বাবার মৃত্যুর পর জমি নিজের নামে নামজারি করতে কী করবেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাবার মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া জমি উত্তরাধিকার সূত্রে নিজের নামে নামজারি করতে হলে প্রথমে ওয়ারিশ সনদ, জমির খতিয়ান ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে হবে। এরপর অনলাইনে ই-নামজারির আবেদন করে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের যাচাই ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।
তবে জমি নিজের নামে নামজারি করার অর্থ এই নয় যে অন্য ওয়ারিশদের অংশ বাদ দিয়ে পুরো জমি নিজের নামে নেওয়া যাবে। উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ বিবেচনায় নিয়েই জমির রেকর্ড হালনাগাদ করতে হয়। কার কতটুকু অংশ প্রাপ্য, তা নির্ভর করে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন ও পারিবারিক পরিস্থিতির ওপর।
বাবার মৃত্যুর পর জমি নামজারি করতে যেসব কাগজ লাগতে পারে
আবেদনের আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা ভালো। সাধারণভাবে নিচের নথিগুলো প্রয়োজন হতে পারে:
-
বাবার মৃত্যু সনদ।
-
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে নেওয়া ওয়ারিশ সনদ।
-
বাবার নামে থাকা জমির খতিয়ান বা পর্চার কপি।
-
আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা প্রযোজ্য পরিচয়পত্র।
-
সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
-
জমির মালিকানা ও পূর্ববর্তী রেকর্ডের প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র।
-
প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ওয়ারিশদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট তথ্য।
জমির ধরন, পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সরকারি ই-নামজারি নির্দেশিকা দেখে নেওয়া উচিত।
অনলাইনে নামজারির আবেদন করবেন যেভাবে
বাংলাদেশে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি ব্যবস্থার মাধ্যমে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির আবেদন করা যায়। আবেদন করতে সাধারণত নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে।
প্রথম ধাপ: সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন সিস্টেমের ওয়েবসাইট mutation.land.gov.bd ব্যবহার করুন। আবেদনের জন্য জমি পাওয়ার উৎস হিসেবে উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্তির বিষয়টি নির্বাচন করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: আবেদনকারীর তথ্য পূরণ করুন
নিজের নাম, পরিচয়পত্রের তথ্য, যোগাযোগের তথ্য এবং জমির অবস্থানসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য নির্ভুলভাবে লিখুন। জমির মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বরের তথ্য বিদ্যমান রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
তৃতীয় ধাপ: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করুন
ওয়ারিশ সনদ, খতিয়ান, পরিচয়পত্র, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য নথির স্ক্যান কপি নির্দেশনা অনুযায়ী আপলোড করুন। নামের বানান বা জমির বিবরণে অমিল থাকলে আবেদনের আগে তা যাচাই করুন।
চতুর্থ ধাপ: নির্ধারিত ফি পরিশোধ করুন
সরকারি ব্যবস্থায় প্রদর্শিত নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে আবেদন জমা দিন। আবেদনের নম্বর ও পেমেন্টের রসিদ সংরক্ষণ করুন।
পঞ্চম ধাপ: আবেদন ও সিদ্ধান্তের অবস্থা দেখুন
আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কাগজপত্র ও জমির রেকর্ড যাচাই করতে পারে। কোনো ঘাটতি বা আপত্তি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বা অতিরিক্ত নথি দিতে হতে পারে। আবেদন অনুমোদিত হলেই নামজারি খতিয়ান সংগ্রহ করুন।
ই-নামজারির সরকারি নির্দেশিকায় নির্ভুল তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব ওয়ারিশের নামে নামজারি, নাকি আলাদা খতিয়ান?
বাবার মৃত্যুর পর জমি নামজারি করার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি মূলত দুইভাবে করা যেতে পারে।
১. সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি
সব ওয়ারিশ একসঙ্গে আবেদন করে একই খতিয়ানে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করা যায়। শুধু যৌথ নামজারির জন্য বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন হয় না; ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে হয়।
২. আলাদা আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে
ওয়ারিশরা জমি ভাগ করে প্রত্যেকে নিজের অংশের জন্য পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে সাধারণত সবার সম্মতিতে আপস বণ্টননামা দলিল তৈরি ও নিবন্ধন করতে হয়। এরপর সেই দলিলের ভিত্তিতে পৃথক নামজারির আবেদন করা যায়।
এই বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে।
বাবার জমি কি শুধু একজন সন্তানের নামে করা যাবে?
বাবার মৃত্যুর পর জমি শুধু একজন সন্তানের নামে নামজারি করতে হলে ওই সন্তানের পুরো জমির মালিক হওয়ার বৈধ ভিত্তি থাকতে হবে। অন্য ওয়ারিশদের আইনগত অংশ উপেক্ষা করে কেবল নিজের নামে পুরো জমি নামজারি করানো উচিত নয়।
অন্য ওয়ারিশরা তাঁদের অংশ বৈধভাবে হস্তান্তর করেছেন কি না, নিবন্ধিত বণ্টননামা আছে কি না, কিংবা প্রযোজ্য আইনে অন্য কোনো ভিত্তি রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরোধ থাকলে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
নামজারির সরকারি ফি কত?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসেবা ফি তালিকায় মিউটেশনের জন্য আবেদন কোর্ট ফি ২০ টাকা, নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা এবং ডিসিআর ফি ১,১০০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত এই তিনটি ফি মিলিয়ে মোট ১,১৭০ টাকা।
ফি পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদন করার সময় সরকারি ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত সর্বশেষ ফি যাচাই করে পরিশোধ করুন। সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়া কাউকে অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য নন।
আবেদন করার আগে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
-
ওয়ারিশ সনদে সব বৈধ ওয়ারিশের নাম আছে কি না যাচাই না করা।
-
খতিয়ান, দলিল ও পরিচয়পত্রে নামের অমিল রেখে আবেদন করা।
-
জমির দাগ বা খতিয়ান নম্বর ভুল লেখা।
-
যৌথ নামজারি ও পৃথক খতিয়ানের প্রক্রিয়াকে একই মনে করা।
-
আবেদন জমা দিয়ে রসিদ ও আবেদন নম্বর সংরক্ষণ না করা।
-
অনুমোদনের আগে জমি সম্পূর্ণ নিজের নামে হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া।
বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি নামজারি করতে প্রথমে ওয়ারিশ সনদ ও জমির রেকর্ড সংগ্রহ করুন। এরপর ঠিক করুন, সব ওয়ারিশের নামে যৌথ খতিয়ান করবেন, নাকি বৈধ বণ্টনের ভিত্তিতে পৃথক খতিয়ান করবেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ই-নামজারির আবেদন জমা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করুন।
সরকারি ভূমিসেবা ও নির্দেশনার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং ই-নামজারি সিস্টেম ব্যবহার করতে পারেন।
