স্মার্টফোনকে ইবাদতের সহায়ক করবেন যেভাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: স্মার্টফোন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ, অফিসের কাজ, আর্থিক লেনদেন, পড়াশোনা, চিকিৎসাসেবা, অনলাইন কেনাকাটা থেকে শুরু করে জরুরি নানা কাজ মুহূর্তেই করা যায় হাতের মুঠোয় থাকা এই ছোট্ট যন্ত্রটির মাধ্যমে।
প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার অনেককে সময় অপচয়, অশ্লীলতা ও নানা গুনাহের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ একজন সচেতন মুমিন চাইলে একই স্মার্টফোনকে ইবাদত ও কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
নামাজের সময় মনে করিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-জিকির, ইসলামী জ্ঞানচর্চা, সদকা এবং অন্যকে নেক কাজে উৎসাহিত করা, সব ক্ষেত্রেই স্মার্টফোন হতে পারে একজন মুমিনের সহায়ক।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ায় একে অন্যকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২)
এই নির্দেশনার আলোকে স্মার্টফোনকে কীভাবে ইবাদতের সহায়ক করা যায়, তার কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো।
ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় নামাজের সময়ের কথা ভুলে যাওয়া বা দেরি হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। স্মার্টফোনে নির্ভরযোগ্য নামাজের সময়সূচি ও আজানের নোটিফিকেশন চালু থাকলে যথাসময়ে নামাজের কথা মনে পড়ে।
একইভাবে তাহাজ্জুদ, সাহরি বা ফজরের জন্য অ্যালার্ম সেট করে ভোর রাতে জেগে ওঠার অভ্যাসও গড়ে তোলা যায়। অর্থাৎ যে ফোন কখনো সময় নষ্টের কারণ হয়, সেটিই চাইলে ইবাদতের সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
সফরে কিংবা অপরিচিত কোনো স্থানে গেলে কিবলার দিক নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের কম্পাসভিত্তিক কিবলা অ্যাপ ব্যবহার করে সহজেই কিবলার দিক জানা যায়।
হোটেল, বিমানবন্দর, কর্মস্থল কিংবা ভ্রমণের সময় নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে।
স্মার্টফোনে নির্ভরযোগ্য কোরআন অ্যাপ থাকলে যেকোনো সময় তিলাওয়াত করা যায়। বিশেষ করে সফরে কিংবা কোথাও অপেক্ষা করার সময় কোরআন পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি আয়াতের অনুবাদ ও তাফসিরও সহজে পড়া যায়। যাতায়াতের সময় কোরআন তিলাওয়াত শোনার সুযোগও রয়েছে।
যারা কোরআন মুখস্থ করছেন, তাদের জন্যও প্রযুক্তি কিছু অতিরিক্ত সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে এমন কিছু অ্যাপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি রয়েছে, যা মুখস্থ আয়াত পড়ার সময় সম্ভাব্য ভুল শনাক্ত করতে সহায়তা করে।
তবে এসব প্রযুক্তি কোনো যোগ্য শিক্ষকের বিকল্প নয়। বরং ব্যক্তিগত অনুশীলনের সহায়ক হিসেবে এগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশে বা এলাকায় নিয়মিত কোরআন শিক্ষকের সুযোগ সীমিত, তারা অনলাইনে কোরআন শেখা ও শেখানোর ক্লাসে অংশ নিতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)
স্মার্টফোনে এমন অনেক অ্যাপ রয়েছে, যার মাধ্যমে সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির, ইস্তিগফার, দরুদ ও বিভিন্ন দোয়া পড়ার জন্য রিমাইন্ডার সেট করা যায়।
প্রতিদিন একটি করে দোয়া, আয়াত বা হাদিস শেখার জন্যও নির্দিষ্ট সময়ে নোটিফিকেশন দেওয়া যেতে পারে। এতে ব্যস্ততার মধ্যেও নেক আমলের কথা মনে পড়ে এবং নিয়মিত আমলের অভ্যাস গড়ে ওঠে।
স্মার্টফোনের মাধ্যমে শুধু নিজের ইবাদত নয়, অন্যকেও ভালো কাজে উৎসাহিত করা যায়। একটি ফোনকল কিংবা ছোট্ট বার্তাও কারো জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে।
কাউকে নামাজের কথা মনে করিয়ে দেওয়া, বন্ধুকে তাহাজ্জুদের জন্য উৎসাহিত করা, কোরআন পড়তে বলা কিংবা কোনো কল্যাণমূলক কাজে অংশ নিতে আহ্বান জানানো, সবই স্মার্টফোনের মাধ্যমে করা সম্ভব।
তবে কাউকে ইবাদতের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত সময় ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের পথ দেখায়, তার জন্য আমলকারীর অনুরূপ সওয়াব রয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৭১)
