পাসপোর্ট হারালে প্রথমবার জরিমানা নেই, দ্বিতীয়বার থেকে ১০ হাজার টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক: পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে নতুন পাসপোর্ট নিতে কী করতে হবে, কত টাকা ফি দিতে হবে এবং থানায় জিডি করার পর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে একটি পরিপত্রে পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর প্রক্রিয়া, যাচাই এবং অতিরিক্ত দণ্ড ফির বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রথমবার পাসপোর্ট হারানো, চুরি হওয়া বা বিনষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত পাসপোর্ট ফির বাইরে অতিরিক্ত দণ্ড ফি দিতে হবে না। তবে দ্বিতীয়বার বা পরবর্তী প্রতিবার একই ঘটনা ঘটলে মূল পাসপোর্ট ফির সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা দণ্ড ফি প্রযোজ্য হবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন-৪ শাখা থেকে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা পরিপত্রে এসব নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে। পাসপোর্ট হারানোর পর অনলাইনে রিপোর্ট করা, থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা এবং পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য হালনাগাদ করার বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে।
প্রথমবার পাসপোর্ট হারালে কত টাকা দিতে হবে?
প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, পাসপোর্ট হারানো, চুরি হওয়া বা বিনষ্ট হওয়ার ঘটনায় অতিরিক্ত দণ্ড ফির হিসাব হবে এভাবে:
| পাসপোর্ট হারানোর ঘটনা | অতিরিক্ত দণ্ড ফি |
|---|---|
| প্রথমবার | ০ টাকা |
| দ্বিতীয়বার | ১০,০০০ টাকা |
| তৃতীয়বার | ১০,০০০ টাকা |
| চতুর্থবার বা পরবর্তী প্রতিবার | ১০,০০০ টাকা |
এখানে মনে রাখতে হবে, প্রথমবার পাসপোর্ট হারালে অতিরিক্ত দণ্ড ফি না লাগলেও নির্ধারিত পাসপোর্ট ফি দিতে হবে। দ্বিতীয়বার বা পরবর্তী সময়ে পুনঃইস্যুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পাসপোর্ট ফির সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা যোগ হবে।
পাসপোর্টের ধরন, মেয়াদ এবং সরবরাহের ধরন অনুযায়ী মূল ফি ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিস থেকে মোট খরচ জেনে নেওয়া ভালো।
পাসপোর্ট হারালে প্রথমেই যে ২টি কাজ করবেন
পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে শুধু নতুন পাসপোর্টের আবেদন করলেই হবে না। প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, দ্রুত রিপোর্ট করা এবং প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
১. অনলাইনে হারানোর তথ্য জানান
পাসপোর্ট হারানো বা চুরি হওয়ার ঘটনা ঘটলে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নির্ধারিত অনলাইন ব্যবস্থায় রিপোর্ট করতে হবে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পাসপোর্টের অবস্থা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
২. নিকটস্থ থানায় জিডি করুন
পাসপোর্ট হারানো বা চুরি হওয়ার পর নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে হবে। জিডির কপি পরবর্তী সময়ে পাসপোর্ট পুনঃইস্যুর আবেদনে প্রয়োজন হতে পারে।
পাসপোর্ট সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নষ্ট হলে কী ধরনের রিপোর্ট ও নথি লাগবে, তা ক্ষতির ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিস থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত।
জিডির পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কী হওয়ার কথা?
প্রদত্ত পরিপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট থানা জিডির তথ্য যাচাই করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর অথবা নিকটস্থ পাসপোর্ট অফিসে পাঠাবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাচাই প্রতিবেদন না পাওয়া গেলে জিডির কপি সংযুক্ত করে পুনঃইস্যুর আবেদন দাখিল বা গ্রহণের সুযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই নতুন পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যাবে। এটি জিডি যাচাইয়ের সময়সীমা। আবেদন যাচাই, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং পাসপোর্ট তৈরি ও সরবরাহের জন্য আলাদা সময় লাগতে পারে।
হারানো পাসপোর্ট পরে খুঁজে পেলে কি ব্যবহার করা যাবে?
না, হারানো পাসপোর্টের বিষয়ে রিপোর্ট করার পর সেটি বাতিল বা ‘Revoke’ করা হলে পরে খুঁজে পেলেও সেটি দিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করা যাবে না বলে নির্দেশনায় উল্লেখ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পাসপোর্টের অবস্থা সম্পর্কে পাসপোর্ট অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। বিদেশে অবস্থান করলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস, হাইকমিশন বা কনস্যুলেটকেও বিষয়টি জানাতে হবে।
তাই হারানো পাসপোর্ট পরে পাওয়া গেলেই সেটি আবার বৈধ হয়ে গেছে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বিদেশে পাসপোর্ট হারালে কী করবেন?
