এক জোড়া টিয়ার দাম ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা, কেন?
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেখতে সাধারণ সবুজ টিয়ার মতোই। বাঁকানো লাল ঠোঁট, ঘাড়ে কালো দাগ আর তীক্ষ্ণ চোখ। তবে কাছে থেকে দেখলে চোখে পড়বে পার্থক্য। শরীরে সবুজের বদলে রয়েছে বেগুনি আভা। এই বিশেষ রঙের টিয়ার নাম রিংনেক ভায়োলেট। রাজধানীর মিরপুরের শাহআলী মাজার এলাকার পোষা প্রাণীর হাটে এক জোড়া পাখির দাম চাওয়া হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
প্রশ্ন হলো, দেখতে সাধারণ টিয়ার মতো হলেও এই পাখির দাম এত বেশি কেন? এর পেছনে রয়েছে পালকের বিরল রং, বাছাই করা প্রজননের মাধ্যমে সেই রং পাওয়ার জটিলতা, বাজারে সীমিত সরবরাহ এবং আমদানির বিধিনিষেধ।
সবুজ টিয়া থেকে বেগুনি রং, যেভাবে তৈরি হয় বৈচিত্র্য
রিংনেক ভায়োলেট আসলে রিংনেক প্যারাকিটের একটি বিশেষ রঙের ধরন। সাধারণ রিংনেকের পালক সবুজ হলেও জিনগত বৈচিত্র্যের কারণে এদের মধ্যে নীল, বেগুনি, হলুদসহ বিভিন্ন রঙের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রজননকারীরা এসব বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে বাছাই করা প্রজননের মাধ্যমে ভিন্ন রঙের পাখির সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেন।
পোষা পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন বিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমানের ভাষ্য, রিংনেক ভায়োলেট রিংনেক প্যারাকিটের একটি মিউটেশন। বাছাই করা প্রজননের মাধ্যমে লুটিনো, ব্লু ভায়োলেট, অ্যালবিনো, ক্লিয়ারফেস ও বাটার কাপের মতো বিভিন্ন রঙের রিংনেক পাওয়া যায়।
তাঁর মতে, রিংনেকের বিভিন্ন রঙের পাখি একসময় পাকিস্তান ও ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে। বর্তমানে দেশেও এসব পাখির প্রজনন হচ্ছে।
বাছাই করা প্রজননে কেন বাড়ে পাখির দাম?
বিশেষ রঙের পাখি পেতে প্রজননকারীরা আগে থেকেই কাঙ্ক্ষিত রঙের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এমন পাখি নির্বাচন করেন। এরপর তাদের প্রজননে জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের মধ্য থেকে উপযুক্ত বৈশিষ্ট্যের পাখি বেছে নিয়ে পরবর্তী প্রজনন করানো হয়।
কয়েক প্রজন্ম ধরে এভাবে বাছাই করা প্রজনন চালালে নির্দিষ্ট রঙের পাখি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তবে প্রতিবার একই রঙের বাচ্চা জন্মাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে চাহিদামতো রঙের পাখি পাওয়া কঠিন হলে তার দামও বেড়ে যেতে পারে।
২০২৫ সালে Communications Biology সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় টিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির পালকে রঙের বৈচিত্র্য তৈরির জিনগত প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গবেষণায় পিকেএস (PKS) নামের একটি এনজাইমের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। এই এনজাইমের কার্যক্রমে জিনগত পরিবর্তন ঘটলে পালকের রং তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে।
এক জোড়া রিংনেক ভায়োলেটের দাম কত?
