জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬: পে-ফিকেশন ও বকেয়া বিলের নিয়ম
নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর পে-ফিকেশন, বকেয়া বেতন-ভাতা ও পেনশনসংক্রান্ত বিভিন্ন নির্দেশনা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। একটি দাপ্তরিক সার্কুলারের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে পে-ফিকেশনের আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই, বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে পরে বেতন নির্ধারণ এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বকেয়া বিল প্রস্তুতের পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এসব নির্দেশনা জাতীয় পর্যায়ে সবার জন্য প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত হতে মূল সার্কুলারের স্মারক নম্বর, প্রকাশের তারিখ ও জারিকারী কর্তৃপক্ষের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। তাই নিচের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখিত নির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, নিশ্চিত সরকারি ঘোষণা হিসেবে নয়।
পেনশনভোগীদের পে-ফিকেশন নিয়ে কী বলা হয়েছে?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পেনশনভোগীদের পে-ফিকেশন ও বকেয়া পাওনার হিসাব আইবাস++ (iBAS++) ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসকে আলাদাভাবে ফিক্সেশন করার প্রয়োজন হবে না বলে সার্কুলারে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া পেনশনভোগীদের জীবন যাচাই বা লাইফ ভেরিফিকেশনের তথ্য হালনাগাদ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জীবন যাচাইয়ের তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে পেনশনসংক্রান্ত কাজে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
পেনশনভোগীদের তাই নিজ নিজ পেনশন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জীবন যাচাইয়ের অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় নথি ঠিক আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া উচিত।
যেসব ক্ষেত্রে পে-ফিকেশন না করার কথা বলা হয়েছে
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সার্কুলার অনুযায়ী, কয়েকটি শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে পে-ফিকেশন না করার কথা উল্লেখ রয়েছে। সেগুলো হলো:
-
সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী।
-
যাঁদের পিআরএল বা অবসর-উত্তর ছুটি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে অথবা তার আগে শেষ হয়েছে।
-
যেসব প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা আইবাস++ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ করা হয় না।
এ ছাড়া জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার কর্মচারীদের পাশাপাশি সড়ক, গণপূর্ত ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (LGED) মাস্টাররোল ও কার্যভিত্তিক কর্মচারীদের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোনো কর্মচারী এই শ্রেণিগুলোর অন্তর্ভুক্ত হলেই তাঁর ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট চাকরির ধরন, বেতন ব্যবস্থাপনা এবং মূল সরকারি নির্দেশনা যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে।
কারা পরে পে-ফিকেশন করতে পারেন?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-ফিকেশন পরবর্তী সময়ে সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে।
১. আগের পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের হিসাব অসম্পূর্ণ থাকলে
যাঁরা ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন, কিন্তু আইবাস++-এ সেই অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হয়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে আগে পুরোনো স্কেলের অধীনে সংশ্লিষ্ট হিসাব সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। এরপর নতুন স্কেল অনুযায়ী পে-ফিকেশন করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
২. পিআরএলে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারী
যাঁরা ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বা তার পরে পিআরএলে গেছেন, তাঁদের ফিক্সেশন কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রমের পরে করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশোধিত ইএলপিসি ইস্যু করার নির্দেশনার কথাও বলা হয়েছে।
৩. ইনক্রিমেন্ট স্থগিত থাকলে
যাঁদের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রয়েছে, তাঁদের পে-ফিকেশনও পরে করার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আদেশ, বেতন ধাপ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা জরুরি।
৪. প্রেষণে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী
প্রেষণে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফিক্সেশনও পরবর্তী সময়ে সম্পন্ন করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মূল পদ, প্রেষণকালীন বেতন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য সঠিক থাকা প্রয়োজন।
পে-ফিকেশনের আগে যেসব তথ্য যাচাই করতে হবে
পে-ফিকেশনে ভুল এড়াতে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, জন্মতারিখ, সার্ভিস বুক এবং আগের বেতন নির্ধারণের তথ্য মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত নির্দেশনা অনুযায়ী, আগে থেকেই আইবাস++ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী পে-ফিকেশনে ব্যবহৃত জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও মোবাইল নম্বরের তথ্য অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
আগের মোবাইল নম্বর হারিয়ে গেলে বা সিম ব্যবহার করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট ডিডিও ও হিসাবরক্ষণ অফিসের সহায়তায় তথ্য হালনাগাদ করার কথা উল্লেখ রয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিসের এন্ট্রি ইউজার ও ডিডিওর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনার কথাও বলা হয়েছে।
তাই নতুন নম্বর ব্যবহার করার আগে আইবাস++-এ সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে বর্তমান তথ্যের মিল নিশ্চিত করা উচিত।
সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বেতন-ভাতা নিয়ে কী বলা হয়েছে?
