জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬: ডিডিও ফরওয়ার্ডের পর পে-ফিকেশনে কী হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ায় ডিডিওর ফরওয়ার্ডের পর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসাবরক্ষণ অফিসের। অনলাইন যাচাই, চূড়ান্ত অনুমোদন, ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি এবং স্বাক্ষরের নিয়ম নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ায় ডিডিওর (Drawing and Disbursing Officer) মাধ্যমে বেতন নির্ধারণী বিবরণী ফরওয়ার্ড করার পর সেটি হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাইয়ের পর্যায়ে যাওয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট তথ্য সঠিক পাওয়া গেলে অনলাইনে প্রতিপাদন বা অনুমোদন এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে অনলাইন বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে স্বাক্ষর লাগবে কি না, সার্ভিস বহি বা অডিট রেজিস্টারে কীভাবে তথ্য লিপিবদ্ধ হবে এবং কোনো অফিস অতিরিক্ত স্বাক্ষর চাইলে কর্মচারীদের করণীয় কী—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
ডিডিও ফরওয়ার্ড করার পর পে-ফিকেশনের পরবর্তী ধাপ কী?
ডিডিও বেতন নির্ধারণী বিবরণী হিসাবরক্ষণ অফিসে ফরওয়ার্ড করার পর সংশ্লিষ্ট অফিসের যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ পর্যায়ে কর্মচারীর বেতনসংক্রান্ত তথ্য, পূর্ববর্তী চাকরির বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় নথিতে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হতে পারে।
কোনো কর্মচারীর বিবরণী ১০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ফরওয়ার্ড করা হয়ে থাকলে সেটি এখন ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা শুধু ফরওয়ার্ডের তারিখ দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। ফাইলটি যাচাইাধীন, অনুমোদিত নাকি কোনো আপত্তির কারণে অপেক্ষমাণ—তা জানতে সংশ্লিষ্ট iBAS++ রেকর্ড বা হিসাবরক্ষণ অফিসের তথ্য যাচাই করতে হবে।
অর্থাৎ, ডিডিওর ফরওয়ার্ড সম্পন্ন হওয়া এবং চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া একই বিষয় নয়।
গেজেটের অনুচ্ছেদ ৩২-এ কী বলা হয়েছে?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর অনুচ্ছেদ ৩২-এর উপধারা (৬), (৭) ও (৮)-এ বেতন নির্ধারণী বিবরণী ফরওয়ার্ড, অনলাইন যাচাই, অনুমোদন এবং সার্ভিস বহি বা অডিট রেজিস্টারে তথ্য লিপিবদ্ধ করার বিষয়গুলো আলাদা করে উল্লেখ রয়েছে। এসব বিধানের ব্যাখ্যায় অনলাইন অনুমোদন ও নথিতে স্বাক্ষরের পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১. ডিডিওর দায়িত্ব
উপধারা (৬)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, গেজেটেড সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণী বিবরণী হিসাবরক্ষণ অফিসে ফরওয়ার্ড করার বিষয়টি ডিডিওর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সার্ভিস বহিতে পূর্ববর্তী চাকরি ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে iBAS++ থেকে প্রয়োজনীয় বিবরণী প্রিন্ট এবং সার্ভিস বহিসহ দাখিল করার প্রক্রিয়া থাকতে পারে।
২. হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই ও অনুমোদন
উপধারা (৭)-এর প্রদত্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হিসাবরক্ষণ অফিসে পৌঁছানো অনলাইন বিবরণী যাচাই করে তথ্য সঠিক পাওয়া গেলে তা অনলাইনে প্রতিপাদন বা অনুমোদন করা হবে। এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরির কথা বলা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিধানটির প্রদত্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনলাইন বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে হিসাবরক্ষণ অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীর ম্যানুয়াল স্বাক্ষর প্রয়োজন নেই। তবে এই ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে গেজেটের মূল কপি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা মিলিয়ে দেখা উচিত।
৩. সার্ভিস বহি ও অডিট রেজিস্টারে স্বাক্ষর
উপধারা (৮)-এর প্রদত্ত বর্ণনায় সার্ভিস বহি এবং অডিট রেজিস্টারে প্রয়োজনীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করার পাশাপাশি স্বাক্ষরের বিষয়টি রয়েছে।
-
নন-গেজেটেড কর্মচারী: প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সার্ভিস বহিতে নির্ধারিত বেতন ও ভেরিফিকেশন নম্বর লিপিবদ্ধ করে স্বাক্ষর করতে হয়।
-
গেজেটেড কর্মকর্তা: প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অডিট রেজিস্টারের নির্ধারিত অংশে বেতন ও ভেরিফিকেশন নম্বর লিপিবদ্ধ করে স্বাক্ষরের বিষয়টি আসে।
অর্থাৎ, অনলাইন বিবরণীতে স্বাক্ষর এবং সার্ভিস বহি বা অডিট রেজিস্টারে স্বাক্ষর—দুটি আলাদা বিষয়। এ পার্থক্য না বুঝলে পে-ফিকেশন অনুমোদন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
হিসাবরক্ষণ অফিস স্বাক্ষর চাইলে কী করবেন?
