| ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিন চাপ, সামনে কী করণীয়

জাতীয় ডেস্ক . বিনোদন৬৯.কম
২০২৬ অক্টোবর ২১ ১৯:৪৯:৫৬
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিন চাপ, সামনে কী করণীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায়—এই তিন চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। একই অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে।–এর এই পূর্বাভাসের পাশাপাশি আগামী পাঁচ অর্থবছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের হিসাবও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি গুরুত্ব তৈরি করেছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন হলো, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পর্যাপ্ততা বজায় রাখার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা যাবে। অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় এ ক্ষেত্রে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বাড়ানো, আমদানি ব্যয় কার্যকরভাবে পরিচালনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

প্রবৃদ্ধি কমার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ

আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর আগে এপ্রিলে সংস্থাটি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা জানিয়েছিল। একই প্রতিবেদনে গড় মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। তবে পূর্বাভাস মানেই নিশ্চিত ফল নয়। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতিগত পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের ওপর প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির হার নির্ভর করবে।

পাঁচ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাবের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হতে পারে। এর মধ্যে মূল ঋণ প্রায় ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ বাবদ প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, রেল ও পরিবহন খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় আগামী বছরগুলোতে এই দায় বাড়তে পারে। তবে মোট ঋণ পরিশোধের অঙ্ক দেখেই ঋণসংকট বা রিজার্ভ দ্রুত কমে যাওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ঋণের মেয়াদ, সুদের হার, নতুন বৈদেশিক অর্থায়ন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রিজার্ভ কতটা স্বস্তি দিচ্ছে?

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।

দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, কারণ রিজার্ভ গণনার পদ্ধতি এক নয়। তাই রিজার্ভের অবস্থা মূল্যায়নের সময় কোন পদ্ধতির হিসাব ব্যবহার করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা জরুরি।

রিজার্ভের ওপর চাপ নির্ভর করে শুধু ঋণ পরিশোধের ওপর নয়; আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্যের ওপরও তা নির্ভরশীল। ফলে রিজার্ভের বর্তমান অঙ্কের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডলার আসা ও বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও গুরুত্বপূর্ণ।

আমদানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে

বাংলাদেশ জ্বালানি, সার, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। আবার টাকার বিনিময়মূল্য কমে গেলে একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আমদানিকারকদের বেশি টাকা খরচ করতে হয়।

আমদানি ব্যয়ের এই চাপ উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে বাজারদরেও প্রভাব ফেলতে পারে। চাল, পেঁয়াজ, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের দেশীয় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে আমদানির প্রয়োজনও বাড়তে পারে।

তবে আমদানি কমানোই সব সমস্যার সমাধান নয়। শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও কৃষি উপকরণ আমদানিতে অতিরিক্ত বাধা তৈরি হলে উৎপাদন এবং রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই কোন পণ্য আমদানি জরুরি, কোন ক্ষেত্রে বিকল্প সরবরাহ তৈরি সম্ভব এবং কোথায় ব্যয় কমানো যায়—তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়ানো কেন জরুরি?

বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা কমে গেলে কিংবা উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমলে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনে সহায়তা পাওয়া যায়। এ জন্য প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া এবং বিনিময় হারে বাস্তবসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতেও ব্যবসার পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু আমদানি সংকোচনের ওপর নির্ভর না করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।

অর্থনীতির চাপ সামলাতে কী করা জরুরি?

বাংলাদেশের অর্থনীতির এই তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় করা জরুরি। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তাও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা: কোন বছরে কত ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে, নতুন ঋণ নিলে ভবিষ্যৎ দায় কতটা বাড়বে এবং ঋণনির্ভর প্রকল্প থেকে কী অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানো: রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য, নতুন বাজার অনুসন্ধান, প্রবাসী আয় বৈধ পথে আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর জোর দিতে হবে।

চতুর্থত, প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা: বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ঋণের দায়ের সঙ্গে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফলের সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।

সামনে বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় পরীক্ষা

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর প্রবৃদ্ধি এবং বাড়তে থাকা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ—এই তিনটি বিষয় আগামী অর্থবছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে পরিস্থিতি কতটা কঠিন হবে, তা নির্ভর করবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবাহ, আমদানি ব্যয়, ঋণের শর্ত এবং কার্যকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।

রিজার্ভের পর্যাপ্ততা বজায় রাখার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, উৎপাদন ও বিনিয়োগে গতি ফেরানো এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখাই হবে মূল লক্ষ্য। এজন্য স্বল্পমেয়াদি চাপ সামলানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ।

সোহাগ/

আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ

ক্রিকেট

১৬ ডিসেম্বর হতে পারে আইপিএলের নিলাম, কোথায় হবে আয়োজন

১৬ ডিসেম্বর হতে পারে আইপিএলের নিলাম, কোথায় হবে আয়োজন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) ২০২৭ মৌসুমের মিনি নিলাম আগামী ১৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে ...

লিটন-মিরাজের শতরানের জুটিতে লাঞ্চের আগে বাংলাদেশের লিড ৪৪৩

লিটন-মিরাজের শতরানের জুটিতে লাঞ্চের আগে বাংলাদেশের লিড ৪৪৩

নিজস্ব প্রতিবেদক: আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন বাংলাদেশের লিটন দাস। ...

ফুটবল

আর্জেন্টিনা বনাম উরুগুয়ে ম্যাচ কবে, জেনে নিন সূচি

আর্জেন্টিনা বনাম উরুগুয়ে ম্যাচ কবে, জেনে নিন সূচি

নিজস্ব প্রতিবেদক: লিওনেল মেসিকে ছাড়াই নতুন অধ্যায়ের শুরু করতে যাচ্ছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতিতে ...

রোনালদোকে টানা ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা!

রোনালদোকে টানা ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা!

নিজস্ব প্রতিবেদক: পর্তুগাল জাতীয় দলের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও ২৫৫ ইউরো জরিমানা ...