| ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

পাঁচ বছরে বজ্রপাতে ১,৫৩০ মৃত্যু

জাতীয় ডেস্ক . বিনোদন৬৯.কম
২০২৬ অক্টোবর ২০ ১৮:৪৮:৪১
পাঁচ বছরে বজ্রপাতে ১,৫৩০ মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগের কথা বেশি আলোচনায় এলেও প্রাণহানির হিসাবে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে বজ্রপাত। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ছয় ধরনের দুর্যোগে ২ হাজার ৫৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৫৩০ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে এসব দুর্যোগে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি প্রাণ গেছে বজ্রপাতে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘দুর্যোগের ধরন, ক্ষয়ক্ষতি ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, বজ্রপাত, ভূমিকম্প ও পাহাড়ধসে প্রাণহানি এবং আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এতে তুলে ধরা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অগ্রাধিকার তালিকায় বজ্রপাতকে প্রথম স্থানে রাখা হয়েছে।

পাঁচ বছরে কোন দুর্যোগে কত মানুষের মৃত্যু?

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ছয় ধরনের দুর্যোগে প্রাণহানির চিত্রে বজ্রপাতের অবস্থান সবার ওপরে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে অগ্নিকাণ্ডে।

দুর্যোগভিত্তিক মৃত্যুর হিসাব হলো:

  • বজ্রপাত: ১ হাজার ৫৩০ জন

  • অগ্নিকাণ্ড: ৬৫৪ জন

  • বন্যা: ১৯৭ জন

  • পাহাড়ধস: ৯০ জন

  • ঘূর্ণিঝড়: ৫২ জন

  • ভূমিকম্প: ১০ জন

সব মিলিয়ে এসব দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৫৩৩ জন। এর মধ্যে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বজ্রপাতকে শুধু মৌসুমি আবহাওয়াজনিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মাঠে কাজ করা কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং খোলা জায়গায় অবস্থানকারীদের জন্য এটি বড় ধরনের প্রাণঘাতী ঝুঁকি।

আর্থিক ক্ষতিতে সবচেয়ে এগিয়ে বন্যা

প্রাণহানির হিসাবে বজ্রপাত সবচেয়ে ভয়াবহ হলেও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বন্যায়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, বজ্রপাত ও ভূমিকম্পে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা।

এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ২৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। ঘূর্ণিঝড়ে ১১ হাজার ৭৩৬ কোটি, অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ২০ কোটি, ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি এবং বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

অর্থাৎ, বন্যা দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, কৃষি ও মানুষের জীবিকার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে বজ্রপাতের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও প্রাণহানি অনেক বেশি।

এ কারণে দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনায় শুধু আর্থিক ক্ষতির হিসাব নয়, মানুষের জীবনহানির ঝুঁকিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

মার্চ থেকে বাড়ে বজ্রপাত, মে মাসে সর্বোচ্চ ঝুঁকি

বাংলাদেশে সারা বছর সমান হারে বজ্রপাত হয় না। মাসভিত্তিক প্রবণতা অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বজ্রপাত তুলনামূলক কম থাকে। মার্চ থেকে এর প্রবণতা বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলে ঝুঁকি আরও বাড়ে এবং মে মাসে বজ্রপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর জুন ও জুলাইয়ে প্রবণতা কমতে থাকে। সেপ্টেম্বরে আবার কিছুটা বৃদ্ধি দেখা যায়।

এই মৌসুমি প্রবণতা বজ্রপাত মোকাবিলার প্রস্তুতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, কৃষকদের সচেতন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

কৃষিকাজের মৌসুমে অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় খোলা মাঠে কাজ করেন। আকাশে মেঘ জমলেও কাজ শেষ করার তাগিদে তাঁরা নিরাপদ স্থানে যেতে দেরি করতে পারেন। কাছাকাছি আশ্রয় না থাকলে বজ্রপাতের সময় দ্রুত নিরাপদ জায়গায় পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া যথেষ্ট নয়। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং কীভাবে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়া সম্ভব, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঝুঁকি বেশি

দেশের প্রায় সব অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে এর প্রবণতা বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলেও তুলনামূলকভাবে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।

বজ্রপাতে নিহতদের বড় অংশ কৃষক হওয়ায় বিষয়টি গ্রামীণ জীবিকা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

কৃষকেরা ফসল রোপণ, পরিচর্যা, ধান কাটা ও ফসল ঘরে তোলার মতো কাজে দীর্ঘ সময় মাঠে থাকেন। খারাপ আবহাওয়ার কারণে কাজ বন্ধ করলে আর্থিক ক্ষতি বা ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে সতর্কবার্তা পেলেও অনেকের পক্ষে সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ছেড়ে চলে আসা সহজ হয় না।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কৃষিপ্রধান এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে সতর্কবার্তা পৌঁছানো এবং বজ্রপাতের সময় করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করেও কেন কমছে না মৃত্যু?