কিছু কর্মচারীর অভিজ্ঞতায় ডিডিওর স্বাক্ষর বা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত কপি চাওয়ার কথা উঠে এসেছে। তবে এসব অভিজ্ঞতা দিয়ে সব হিসাবরক্ষণ অফিসে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
স্বাক্ষর চাওয়া হলে প্রথমে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
প্রথমত, কোন নথিতে স্বাক্ষর চাওয়া হচ্ছে তা নিশ্চিত করুন। সেটি কি iBAS++ থেকে তৈরি অনলাইন বিবরণী, নাকি সার্ভিস বহি, অডিট রেজিস্টার বা অন্য কোনো দাপ্তরিক নথি?
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তা জানতে চান। অনলাইন বিবরণীতে স্বাক্ষর চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট অফিসের কাছে এর বিধিগত ভিত্তি বা প্রযোজ্য লিখিত নির্দেশনা জানতে চাওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত, যাচাই ছাড়া অনিয়মের অভিযোগ করবেন না। কোনো অফিস অতিরিক্ত নথি বা স্বাক্ষর চাইলে তার কারণ আগে বুঝে নেওয়া উচিত। লিখিত নির্দেশনা ও মূল বিধান যাচাই না করে সেটিকে গেজেটের পরিপন্থী বলে নিশ্চিতভাবে দাবি করা ঠিক হবে না।
পে-ফিকেশন অনুমোদিত হয়েছে কি না জানবেন যেভাবে
ডিডিও বিবরণী ফরওয়ার্ড করার পর নিজের ফাইলের বর্তমান অবস্থা জানতে নিচের বিষয়গুলো যাচাই করতে পারেন।
১. iBAS++-এ বেতন নির্ধারণী বিবরণীর বর্তমান অবস্থা কী—ফরওয়ার্ড করা, যাচাইাধীন, নাকি অনুমোদিত?
২. হিসাবরক্ষণ অফিস কোনো তথ্যগত ভুল, সার্ভিস বহির অসংগতি বা অতিরিক্ত নথির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে কি না?
৩. চূড়ান্ত অনুমোদন সম্পন্ন হলে ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি হয়েছে কি না?
৪. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সার্ভিস বহি বা অডিট রেজিস্টারে নির্ধারিত বেতন ও ভেরিফিকেশন নম্বর লিপিবদ্ধ হয়েছে কি না?
৫. দীর্ঘ সময় কোনো অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে যোগাযোগ করে ফাইলের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য আপত্তি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন কি না?
মনে রাখতে হবে, ডিডিওর ফরওয়ার্ডের তারিখ থেকে নির্দিষ্ট কোনো ফাইলের অনুমোদনের সময়সীমা বা বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করা যায় না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট রেকর্ড বা অফিসের তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ায় ডিডিওর ফরওয়ার্ডের পর হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই ও অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রদত্ত বিধান-বর্ণনা অনুযায়ী, অনলাইন অনুমোদনের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরির কথা রয়েছে। একই সঙ্গে সার্ভিস বহি ও অডিট রেজিস্টারে তথ্য লিপিবদ্ধ করা এবং স্বাক্ষরের বিষয়টিও আলাদা করে বুঝতে হবে।
তবে কোনো কর্মচারীর ফাইল অনুমোদিত হয়েছে কি না, সব অফিসে একই নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে কি না কিংবা অনলাইন বিবরণীতে স্বাক্ষর চাওয়ার নির্দিষ্ট বিধিগত ভিত্তি কী—এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য গেজেটের মূল কপি, সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের প্রকৃত তথ্য যাচাই করা জরুরি।
আপনার পে-ফিকেশন ফরওয়ার্ড হয়েছে মানেই চূড়ান্ত অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে—এমন নয়। তাই নিজের ফাইলের বর্তমান অবস্থা, আপত্তি থাকলে তার কারণ এবং ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি হয়েছে কি না, সেগুলো নিশ্চিত করুন।
সোহাগ/
