গ্রামবাংলায় কমছে রঙিন মাছরাঙা, পেছনে যেসব কারণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: পুকুরপাড়ে বাঁশের খুঁটিতে বসে থাকা, পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মুহূর্তেই মাছ শিকার করা। গ্রামবাংলার চিরচেনা এই দৃশ্যের অন্যতম আকর্ষণ মাছরাঙা। উজ্জ্বল রঙের এই শিকারি পাখি একসময় গ্রামের পুকুর, খাল, বিল ও নদীর পাড়ে নিয়মিত দেখা যেত। কিন্তু আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, জলাশয় কমে যাওয়া, খাদ্যসংকট ও পাখি শিকারের মতো নানা কারণে মাছরাঙাসহ দেশীয় অনেক পাখির উপস্থিতি কমছে বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নদীর পাড়, পুকুরের আশপাশ কিংবা গ্রামের পথের পাশে বাঁশের খুঁটিতে বসে থাকতে দেখা যায় মাছরাঙাকে। এসব এলাকায় তুলনামূলক বেশি চোখে পড়ে পাতি মাছরাঙা। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে সাদাবুক মাছরাঙা, বাদামিডানা মাছরাঙা, ছোট মাছরাঙা, কলার্ড মাছরাঙা ও পাকড়া মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেখা মেলে।
তবে স্থানীয়ভাবে এসব পাখির উপস্থিতি কমে আসার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে পরিবেশ ও আবাসস্থলসংক্রান্ত নানা উদ্বেগ।
পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মাছ শিকারে পারদর্শী মাছরাঙা
মাছরাঙার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো মাছ শিকারের কৌশল। জলাশয়ের পাশে কোনো ডাল বা খুঁটিতে বসে পাখিটি শিকারের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে। সুযোগ বুঝে দ্রুত পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধারালো চঞ্চু দিয়ে মাছ ধরে আনে।
মাছ মাছরাঙার প্রধান খাদ্য হলেও প্রজাতিভেদে এরা বিভিন্ন জলজ পোকামাকড়, ব্যাঙ, ছোট সরীসৃপ এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীও খেয়ে থাকে। তাই মাছরাঙার বেঁচে থাকার জন্য শুধু পানি থাকাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত খাবার ও উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ।
বিশ্বে রয়েছে প্রায় ৯০ প্রজাতির মাছরাঙা
মাছরাঙা সাধারণত ছোট থেকে মাঝারি আকারের পাখি। এদের মাথা তুলনামূলক বড়, চঞ্চু লম্বা ও সূচালো, পা খাটো এবং লেজ ছোট। অনেক প্রজাতির পালকে নীল, সবুজ, কমলা ও বাদামি রঙের আকর্ষণীয় সমন্বয় দেখা যায়।
বিশ্বে মাছরাঙার প্রায় ৯০টি প্রজাতি রয়েছে বলে প্রচলিত পাখিবিষয়ক তথ্যে উল্লেখ করা হয়। এদের বিভিন্ন প্রজাতি জলাশয়ের আশপাশের পাশাপাশি বনাঞ্চলেও বসবাস করে।
প্রজাতিভেদে মাছরাঙার বাসা তৈরির ধরন আলাদা। অনেক প্রজাতি জলাশয়ের পাশের খাড়া মাটির পাড়ে গর্ত করে বাসা বানায়। প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী ও পুরুষ পাখি জোড়া বাঁধে এবং ডিম পাড়ে। ফলে জলাশয়ের পাড় ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হলে তাদের প্রজননেও প্রভাব পড়তে পারে।
কেন কমছে গ্রামবাংলার মাছরাঙা?
মাছরাঙার উপস্থিতি কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জলাশয় কমে যাওয়া: পুকুর, খাল, বিল ও ছোট জলাভূমি ভরাট হয়ে গেলে মাছরাঙার শিকারক্ষেত্র সংকুচিত হয়। এতে খাবার সংগ্রহের সুযোগ কমে যায়।
আবাসস্থল ধ্বংস: জলাশয়ের পাশের গাছপালা, ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিক পাড় নষ্ট হলে মাছরাঙার বসার জায়গা, বাসা তৈরি ও প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ কমে যায়।
খাদ্যসংকট: জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়া এবং জলাশয়ের পরিবেশ পরিবর্তিত হওয়ার কারণে মাছরাঙার খাবার সংগ্রহ কঠিন হতে পারে।
কীটনাশক ও পরিবেশদূষণ: কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলাশয়ে দূষণ খাদ্যশৃঙ্খল ও পাখির জীবনযাপনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অবাধে পাখি শিকার: পাখি শিকার ও বিরক্ত করার কারণে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির নিরাপদ বিচরণ ব্যাহত হতে পারে। মাছরাঙার মতো বন্য পাখি রক্ষায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনও পাখির আবাসস্থল এবং খাদ্যপ্রাপ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
জলাশয়ের সংকটে বাড়ছে উদ্বেগ
দশমিনা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শুভেন্দু সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অবাধে পাখি শিকার এবং জলাশয়ের সংকটের কারণে গ্রামাঞ্চলে আগের মতো পাখির দেখা মেলে না। জলাশয় কমে গেলে মাছরাঙার মাছ শিকারের সুযোগ সীমিত হয়। পাশাপাশি উপযুক্ত বাসা তৈরির জায়গা কমে যাওয়ায় প্রজননেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তবে মাছরাঙার সংখ্যা কতটা কমেছে, তা নিশ্চিতভাবে জানতে নিয়মিত পাখি গণনা ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে কম দেখা যাওয়ার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু এর ভিত্তিতে কোনো প্রজাতির মোট সংখ্যা কমে যাওয়ার মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না।
মাছরাঙা রক্ষায় কী করা জরুরি?
গ্রামবাংলার এই রঙিন পাখি টিকিয়ে রাখতে প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ, নির্বিচারে পাখি শিকার বন্ধ এবং জলাশয়ের পাশের গাছপালা ও ঝোপঝাড় রক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষিজমিতে কীটনাশকের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং পাখির প্রজননস্থল সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মাছরাঙা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, জলজ ও স্থলজ ক্ষুদ্র প্রাণী খাওয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলেরও অংশ হিসেবে ভূমিকা রাখে। তাই এদের আবাসস্থল রক্ষা করা মানে জলাশয় ও আশপাশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও অবদান রাখা।
প্রাকৃতিক জলাশয়, গাছপালা ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র রক্ষা করা না গেলে মাছরাঙাসহ গ্রামবাংলার পরিচিত অনেক পাখির দেখা আরও কমে যেতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন পাখিবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো।
সোহাগ/