বিদেশে অবস্থানকালে পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে অনলাইনে রিপোর্ট করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস, হাইকমিশন বা কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
-
পাসপোর্ট হারানোর ঘটনা দ্রুত রিপোর্ট করুন।
-
পরিচয় যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখুন।
-
সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
-
পুনঃইস্যুর আবেদনে পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করুন।
বিদেশে পাসপোর্ট হারালে পরিচয় যাচাই ও ভ্রমণসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট মিশনের সহায়তা নেওয়া উচিত।
নতুন পাসপোর্টে কি পুরোনো পাসপোর্ট হারানোর তথ্য থাকবে?
প্রদত্ত নির্দেশনার বিবরণ অনুযায়ী, হারানো বা চুরি হওয়া পাসপোর্ট পুনঃইস্যু করা হলে নতুন পাসপোর্টের ডেটাপেজে ইংরেজিতে উল্লেখ থাকতে পারে:
“Previous Passport is Reported to be Lost”
এর অর্থ, আগের পাসপোর্টটি হারানো হয়েছে বলে রিপোর্ট করা হয়েছিল।
পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডাটাবেজে পুরোনো পাসপোর্টের অবস্থা ‘Lost’ বা ‘Revoked’ হিসেবে হালনাগাদ করার কথাও বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো হারানো বা চুরি হওয়া পাসপোর্টের অপব্যবহারের ঝুঁকি কমানো।
পাসপোর্ট পুনঃইস্যুতে নাম ও জন্মতারিখ পরিবর্তন করা যাবে?
হারানো পাসপোর্টের পরিবর্তে নতুন পাসপোর্ট নেওয়ার সময় আবেদনকারীর নাম, জন্মতারিখ, পিতার নাম ও মাতার নামের মতো মৌলিক পরিচয়গত তথ্য আগের নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে বলে প্রদত্ত নির্দেশনায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে কোনো তথ্য প্রকৃতপক্ষে ভুল হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুসারে বৈধ সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে। শুধু পাসপোর্ট হারানোর কারণে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয় না।
পাসপোর্ট আংশিক নষ্ট হলে কী করবেন?
পাসপোর্ট আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরিচয় শনাক্ত করার মতো অংশ অক্ষত থাকলে সেটি জমা দিয়ে পুনঃইস্যুর আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে।
অন্যদিকে, পাসপোর্ট সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলে এবং পরিচয় শনাক্ত করার মতো কোনো অংশ অবশিষ্ট না থাকলে হারানো পাসপোর্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য রিপোর্ট ও যাচাইয়ের নিয়ম অনুসরণ করতে হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আবেদনপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পাসপোর্ট হারালে যেসব বিষয় মনে রাখবেন
পাসপোর্ট হারানো বা চুরি হওয়ার ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নতুন নির্দেশনার বিবরণ অনুযায়ী, আবেদনকারীদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে:
-
অনলাইনে হারানোর রিপোর্ট এবং থানায় জিডির প্রয়োজনীয়তা যাচাই করুন।
-
জিডি যাচাইয়ের ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা সম্পর্কে জানুন।
-
প্রথমবারের অতিরিক্ত দণ্ড ফি এবং পরবর্তীবারের ১০ হাজার টাকার বিধান মূল পরিপত্রে নিশ্চিত করুন।
-
হারানো পাসপোর্ট পরে পাওয়া গেলেও সেটি বাতিল করা হয়েছে কি না, তা যাচাই না করে ব্যবহার করবেন না।
-
বিদেশে পাসপোর্ট হারালে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
-
আবেদন করার আগে পাসপোর্ট ফি ও প্রয়োজনীয় নথির সর্বশেষ তথ্য জেনে নিন।
পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে দ্রুত রিপোর্ট করা, থানায় জিডি করা এবং পুনঃইস্যুর নিয়ম অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রথমবার হারানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দণ্ড ফি নেই, তবে দ্বিতীয়বার থেকে প্রতিবার ১০ হাজার টাকা দণ্ড ফি দিতে হতে পারে।
তবে অর্থ পরিশোধের আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল পরিপত্র এবং বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করুন। এতে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে আবেদন করা বা অপ্রত্যাশিত খরচের মুখে পড়ার ঝুঁকি কমবে।
সূত্র যাচাইয়ের পরামর্শ: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের পরিপত্র এবং বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সরকারি নির্দেশনা মিলিয়ে সংবাদটি প্রকাশ করুন।
সোহাগ/
