ইলিশের নামে চন্দনা ও সুরমা মাছ বিক্রি! আসল ইলিশ চিনবেন যেভাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: ইলিশ কিনতে গিয়ে কিংবা হোটেলে ইলিশ খেতে বসে একই নামে অন্য মাছ পরিবেশন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে। বিশেষ করে চন্দনা ইলিশ ও সুরমা মাছকে কখনো কখনো ইলিশ নামে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দেখতে কিছুটা মিল থাকলেও এই মাছগুলোর প্রজাতি, গঠন ও বৈশিষ্ট্যে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য।
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম *Tenualosa ilisha*। অন্যদিকে চন্দনা ইলিশ নামে পরিচিত মাছটি আলাদা প্রজাতির। আর সুরমা মাছের সঙ্গে ইলিশের সরাসরি প্রজাতিগত সম্পর্ক নেই। তাই মাছ কেনার সময় কয়েকটি বৈশিষ্ট্য জানা থাকলে আসল ইলিশ শনাক্ত করতে সুবিধা হতে পারে।
ইলিশ সাধারণত রুপালি রঙের মাছ। এর দেহ দুই পাশে চাপা এবং পেটের দিকে ধারালো আঁশের মতো খাঁজ থাকে। মাছটি মূলত সামুদ্রিক হলেও প্রজননের সময় নদীতে আসে। পদ্মা-মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীতে ইলিশের বিচরণ দেখা যায়।
ইলিশের ছোট বাচ্চাকে বলা হয় জাটকা। এটি আলাদা কোনো প্রজাতি নয়, বরং ইলিশেরই ছোট বয়সের পর্যায়। তাই আকারে ছোট হলেই কোনো মাছকে চন্দনা বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। জাটকা ধরা ও বিক্রির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নির্দিষ্ট আইনগত নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
ইলিশের চড়া দাম এবং বাজারে চাহিদার কারণে মাছটির সঠিক পরিচয় জানা ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কাটা বা রান্না করা মাছের ক্ষেত্রে শুধু দেখে প্রজাতি শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
চন্দনা ইলিশ নামটি সাধারণত *Tenualosa toli* প্রজাতির মাছের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এটি ইলিশের কাছাকাছি গোত্রের হলেও আসল ইলিশ নয়। উপকূলীয় পানি, মোহনা ও জোয়ার-ভাটার নদীতে এই মাছ পাওয়া যায়।
চন্দনা মাছের দেহ রুপালি, কখনো তাতে হলদে আভা দেখা যায়। ফুলকার পেছনে অস্পষ্ট কালচে ছাপ থাকতে পারে। এর ওপরের চোয়ালের মাঝখানেও ছোট খাঁজ দেখা যায়। দেখতে ইলিশের মতো মনে হলেও প্রজাতি ও স্বাদে পার্থক্য রয়েছে।
অঞ্চলভেদে এই মাছের নামেও ভিন্নতা আছে। কোথাও একে ‘চন্দনা ইলিশ’, আবার কোথাও ‘ফুইট্টা ইলিশ’ বলা হয়। তবে স্থানীয় নামের ওপর নির্ভর করে মাছের পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না।
আরেকটি বিষয় হলো, ‘চন্দনা’ নামটি সব জায়গায় একই প্রজাতির মাছ বোঝাতে ব্যবহৃত হয় না। *Sardinella melanura* নামের একটি সামুদ্রিক মাছকেও কোথাও কোথাও চন্দনা ইলিশ বা কাছাকাছি স্থানীয় নামে ডাকা হয়। এ কারণে মাছের বৈজ্ঞানিক পরিচয় জানা থাকলে বিভ্রান্তি কমে।
সুরমা নামে পরিচিত কিং ম্যাকেরেলের বৈজ্ঞানিক নাম *Scomberomorus commerson*। এটি ম্যাকেরেল পরিবারের মাছ। ইলিশের মতো দেখতে রুপালি আভা থাকলেও দেহের গঠন ও গায়ের দাগে পার্থক্য রয়েছে।
সুরমা মাছের দেহ লম্বাটে এবং দুই পাশ চাপা। পিঠ সাধারণত নীলচে-রুপালি, আর পেটের দিক সাদাটে। এর শরীরে সারি সারি কালচে খাড়া দাগ দেখা যায়, যা ইলিশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নয়। সুরমার চোয়ালে শক্ত ও ধারালো দাঁতও থাকে।