স্মার্টফোনের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মসজিদ নির্মাণ, কোরআন শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, খাদ্য বিতরণ, এতিম ও অসহায় মানুষের সহায়তাসহ নানা প্রকল্পে অনলাইনে দান করা যায়।
বাংলাদেশে বসেও যাচাই-বাছাই করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মানবিক ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা করা সম্ভব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল ছাড়া—সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪১১৫)
তবে অনলাইনে দান করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে অবশ্যই যাচাই করা জরুরি।
স্মার্টফোনে নির্ভরযোগ্য জাকাত ক্যালকুলেটরের সাহায্যে স্বর্ণ, রৌপ্য, নগদ অর্থ ও ব্যবসায়িক সম্পদের হিসাব করা যায়। জাকাত দেওয়ার সময়ের জন্য রিমাইন্ডারও সেট করা সম্ভব।
তবে জাকাতের হিসাব যদি জটিল হয়, বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ ও দায়-দেনার বিষয় থাকলে অভিজ্ঞ আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত।
একইভাবে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকিরসহ বিভিন্ন নেক আমলের ব্যক্তিগত হিসাবও রাখা যায়। এতে নিজের আমলের ঘাটতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করা সহজ হয়।
স্মার্টফোনে এখন কোরআন, হাদিস, সীরাত, ফিকহ ও ইসলামী ইতিহাসের অসংখ্য বই পড়ার সুযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অকারণে সময় কাটানোর পরিবর্তে অবসর সময়ে উপকারী বই পড়া কিংবা নির্ভরযোগ্য আলেমদের আলোচনা শোনা যেতে পারে।
তবে ইসলামী কোনো তথ্য, বিশেষ করে আয়াত, হাদিস বা ফতোয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার আগে তা নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করা জরুরি। কারণ ইন্টারনেটে ভুল ও বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় তথ্যও ছড়িয়ে আছে।
স্মার্টফোনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো অপ্রয়োজনীয় কনটেন্টে দীর্ঘ সময় ডুবে থাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ভিডিও দেখা কিংবা অনর্থক স্ক্রল করতে গিয়ে কখন যে মূল্যবান সময় চলে যায়, অনেকেই তা বুঝতে পারেন না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামত এমন আছে, যেগুলোর ব্যাপারে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)
তাই স্মার্টফোনকে ইবাদতের সহায়ক বানানোর পাশাপাশি গুনাহ ও সময় অপচয় থেকে বাঁচার ব্যবস্থাও করতে হবে। প্রয়োজনে স্ক্রিন-টাইম সীমা নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের ব্যবহার কমানো এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট ফিল্টারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তবে কোনো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা একাই মানুষকে গুনাহ থেকে রক্ষা করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন আত্মসংযম ও তাকওয়া।
স্মার্টফোন নিজে ভালো বা মন্দ নয়। এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে এটি মানুষের জন্য কল্যাণের মাধ্যম হবে, নাকি ক্ষতির কারণ হবে।
একজন মুমিন চাইলে স্মার্টফোনকে নামাজের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মাধ্যম, কোরআন শেখার সহায়ক, দোয়া-জিকিরের স্মরণকারী, ইসলামী জ্ঞান অর্জনের উপকরণ এবং সদকা ও কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়ার মাধ্যম বানাতে পারেন।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো সেই সুবিধাকে শুধু দুনিয়াবি প্রয়োজন পূরণের জন্য নয়, আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের কাজেও ব্যবহার করা।
তাই হাতে থাকা স্মার্টফোনটি ইবাদতের সহযোগী হবে, নাকি সময় অপচয় ও গুনাহের কারণ হবে, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীকেই নিতে হবে। আর কেউ যদি নিজের জন্য স্মার্টফোনকে গুনাহ থেকে বাঁচার চেয়ে গুনাহের বড় মাধ্যম হিসেবে দেখতে পান, তাহলে তার উচিত এর ব্যবহার সীমিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দূরত্ব তৈরি করা।
সোহাগ/
