তিস্তা মহাপরিকল্পনা ঘিরে নতুন সমীকরণ!
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, জীবিকা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে তিস্তা নদী। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন পানি ব্যবস্থাপনার গণ্ডি ছাড়িয়ে আঞ্চলিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা, ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং নেদারল্যান্ডসের আগ্রহ—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশটির মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত। ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই করিডোরের কাছাকাছি বাংলাদেশের তিস্তা অববাহিকা অবস্থিত হওয়ায় নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটির কৌশলগত দিক নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। চীন প্রকল্পটিতে যুক্ত হলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের মতো কাজে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির একটি নিরাপত্তাগত দিকও রয়েছে। শিলিগুড়ি করিডোরের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উপস্থিতি নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন। যদিও তিস্তা মহাপরিকল্পনার কারণে ভারতের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় নেদারল্যান্ডসের আগ্রহের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। নদী ব্যবস্থাপনা, পানি নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ে দেশটির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কাজে লাগতে পারে।
প্রকল্পে নেদারল্যান্ডসের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি বাস্তব কোনো চুক্তি, অর্থায়ন বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে রূপ নিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে চীন ও ভারতের বাইরে অন্য কোনো দেশের কারিগরি বা অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশের সামনে বিকল্প সহযোগিতার পথ প্রসারিত হতে পারে।
তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহের ওপর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রা অনেকাংশে নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি এই অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে কার্যকর সমাধানের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে নদীটির পানিসম্পদ পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার, পানি সংরক্ষণ এবং বন্যা মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের সুফল পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের নকশা, অর্থায়ন, পরিবেশগত প্রভাব এবং বাস্তবায়নব্যবস্থার ওপর। তাই কেবল কোন দেশ প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে, সেটিই নয়—বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চীন, ভারত ও ইউরোপের কোনো দেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে আরও বিস্তৃত কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় করে তুলতে পারে। তবে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
একদিকে উত্তরাঞ্চলের মানুষের পানির চাহিদা ও জীবিকা রক্ষার প্রশ্ন, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিবেচনা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারিত হবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্বচ্ছ অর্থায়ন, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রকল্পটি যেন টেকসই ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সোহাগ/
