বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ: কোন কোন দেশের মানুষ মহাকাশে গেছেন?
নিজস্ব প্রতিবেদক: মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ৫২টি দেশের অন্তত ৭৪৬ জন মানুষ মহাকাশে ভ্রমণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পেশাদার নভোচারী থেকে শুরু করে অর্থের বিনিময়ে মহাকাশে যাওয়া পর্যটকরাও। তবে মহাকাশযাত্রায় এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আধিপত্য সবচেয়ে বেশি।
৪ অক্টোবর থেকে ১০ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ। মহাকাশ প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং মানবজাতির কল্যাণে এর অবদান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতেই প্রতিবছর এই সপ্তাহ পালন করা হয়। এ উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে স্কুল, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, জাদুঘর ও জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্লাবগুলোতে নানা আয়োজন করা হয়।
মহাকাশে প্রথম মানুষ ইউরি গ্যাগারিন
১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল সোভিয়েত নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে যান। ভস্তক-১ মহাকাশযানে করে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে তাঁর সময় লাগে ১০৮ মিনিট। মহাকাশযানটি ঘণ্টায় প্রায় ২৭ হাজার ৪০০ কিলোমিটার গতিতে চলেছিল।
গ্যাগারিনের এই যাত্রা প্রমাণ করে, মানুষ মহাকাশে উৎক্ষেপণ, ওজনহীনতা এবং পৃথিবীতে ফিরে আসার কঠিন প্রক্রিয়া সহ্য করতে পারে। এর মাধ্যমে তৎকালীন মহাকাশ প্রতিযোগিতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন বড় সাফল্য অর্জন করে।
মহাকাশের সীমানা কোথায়?
মহাকাশ কোথা থেকে শুরু হয়, তা নিয়ে সর্বজনস্বীকৃত একটি সীমারেখা নেই। আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী, পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০০ কিলোমিটার ওপরে অবস্থিত কারমান লাইনকে মহাকাশের সীমানা ধরা হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, নাসা ও ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ৮০ কিলোমিটার উচ্চতার ওপরে গেলে সেটিকে মহাকাশযাত্রা হিসেবে গণ্য করে।
কোন কোন দেশের মানুষ মহাকাশে গেছেন?
কারমান লাইনকে মানদণ্ড হিসেবে ধরলে এখন পর্যন্ত ৫২টি দেশের অন্তত ৭৪৬ জন মানুষ মহাকাশে গেছেন। এই তালিকায় পেশাদার নভোচারীর পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে মহাকাশে যাওয়া পর্যটকরাও রয়েছেন।
কিছু মহাকাশযাত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। আবার কয়েকজন এমন দেশের হয়ে মহাকাশে গেছেন, যে দেশ বর্তমানে আর অস্তিত্বশীল নয়—যেমন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন।
মহাকাশে মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ৩৬৯ জন মানুষ মহাকাশে গেছেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়া মিলিয়ে এই সংখ্যা ১৩৮। তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন, যারা নিজেদের রকেট ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত ২৯ জনকে মহাকাশে পাঠিয়েছে।
মহাকাশে যাওয়া মানুষের মাত্র ১৫ শতাংশ নারী
মহাকাশ গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও এখনো এই ক্ষেত্রটি পুরুষপ্রধান। এখন পর্যন্ত মহাকাশে যাওয়া ৭৪৬ জনের মধ্যে নারী ১১২ জন, অর্থাৎ প্রায় ১৫ শতাংশ। হিসাব অনুযায়ী, মহাকাশযাত্রীদের প্রায় প্রতি সাতজনে একজন নারী।
১৯৬৩ সালের জুনে সোভিয়েত নভোচারী ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশে যান। এর প্রায় ২০ বছর পর ১৯৮৩ সালের জুনে মহাকাশে যান যুক্তরাষ্ট্রের স্যালি রাইড।
সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রার কারণে নারীদের অংশগ্রহণের হারও বাড়ছে। ২০২০ সালের পর মহাকাশে যাওয়া নারী যাত্রীদের অর্ধেকের বেশি ছিলেন অর্থের বিনিময়ে বা অতিথি হিসেবে ব্লু অরিজিনের সাবঅরবিটাল ফ্লাইটে অংশ নেওয়া যাত্রী।
মহাকাশে যাওয়া মানুষের গড় বয়স কত?
প্রথমবার মহাকাশে যাওয়ার সময় বেশিরভাগ মানুষের বয়স ছিল ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মহাকাশযাত্রীদের মধ্যম বয়স প্রায় ৪০ বছর।
তবে বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রা শুরু হওয়ার পর বয়সের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২১ সালে অলিভার ডেমেন মাত্র ১৮ বছর বয়সে মহাকাশে যান। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে এড ডুইট ৯০ বছর ৮ মাস বয়সে মহাকাশে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বয়সী মহাকাশযাত্রী হন।
চাঁদের পথে আবার মানুষ
মানব মহাকাশযাত্রার পরবর্তী বড় লক্ষ্য এখন চাঁদ। ২০২৬ সালের এপ্রিলে নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা চাঁদকে প্রদক্ষিণ করেন এবং পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছান। এর মাধ্যমে ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের স্থাপিত দূরত্বের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যায়।
পরবর্তী ধাপে আর্টেমিস-৩ মিশনের মাধ্যমে চাঁদের কক্ষপথে ডকিং প্রযুক্তি পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর আর্টেমিস-৪ মিশনের মাধ্যমে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে নভোচারী পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে।
ভারতেরও মহাকাশে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা
মানব মহাকাশযাত্রায় নতুন দেশ হিসেবে ভারতও এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটির গগনযান কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ সালে প্রথমবারের মতো নিজস্ব রকেটে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সফল হলে মানুষকে নিজস্ব রকেটে মহাকাশে পাঠানো দেশের তালিকায় ভারত চতুর্থ অবস্থানে উঠে আসবে।
অন্যদিকে, চীনও প্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে নভোচারীদের চাঁদে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
মহাকাশযাত্রার শুরু থেকে কয়েক দশকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। এখন শুধু পৃথিবীর কক্ষপথে যাওয়াই নয়, চাঁদে ফিরে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে আরও দূরের মহাকাশে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পথে।
সোহাগ/
