বিশ্ববাজারে তেলের দাম পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ
নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম। শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও এক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার ঝুঁকিতে পড়া বাজারের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যা দামের ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি বাজারের জন্য আন্তর্জাতিক দামের এই ওঠানামা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার প্রভাব দেশের ভোক্তা পর্যায়ে কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে আমদানি ব্যয়, সরবরাহ পরিস্থিতি, সরকারি মূল্য নির্ধারণ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৮৬ ডলারে ওঠে। লেনদেনের একপর্যায়ে দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। মে মাসের পর এই প্রথম ব্রেন্টের দাম আবার ওই পর্যায়ে পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৪১ ডলারে দাঁড়ায়। এক মাসের মধ্যে এই প্রথম তেলটির দাম ১০০ ডলার অতিক্রম করে।
ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চমার্ক। এগুলোর দাম বাড়লে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর সম্ভাব্য ক্রয়ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বাস্তবে আমদানি ব্যয় নির্ভর করে চুক্তির ধরন, তেলের মান, পরিবহন খরচ ও অন্যান্য বিষয়েও।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে তেলের উৎপাদন ও পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ।
এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে জাহাজের নিরাপত্তা, পরিবহন এবং যুদ্ধঝুঁকির বিমা ব্যয়ও বাড়তে পারে।
তেলের বাজারে শুধু বাস্তবে সরবরাহ কমে যাওয়াই দামের ওপর প্রভাব ফেলে না। ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় সৌদি আরবের বিকল্প তেল রপ্তানি পথের গুরুত্ব বেড়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করা যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার ইয়ানবুর দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। ইয়ানবু সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্রগুলোর একটি।
জ্বালানিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক শ্রেইনার পার্কার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ইয়ানবুতে সম্ভাব্য হামলা উদ্বেগজনক। কারণ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে এই বন্দরের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।
বিকল্প রপ্তানি পথও যদি নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে তেল পরিবহনে নতুন বাধা তৈরি হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ।
প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলা বৃদ্ধি এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হামলার ঝুঁকিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু তেলের সরবরাহ নয়, পরিবহন সময় ও ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বাংলাদেশ জ্বালানি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে।
জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ও উৎপাদন খরচেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কত দিন উঁচু থাকে, আমদানির শর্ত কী এবং দেশের জ্বালানি মূল্যনীতি কীভাবে পরিচালিত হয়, তার ওপর।
এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে পেট্রল, অকটেন বা ডিজেলের দাম অবিলম্বে বাড়বে। দেশের খুচরা মূল্য পরিবর্তনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও সরকারি ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগের মূল জায়গা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ কতটা নিরাপদ থাকে। হরমুজ প্রণালি ও সৌদি আরবের বিকল্প রপ্তানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে চাপ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে পরিস্থিতি শান্ত হলে এবং তেল পরিবহন স্বাভাবিক থাকলে দামের ঊর্ধ্বগতির চাপ কমার সুযোগ রয়েছে। তাই আগামী দিনে তেলের বাজার কোন দিকে যাবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে সংঘাতের গতিপ্রকৃতি ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।
বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ব্যয়ের পরিবর্তন দেশের আমদানি, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সোহাগ/
