জমির দলিলে নাম, দাগ বা খতিয়ানে ভুল? সংশোধনের উপায় জানুন
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমির দলিলে নামের বানান, দাগ নম্বর, খতিয়ান, মৌজা কিংবা জমির চৌহদ্দিতে ভুল থাকলে ভবিষ্যতে মালিকানা যাচাই ও জমি হস্তান্তরের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে। অনেকেই মনে করেন, দলিল একবার রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে আর কোনো ভুল সংশোধন করা যায় না। তবে ভুলের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনগত প্রক্রিয়ায় দলিলের ভুল সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।
কোনো ভুল সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে যোগাযোগ করতে হবে, নাকি আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে, তা নির্ভর করে ভুলের প্রকৃতি এবং সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার ওপর। তাই দলিলে ভুল ধরা পড়লে নিজে থেকে কোনো পরিবর্তন না করে আগে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা জরুরি।
দলিলের ভুল সংশোধন করবেন কীভাবে?
জমির দলিলে ভুলের ধরন অনুযায়ী সংশোধনের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। সাধারণভাবে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়।
১. নামের বানান বা ছোটখাটো লেখার ভুল
দলিলে নামের বানান, টাইপিং কিংবা অন্য কোনো সাধারণ লেখার ভুল থাকলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে যোগাযোগ করে সংশোধনের নিয়ম জানতে হবে। সব ধরনের ছোট ভুল অফিসে আবেদন করেই সংশোধন করা যায়, এমন নয়। ভুলটি দলিলের মূল বক্তব্য, পক্ষের পরিচয় বা মালিকানার ওপর প্রভাব ফেলে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
২. দাগ নম্বর, খতিয়ান বা জমির বিবরণে ভুল
দলিলে দাগ নম্বর, খতিয়ান, মৌজা, জমির পরিমাণ কিংবা চৌহদ্দিতে ভুল থাকলে তা গুরুতর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল দলিল, আগের দলিল, খতিয়ান ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি মিলিয়ে দেখতে হবে। ভুল সংশোধনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি এবং প্রযোজ্য আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন হতে পারে। বিরোধ থাকলে আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে হতে পারে।
৩. আদালতের মাধ্যমে দলিল সংশোধন
দলিলের ভুল নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ থাকলে বা সংশোধনের জন্য আদালতের আদেশ প্রয়োজন হলে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে মামলা করার বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। কোন ধরনের মামলা করতে হবে এবং কী সময়সীমা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করে মামলার ঘটনা, চাওয়া প্রতিকার ও প্রাসঙ্গিক আইনের ওপর।
দলিল সংশোধনের মামলায় সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভুল ধরা পড়ার পর দেরি না করে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো। সব ক্ষেত্রে তিন বছর সময়সীমা প্রযোজ্য, কিংবা সময় পার হলে নির্দিষ্ট অন্য মামলা করলেই সমাধান হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
দলিল সংশোধনের আগে যেসব কাগজপত্র যাচাই করবেন
দলিলের ভুল শনাক্ত ও সংশোধনের উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণে সাধারণত নিচের নথিগুলো কাজে আসতে পারে:
-
সংশোধন করতে চাওয়া নিবন্ধিত দলিলের কপি
-
আগের দলিল বা মালিকানার ধারাবাহিকতার নথি
-
সংশ্লিষ্ট খতিয়ান ও পর্চা
-
জমির দাগ নম্বর, মৌজা ও জমির পরিমাণের তথ্য
-
প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র বা পরিচয়-সংক্রান্ত নথি
-