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সার্কুলার অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বেতন-ভাতা জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর ভিত্তিতে পরিশোধিত থাকার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বকেয়া বিল প্রস্তুতের নির্দেশনাও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এই বক্তব্য থেকে এককভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে নতুন বেতন স্কেল সবার জন্য কবে কার্যকর হবে, বকেয়া কবে দেওয়া হবে বা অর্থ ছাড়ের নির্দিষ্ট তারিখ কী। এসব বিষয়ে প্রযোজ্য সরকারি আদেশ ও অর্থ বিভাগের নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের বকেয়া বিল কীভাবে হিসাব হবে?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উল্লিখিত তিন মাসের বকেয়া বিল আইবাস++ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি না হয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ম্যানুয়ালি প্রস্তুত করে হিসাবরক্ষণ অফিসে জমা দিতে হতে পারে।
বকেয়া হিসাবের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় যাচাই করার কথা উল্লেখ রয়েছে, সেগুলো হলো:
-
জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বেতন-ভাতার হিসাব।
-
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী আগে পরিশোধিত অর্থ।
-
প্রযোজ্য নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী হিসাবযোগ্য অর্থ।
-
বিশেষ সুবিধা ও আগে পরিশোধিত ভাতার সমন্বয়।
-
বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও উৎসব ভাতার প্রযোজ্য হিসাব।
বকেয়ার পরিমাণ সবার জন্য এক হবে না। পদবি, গ্রেড, মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, প্রযোজ্য ভাতা এবং আগে পরিশোধিত অর্থের ওপর হিসাব নির্ভর করবে। তাই কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ককে সবার জন্য প্রযোজ্য বকেয়া হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
GoB Staff ও GoB Officer-এর জন্য নথিপত্র
প্রতিবেদনে GoB Staff ও GoB Officer-এর পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে।
GoB Staff-এর ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, জন্মতারিখ এবং সার্ভিস বুকের তথ্য যাচাইয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অফিসপ্রধানের ফরওয়ার্ডিংসহ নিরীক্ষাকারী অফিসে জমা দেওয়ার নির্দেশনার কথাও বলা হয়েছে।
GoB Officer-এর ক্ষেত্রে অফিসের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে আইবাস++-এ প্রবেশ এবং নাম, পদবি, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর ও অডিট রেজিস্টারের প্রয়োজনীয় তথ্যসহ নথি প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ডিডিও কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধিদের ফিক্সেশনসংক্রান্ত কাজে সহায়তার জন্য নিরীক্ষাকারী অফিসে উপস্থিত থাকার নির্দেশনার কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে। ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কপি প্রিন্ট করে প্রয়োজনীয় নথির সঙ্গে সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখন কী করা উচিত?
পে-ফিকেশন বা বকেয়া বিল নিয়ে জটিলতা এড়াতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে পারেন:
১. আগের পে-ফিকেশন বিবরণী ও সার্ভিস বুকের তথ্য মিলিয়ে দেখুন।
২. জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বরের তথ্য যাচাই করুন।
৩. পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের আদেশ থাকলে আগের বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে কি না নিশ্চিত হোন।
৪. ইনক্রিমেন্ট স্থগিত, প্রেষণ বা পিআরএল-সংক্রান্ত পরিস্থিতি থাকলে প্রশাসনিক শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
৫. বকেয়া বিলের হিসাবের সময় আগে পরিশোধিত বেতন-ভাতা ও প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের নথি সংরক্ষণ করুন।
৬. ফিক্সেশন সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন।
৭. কোনো অসংগতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ডিডিও, হিসাবরক্ষণ অফিস বা নিরীক্ষাকারী অফিসের সহায়তা নিন।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর পে-ফিকেশন, পেনশন এবং বকেয়া বিলসংক্রান্ত নির্দেশনা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে কোন নির্দেশনা কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, বকেয়া কীভাবে হিসাব হবে এবং ফিক্সেশন কখন সম্পন্ন হবে, তা নিশ্চিত করতে মূল দাপ্তরিক সার্কুলার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ সতর্কতা: মূল সার্কুলারের স্মারক নম্বর, তারিখ ও জারিকারী কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত না করে এসব তথ্যকে সবার জন্য প্রযোজ্য চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
সোহাগ/
