২২ বছর আগের নিয়োগ দেখিয়ে চারজনের এমপিও
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পাকড়ি কলেজে ২২ বছর আগে নিয়োগ পাওয়ার দাবি করে চারজন প্রদর্শকের এমপিওভুক্তি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৪ সালে নিয়োগ দেখিয়ে সম্প্রতি তাঁদের এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। তবে ওই চারজনের নিয়োগের সময়কার নথি, কলেজের জনবল তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত হওয়া চারজন হলেন পদার্থবিজ্ঞানের প্রদর্শক জুবায়ের হোসেন, ভূগোলের মোজাহারুল ইসলাম, জীববিজ্ঞানের আবদুল্লাহ আল মাসউদ এবং প্রকৌশল অঙ্কনের আবুল কালাম আজাদ। তাঁদের এমপিওভুক্তির আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার প্রদর্শক গত আগস্ট থেকে কলেজে আসা শুরু করেন এবং হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। অথচ তাঁদের দাবি, তাঁরা ২০০৪ সালেই নিয়োগ পেয়েছিলেন। এত বছর কলেজে উপস্থিত না থাকার কারণ হিসেবে তাঁরা বেতন না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, কলেজের স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষকদের কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা এর আগে ওই চারজনকে কলেজে দেখেননি। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কলেজের একটি বোর্ডে থাকা ৪৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর তালিকায় তাঁদের নাম ছিল না।
এ ছাড়া বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যভান্ডারে কলেজের জনবলসংক্রান্ত তথ্যেও তাঁদের নাম পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
চারজনের এমপিওভুক্তি নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, ২০০৪ সালের নিয়োগসংক্রান্ত নথিতে তৎকালীন অধ্যক্ষ, গভর্নিং বডির সভাপতি এবং নিয়োগ কমিটির সদস্যদের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে আবেদন করা হয়েছে।
কলেজের এক শিক্ষকের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্তির আবেদনের সঙ্গে একাধিক নথি জমা দিতে হয়। এসব নথির সত্যতা যাচাই করা হলে নিয়োগের সময়কার তথ্য ও স্বাক্ষর সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।
তবে নথি জাল করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের উল্লেখ নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চারজনের এমপিওভুক্তির আবেদন যাচাইয়ের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) রাজশাহী অঞ্চলের সহকারী পরিচালক সাদিকুল ইসলামের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
সাদিকুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি তাঁদের পদ জনবল কাঠামোর বাইরে এবং এমপিও পাওয়ার যোগ্য নয় বলে মতামত দিয়েছিলেন। পরে আঞ্চলিক পরিচালক অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর তাঁদের এমপিও অনুমোদন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অনুমোদন কী কী নথির ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল এবং পূর্ববর্তী আপত্তি কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত হওয়ার আগে চারজনই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ বিমা প্রতিষ্ঠানে, কেউ টেলিযোগাযোগ খাতে, কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং কেউ ওষুধশিল্পে কাজ করতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁরা আগস্টে আগের চাকরি ছেড়ে কলেজে যোগ দিতে শুরু করেন। তাঁদের কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, বেতন না পাওয়ার কারণে এতদিন কলেজে নিয়মিত আসেননি।
এই বক্তব্য এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথির মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
চারজনের এমপিও অনুমোদন নিয়ে আঞ্চলিক পরিচালক অধ্যাপক হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো চূড়ান্ত তদন্তের ফল বা আদালতের সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাঁর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও সাংবাদিকেরা যোগাযোগ করতে পারেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
পাকড়ি কলেজের চার প্রদর্শকের এমপিওভুক্তি নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তিতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
- ২০০৪ সালের নিয়োগসংক্রান্ত মূল নথি ও রেজুলেশন।
- নিয়োগ কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর ও সিলের সত্যতা।
- কলেজের পুরোনো জনবল তালিকা ও অডিট প্রতিবেদন।
- এমপিও আবেদনের সময় জমা দেওয়া নথি এবং অনুমোদনের ভিত্তি।
- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য।
এসব তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে নিয়োগ ও এমপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা সম্ভব।
পাকড়ি কলেজের চার প্রদর্শকের এমপিওভুক্তি নিয়ে ওঠা অভিযোগ এখন নথিপত্র যাচাই ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে জালিয়াতি কিংবা দুর্নীতির জন্য দায়ী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
সোহাগ/