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়া হলে ওয়ারিশ-সংক্রান্ত কাগজপত্র
-
ভুলের ধরন অনুযায়ী অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল
সব নথিতে নাম, জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর ও মালিকানার তথ্য মিলিয়ে দেখুন। একাধিক নথিতে ভিন্ন তথ্য থাকলে কোনটি কীভাবে সংশোধন করতে হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা আইনজীবীর মাধ্যমে নিশ্চিত করুন।
জমির দলিল লেখার সময় যে ১১টি বিষয় খেয়াল রাখবেন
দলিল তৈরির সময় সতর্ক থাকলে অনেক ভুল আগেই এড়ানো সম্ভব। জমি কেনার আগে নিচের বিষয়গুলো যাচাই করুন।
১. বিক্রেতার পরিচয় ও সক্ষমতা: বিক্রেতার পরিচয়, আইনগতভাবে দলিল সম্পাদনের সক্ষমতা এবং জমি বিক্রির অধিকার যাচাই করুন।
২. আগের দলিল পরীক্ষা: বিক্রেতা যে দলিলের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি করছেন, তার নম্বর, তারিখ এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখুন।
৩. ক্রেতা-বিক্রেতার সঠিক তথ্য: উভয় পক্ষের পূর্ণ নাম, ঠিকানা ও পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য নির্ভুলভাবে লেখা হয়েছে কি না, তা যাচাই করুন। জমির মূল্য ও পরিশোধের শর্তও স্পষ্ট থাকতে হবে।
৪. উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির মালিকানা: বিক্রেতা উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেয়ে থাকলে মূল মালিকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করুন।
৫. জমির তফশিল: জেলা, উপজেলা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, মৌজা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও জমির শ্রেণির তথ্য সঠিক কি না দেখুন।
৬. জমির চৌহদ্দি: জমির উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম পাশের সীমানা দলিলে সঠিকভাবে উল্লেখ আছে কি না যাচাই করুন।
৭. স্বাক্ষর বা টিপসই: দলিল সম্পাদনের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাক্ষর বা টিপসইসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন।
৮. সাক্ষী ও দলিল লেখকের তথ্য: দলিলে সাক্ষী, শনাক্তকারী এবং দলিল লেখকের প্রয়োজনীয় পরিচয় ও স্বাক্ষর সঠিকভাবে রয়েছে কি না দেখুন।
৯. কাটাকাটি ও সংশোধন: দলিলে কাটাকাটি, ঘষামাজা বা অস্পষ্ট লেখা এড়িয়ে চলুন। কোনো সংশোধন প্রয়োজন হলে তা যেন প্রযোজ্য নিয়ম মেনে করা হয়।
১০. প্রতিটি দাগের জমির পরিমাণ: একাধিক দাগের জমি থাকলে প্রতিটি দাগের মোট জমি এবং সেই দাগ থেকে কতটুকু জমি বিক্রি হচ্ছে, তা আলাদাভাবে উল্লেখ আছে কি না যাচাই করুন।
১১. সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিল: জমি কেনার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের রেকর্ড থেকে দাগ ও খতিয়ান নম্বর যাচাই করুন। দলিলের তথ্যের সঙ্গে সরকারি রেকর্ডের অমিল থাকলে কারণ বুঝে তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
দলিলে ভুল ধরা পড়লে কী করবেন?
প্রথমে ভুলটি কোন জায়গায় হয়েছে তা চিহ্নিত করে মূল দলিল, খতিয়ান ও অন্যান্য নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিন। এরপর সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে যোগাযোগ করে প্রশাসনিকভাবে সংশোধনের সুযোগ আছে কি না জানুন। ভুলটি মালিকানা বা জমির পরিচয়কে প্রভাবিত করলে, কিংবা পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ থাকলে, জমি-সংক্রান্ত বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
মনে রাখবেন, দলিলের ভুল সংশোধনের পদ্ধতি সব ক্ষেত্রে এক নয়। ভুলের ধরন, প্রমাণপত্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানের ওপর সঠিক পদক্ষেপ নির্ভর করে। তাই যাচাই না করে নতুন দলিল তৈরি বা কোনো নথিতে নিজে থেকে পরিবর্তন করা উচিত নয়।
সোহাগ/
