু নতুন গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন দেখলেই হবে না। ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন, পুরোনো স্কেলের ধাপ, নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপ এবং ১ জুলাইয়ের প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্ট মিলিয়েই নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে।
তাই iBAS++-এ পে-ফিক্সেশন চূড়ান্ত করার আগে নিজের সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য ভুল বা অসংগতিপূর্ণ থাকলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা সংশোধন করে নেওয়াই নিরাপদ।
সোহাগ/