রাজধানীর বিভিন্ন পোষা প্রাণীর বাজারে রিংনেক ভায়োলেটের দাম বিক্রেতা ও পাখির ধরন অনুযায়ী আলাদা। মিরপুরের শাহআলী মাজার এলাকার হাটে এক জোড়া পাখির দাম চাওয়া হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। কাটাবনের বাজারে এক জোড়ার দাম প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা বলেও জানা গেছে।
পাখি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ভায়োলেট রিংনেকের কিছু বিশেষ ধরন, যেমন অপালাইন, আরও বেশি দামে বিক্রি হতে পারে। এ ধরনের পাখির এক জোড়ার দাম চার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে বলে তাঁদের দাবি। তবে এসব দাম বাজার ও পাখির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
কাটাবনের পাখি ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান জানান, পাঁচ বছর আগেও এক জোড়া ভায়োলেট রিংনেকের সর্বোচ্চ দাম ছিল প্রায় ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বর্তমানে এক জোড়ার দাম বেড়ে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।
রিংনেক প্যারাকিট বছরে সর্বোচ্চ তিনবার পর্যন্ত প্রজনন করতে পারে। প্রতিবার চার থেকে ছয়টি ডিম দেওয়ার তথ্যও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে ডিমের সংখ্যা বা বাচ্চা ফোটার হার বেশি হলেই বাজারে নির্দিষ্ট রঙের পাখির সরবরাহ পর্যাপ্ত হবে, এমন নয়। কাঙ্ক্ষিত রঙের বাচ্চা পাওয়া এবং বড় করে তোলার বিষয়টিও দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
আমদানি করা যায় না কেন?
রিংনেক ভায়োলেটের দাম বেশি থাকার আরেকটি কারণ হিসেবে দেশে বৈধভাবে আমদানির সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী জানান, রিংনেক ভায়োলেটের মতো ভিন্ন রঙের পাখিগুলোও রিংনেক প্যারাকিটেরই বিশেষ রঙের ধরন। তবে বন্য পরিবেশে থাকা রিংনেক ও খাঁচায় প্রজনন করা রিংনেকের বৈজ্ঞানিক নাম একই হওয়ায় বর্তমানে এসব পাখি আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
বিষয়টি বৈজ্ঞানিক কমিটিতে আলোচনা করা হবে। কমিটি অনুমোদন দিলে ভবিষ্যতে আমদানির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ, পাখি পোষার অনুমতি থাকা আর সেটি বিদেশ থেকে আমদানি করার অনুমতি পাওয়া এক বিষয় নয়। তাই কেনার আগে পাখিটির উৎস ও প্রযোজ্য নিয়ম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
বন্য টিয়া আর খাঁচায় প্রজনন করা টিয়া এক নয়
বাংলাদেশে দেশীয় টিয়া ও টিয়াঠোঁটি গোত্রের একাধিক প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে মেটেমাথা টিয়া, ফুলমাথা টিয়া ও কালোবুক টিয়াঠোঁটির মতো প্রজাতি সংরক্ষণ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে।
বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, দেশীয় বন্য টিয়া ধরা, কেনাবেচা ও বাসায় পোষার ক্ষেত্রে আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে বন বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, খাঁচায় প্রজনন করা রিংনেক ভায়োলেটের মতো বিশেষ রঙের পাখি পোষার বিষয়টি আলাদা।
তাই কোনো টিয়া কেনার আগে সেটি দেশীয় বন্য পাখি কি না, নাকি বৈধভাবে প্রজনন করা পোষা পাখি, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
কেন এত দাম এই বেগুনি টিয়ার?
রিংনেক ভায়োলেটের দাম নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে তার বিশেষ পালকের রং, কাঙ্ক্ষিত রঙের পাখি উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এবং বাজারে সরবরাহ। এর সঙ্গে আমদানির বাধা যুক্ত হওয়ায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকতে পারে।
সবুজ টিয়ার মতো দেখতে হলেও বেগুনি আভার এই পাখি তাই সাধারণ পোষা পাখির পর্যায়ে নেই। বিশেষ রঙের পাখি সংগ্রহ করতে আগ্রহী ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা বেশি হওয়ায় এক জোড়ার দাম উঠছে দুই লাখ টাকারও ওপরে।
সিদ্দিকা/
