২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ
নিজস্ব প্রতিবেদক: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় বন্যা ও সুপেয় পানির সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে উপকূলীয় প্লাবন ও কৃষির ক্ষতি মানুষের জীবনযাত্রা, জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তায় চাপ বাড়াতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জন্য ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট এবং কৃষিজমির ক্ষতির মতো সমস্যায় বহু মানুষের বসবাস ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা নিয়ে সতর্ক করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
এডিবির ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্ক অন দ্য রাইজ, অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। এই আশঙ্কা বাস্তবায়িত হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের আবাসন, কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে।
২১০০ সাল নাগাদ উপকূলীয় প্লাবনের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের উচ্চ নির্গমন অব্যাহত থাকলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বছরে গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ প্লাবনের শিকার হতে পারেন। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এডিবির হিসাব অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় বন্যায় প্রতিবছর আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে ১০ কোটি ৮০ লাখ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘনবসতি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস এবং উপকূলীয় প্লাবনের প্রভাব এ অঞ্চলের মানুষের বসতি, কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপকূলীয় প্লাবনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও আয়ের উৎস হারালে অনেক পরিবারের পক্ষে আগের অবস্থায় ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য আহরণ ও দৈনিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বাস্তুচ্যুতি বাড়লে নিরাপদ আবাসন, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জলবায়ুজনিত ক্ষতির আর্থিক প্রভাব কতটা বড় হতে পারে?
এডিবির প্রতিবেদনে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে এই অঞ্চলে উপকূলীয় প্লাবনের কারণে বছরে প্রায় ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
যথাযথ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক ক্ষতি বেড়ে ১৭২ বিলিয়ন থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ এই ক্ষতির পরিমাণ ৫২০ বিলিয়ন থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকূলীয় অবকাঠামো, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে আঞ্চলিক হিসাবকে বাংলাদেশের একক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদ্যোগ
জলবায়ু ঝুঁকির পাশাপাশি দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের কিছু উদ্যোগের প্রশংসাও করেছে এডিবি। প্রতিবেদনে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা এবং সমন্বিত দুর্যোগ প্রস্তুতিকে উপকূলীয় মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক উপকূলীয় প্রতিরক্ষা জোরদার এবং জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উপকূলীয় বাঁধ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের চাষ এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। এসব পদক্ষেপ কার্যকর করতে স্থানীয় বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এখনই পরিকল্পনা নেওয়া কেন জরুরি?
এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় সুরক্ষা ও অভিযোজন ব্যবস্থায় সময়মতো বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতের বড় আর্থিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। প্রতিবেদনের আঞ্চলিক হিসাব অনুযায়ী, উপকূলীয় সুরক্ষায় বছরে ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলে সম্ভাব্য ক্ষতির বড় অংশ এড়ানো যেতে পারে।
এডিবির জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি জুকোভের বক্তব্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ও অর্থনীতিকে নিরাপদ রাখতে দীর্ঘমেয়াদি, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম এবং ঝুঁকি কমায় এমন সমাধান প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্যও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, স্থানীয় অভিযোজন, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে বাস্তুচ্যুতি ও আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষের জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা দেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তবে এটি একটি প্রতিবেদনে তুলে ধরা সম্ভাব্য পরিস্থিতি, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। নির্গমনের মাত্রা, অভিযোজন ব্যবস্থা ও দুর্যোগ প্রস্তুতির ওপর ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
সোহাগ/