বাংলাদেশে ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপরও পাঁচ বছরে ১ হাজার ৫৩০ জনের মৃত্যু দেখাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারার মতে, বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কার্যকর প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে এবং নিহতদের বড় অংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ।

তিনি গবাদিপশুর মৃত্যুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা বলেছেন। তাঁর হিসাবে, মানুষের মৃত্যুর তুলনায় গবাদিপশুর মৃত্যু তিন থেকে চার গুণ হতে পারে। পাশাপাশি বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।

এ থেকে বোঝা যায়, বজ্রপাত মোকাবিলায় শুধু সতর্কবার্তা কিংবা প্রচারাভিযানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নিরাপদ আশ্রয়, জরুরি চিকিৎসা, মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন?

বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

১. আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানো: ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুমে স্থানীয় পর্যায়ে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

২. নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা: কৃষিপ্রধান ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উপযুক্ত নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করে আশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করা দরকার।

৩. কৃষকদের সচেতন করা: বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে কাজ বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে কৃষকদের নিয়মিত জানাতে হবে।

৪. আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা: বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপদ্ধতি উন্নত করা জরুরি।

৫. গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নেওয়া: মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি গবাদিপশুর মৃত্যু ও আর্থিক ক্ষতির নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

তবে কোনো আশ্রয়স্থলকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার আগে তার নকশা ও বজ্রপাত-সুরক্ষা ব্যবস্থা যথাযথ কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাণহানি কমাতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ

পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বজ্রপাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বন্যা আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটালেও প্রাণহানির হিসাবে বজ্রপাত অনেক এগিয়ে।

বিশেষ করে কৃষক ও মাঠে কাজ করা মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, সময়মতো সতর্কবার্তা এবং জরুরি চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি, কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং কোন উদ্যোগে প্রাণহানি কমছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার।

দুর্যোগ হিসেবে বজ্রপাতের স্বীকৃতি দেওয়ার পর এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই স্বীকৃতিকে বাস্তব নিরাপত্তায় রূপান্তর করা। কার্যকর প্রস্তুতি ও মাঠপর্যায়ে সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা গেলে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঝুঁকি কমানোর পথে এগোনো সম্ভব।

সোহাগ/

আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ

ক্রিকেট

১৬ ডিসেম্বর হতে পারে আইপিএলের নিলাম, কোথায় হবে আয়োজন

১৬ ডিসেম্বর হতে পারে আইপিএলের নিলাম, কোথায় হবে আয়োজন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) ২০২৭ মৌসুমের মিনি নিলাম আগামী ১৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে ...

লিটন-মিরাজের শতরানের জুটিতে লাঞ্চের আগে বাংলাদেশের লিড ৪৪৩

লিটন-মিরাজের শতরানের জুটিতে লাঞ্চের আগে বাংলাদেশের লিড ৪৪৩

নিজস্ব প্রতিবেদক: আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন বাংলাদেশের লিটন দাস। ...

ফুটবল

আর্জেন্টিনা বনাম উরুগুয়ে ম্যাচ কবে, জেনে নিন সূচি

আর্জেন্টিনা বনাম উরুগুয়ে ম্যাচ কবে, জেনে নিন সূচি

নিজস্ব প্রতিবেদক: লিওনেল মেসিকে ছাড়াই নতুন অধ্যায়ের শুরু করতে যাচ্ছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতিতে ...

রোনালদোকে টানা ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা!

রোনালদোকে টানা ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা!

নিজস্ব প্রতিবেদক: পর্তুগাল জাতীয় দলের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও ২৫৫ ইউরো জরিমানা ...