প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ আমির হামজার, বললেন ‘হাসিনার সময়ও এমন হতো’
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পুলিশের নিরাপত্তা প্রতিবেদন না পাওয়ায় মুফতি আমির হামজার তাফসিরুল কোরআন মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়নি। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে তাফসিরুল কোরআন মাহফিলের অনুমতি না পাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা। নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা সম্ভব না হওয়ায় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একই ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে গোদাগাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠে মাহফিলটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ‘মানব কল্যাণ পরিষদ’ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এবং প্রধান আলোচক হিসেবে মুফতি আমির হামজার উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্যান্ডেল গুটিয়ে নেন আয়োজকেরা।
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ইসমাইল হক জানান, গত ১৩ অক্টোবর মাহফিল আয়োজনের অনুমতি চেয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে আবেদন করা হয়েছিল।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর ইউএনওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে জানানো হয়, অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা বিষয়ে পুলিশের প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে অতিথিদের বিষয়টি জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয় এবং প্যান্ডেল খুলে ফেলা হয়।
গোদাগাড়ীর ইউএনও ইসরাত জাহান বলেন, পুলিশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত ছাড়পত্র ছাড়া এত বড় জনসমাগমের অনুমতি দেওয়ার নিয়ম নেই। এ বিষয়ে পুলিশের প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। সেটি হাতে না পাওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, রাজশাহীর পুলিশ সুপার মামুন অর রশিদ জানান, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। উপজেলা বা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়ে থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাহফিলের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে ১৮ অক্টোবর রাতে নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মুফতি আমির হামজা।
পোস্টে তিনি জানতে চান, কোন আইনি ও সুনির্দিষ্ট কারণে একটি ধর্মীয় মাহফিলের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব কোনো উদ্বেগ থাকলে তা যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। অস্পষ্ট অভিযোগ বা অজুহাতে ধর্মীয় সমাবেশের অধিকার সীমিত করা হলে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
আমির হামজা আরও প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্র, সমাজ, সুশাসন, দুর্নীতি, জুলুম ও মানুষের অধিকার নিয়ে আলোচনা করা ইসলামী শিক্ষার বাইরে কি না। তাঁর মতে, অন্যায়ের প্রতিবাদ কিংবা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অসংগতি নিয়ে কথা বলাকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হলে তার জবাব যুক্তি ও নীতির ভিত্তিতে দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ধর্মীয় আলোচনা ও রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে মতপ্রকাশের মধ্যে পার্থক্য কোথায়, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সিদ্ধান্তের যথাযথ ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এক ভিডিও বার্তায় অধ্যাপক মুজিবুর রহমান মাহফিল বন্ধের সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায় ও বেআইনি’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, ধর্মীয় আলোচনা ও গণতান্ত্রিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার প্রবণতা বিগত সরকারের সময়কার পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
তিনি এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। পাশাপাশি, যেসব কর্মকর্তা এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মুজিবুর রহমানের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় অধিকার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও স্বচ্ছ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হবে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু গোদাগাড়ীর এই ঘটনা সেই প্রত্যাশা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি।
এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত পুলিশের নিরাপত্তা প্রতিবেদন না পাওয়ার বিষয়টিই সামনে এসেছে। তবে ঠিক কী ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল, কোনো নির্দিষ্ট ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছিল কি না কিংবা পুলিশের প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছিল, তা প্রকাশিত বক্তব্যে স্পষ্ট হয়নি।
ফলে মাহফিলের অনুমতি না দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যরা।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুমতি না পাওয়ার কারণে নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে নিরাপত্তা প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য ও প্রশাসনের চূড়ান্ত অবস্থান জানা গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
সোহাগ/