অঞ্চলভেদে এই মাছকে ‘ডোরা মাইট্টা’ বা ‘চম্পা’ নামেও ডাকা হতে পারে। তাই বাজারে সুরমা মাছকে ইলিশ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলে ক্রেতার উচিত মাছটির প্রকৃত নাম সম্পর্কে জেনে নেওয়া।
- ইলিশ: বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha। রুপালি দেহ, পরিচিত ইলিশের গঠন এবং প্রজননের সময় নদীতে আসার বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
- চন্দনা সাধারণত Tenualosa toli প্রজাতিকে বোঝায়। ইলিশের কাছাকাছি দেখতে হলেও এটি আলাদা প্রজাতি।
- সুরমা: কিং ম্যাকেরেল নামে পরিচিত Scomberomorus commerson*। দেহ লম্বাটে এবং গায়ে খাড়া কালচে দাগ থাকে।
মনে রাখতে হবে, মাছের আকার, রং কিংবা একটি বৈশিষ্ট্য দেখেই শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায় না। একই স্থানীয় নামে একাধিক প্রজাতির মাছ পরিচিত হতে পারে।
ইলিশ বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতি ও উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। চাহিদা বেশি থাকায় এর দামও অনেক সময় তুলনামূলক বেশি থাকে। এই পরিস্থিতিতে অন্য মাছকে ইলিশ বলে বিক্রি করা হলে ক্রেতা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
আস্ত মাছের ক্ষেত্রে গঠন, গায়ের দাগ, মাথা ও চোয়ালের বৈশিষ্ট্য দেখে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু মাছ কেটে ফেলা হলে বা রান্না করা অবস্থায় পরিবেশন করা হলে পার্থক্য বোঝা অনেক কঠিন। তাই শুধু রং কিংবা স্বাদের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
মাছ কেনার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে পারেন:
১. সম্ভব হলে কাটা মাছের বদলে আস্ত মাছ কিনুন, যাতে শরীরের গঠন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
২. মাছের গায়ে খাড়া কালচে দাগ আছে কি না খেয়াল করুন। সুরমা মাছের ক্ষেত্রে এমন দাগ গুরুত্বপূর্ণ শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য।
৩. শুধু ছোট আকার দেখে মাছকে চন্দনা ভাববেন না। ছোট ইলিশও থাকতে পারে, যা জাটকা নামে পরিচিত।
৪. বিক্রেতার কাছে মাছের নাম ও উৎস সম্পর্কে জানতে চান। স্থানীয় নামের পাশাপাশি প্রজাতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করুন।
৫. হোটেল বা রেস্তোরাঁয় ইলিশ অর্ডার করলে মাছটির পরিচয় জেনে নিতে পারেন। পরিবেশিত মাছ নিয়ে সন্দেহ হলে বিক্রেতার কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন।
ইলিশ, চন্দনা ও সুরমা—প্রতিটি মাছেরই নিজস্ব পরিচয় ও খাদ্যগুণ রয়েছে। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এক প্রজাতির মাছকে অন্য প্রজাতি বলে বিক্রি করা হয়। এতে ক্রেতা যেমন বিভ্রান্ত হন, তেমনি বাজারে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে কেনাকাটাও বাধাগ্রস্ত হয়।
তাই মাছ কেনার সময় শুধু নাম বা দামের ওপর নির্ভর না করে এর গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা রাখা ভালো। আর কোনো মাছের পরিচয় নিশ্চিত না হলে অভিজ্ঞ মৎস্য বিক্রেতা বা মৎস্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
সোহাগ/
