মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল প্রকাশ
নিজস্ব প্রতিবেদক:সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল প্রকাশ্যে এসেছে। ১৬টি অনুচ্ছেদে গঠিত এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আক্রান্ত দেশকে সহায়তা দিতে অন্য দেশগুলো সামরিক সক্ষমতাসহ পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন উপায় কাজে লাগাবে।
চুক্তিতে শুধু সামরিক সহায়তার অঙ্গীকার নয়, প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন, যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতার বিধানও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি চুক্তিটি অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর রাখার এবং প্রথম ১০ বছর কোনো সদস্য দেশের প্রত্যাহার করতে না পারার শর্ত রয়েছে।
তুরস্ক সরকার চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ দেশটির সংসদে জমা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইও দলিলটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ সংগ্রহ করেছে। চুক্তির বিধানগুলো কার্যকর হওয়ার জন্য তিন দেশের নিজ নিজ অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কী বলা হয়েছে?
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার। এতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত হুমকির মুখে পড়লে অন্য দেশগুলো সেই হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সহযোগিতা করবে।
চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আক্রান্ত দেশকে অন্য সদস্যরা অবিলম্বে সহায়তা দেবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি পরিস্থিতিতে তিন দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই ধরনের সামরিক অভিযান চালাবে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রয়োজনের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং দেশগুলোর বিদ্যমান সম্পদ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে সহায়তার ধরন ও পরিধি নির্ধারণ করা হবে। সামরিক সহায়তাও এর আওতায় থাকতে পারে।
এ ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার।
ন্যাটোর মতো কি এই প্রতিরক্ষা জোট?
মক্কা চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বিধান ন্যাটো জোটের চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনীয়। ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদেও এক বা একাধিক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি রয়েছে।
তবে দুই ব্যবস্থাকে পুরোপুরি একই বলা যায় না। মক্কা চুক্তিতে সহায়তার ধরন নির্ধারণে সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজন, বিদ্যমান সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে চুক্তির আওতায় ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে সরাসরি প্রতিপক্ষ বা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং সদস্য দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত ও নিরাপত্তা সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক সহযোগিতা বাড়বে
চুক্তির তৃতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম অনুচ্ছেদে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময় ও যৌথ গবেষণা
- সামরিক সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ
- প্রতিরক্ষা শিল্পের কর্মীদের প্রশিক্ষণ
- সামরিক কর্মকর্তা বিনিময়
- যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও সামরিক মহড়া
- সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি
চুক্তির লক্ষ্য তিন দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও উন্নত করা এবং সামরিক শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা। তবে এসব উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা পারস্পরিক সমঝোতা ও পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে।
গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা
চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—এমন বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তিন দেশ যৌথ প্রচেষ্টা বাড়াবে।
অন্যদিকে নবম অনুচ্ছেদে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের বিধান রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলো পারস্পরিক সম্মত নিরাপদ মাধ্যম ব্যবহার করে তথ্য বিনিময় করবে। এ ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং উপাত্তের সুরক্ষা বজায় রাখতে হবে।
চুক্তিতে শ্রেণিবদ্ধ তথ্য ও নথির সুরক্ষার বিষয়েও পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর বাইরে কোনো রাষ্ট্র, কোম্পানি বা ব্যক্তির সঙ্গে এসব তথ্য ও নথি বিনিময়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তথ্য ব্যবহারের অনুমতি প্রয়োজনের ভিত্তিতে এবং যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়পত্রধারী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমিত রাখার কথাও বলা হয়েছে।
অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জ্বালানি সরবরাহের বিধান
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির দশম অনুচ্ছেদে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সরবরাহ ও সহায়তামূলক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, সরবরাহের প্রাপ্যতা ও সামঞ্জস্যের শর্তে তিন দেশ শান্তিকাল, যুদ্ধকাল এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে একে অন্যকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে।
এ বিধান সামরিক সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করে। তবে সরবরাহের পরিমাণ, সময় এবং বাস্তব ব্যবস্থা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশের সক্ষমতা ও পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।
গঠিত হবে কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি
চুক্তির অষ্টম অনুচ্ছেদে ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানেরা থাকবেন।
কমিটির প্রধান দায়িত্ব হবে যৌথ প্রতিরক্ষার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং চুক্তি বাস্তবায়নের পথে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করা।
চুক্তি অনুযায়ী, কমিটি বছরে দুবার বৈঠক করবে। পালাক্রমে তিন দেশের একেকটি দেশ বৈঠকের আয়োজন করবে। প্রয়োজন মনে করলে দেশগুলোর নেতারাও বছরে একবার বৈঠক করতে পারবেন।
এ ছাড়া মূল তিন দেশের সর্বসম্মতির ভিত্তিতে অন্য দেশকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম ও নীতিমালা নির্ধারণের ক্ষমতা থাকবে কমিটির।
সৌদি আরবে হবে চুক্তির সচিবালয়
চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। এর প্রধান হবেন একজন মহাসচিব, যাঁকে তিন দেশের মধ্য থেকে পালাক্রমে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের নাগরিক। সচিবালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো, কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত নিয়ম ও নীতিমালা পরবর্তী সময়ে মূল তিন দেশের সর্বসম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
এ ব্যবস্থা চুক্তির আওতায় রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সমন্বয় এবং বাস্তবায়ন তদারকিতে ভূমিকা রাখবে।
প্রথম ১০ বছর চুক্তি থেকে সরে যাওয়া যাবে না
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মেয়াদ শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ রাখা হয়নি। অর্থাৎ, অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে কার্যকর হওয়ার পর এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বলবৎ থাকবে।
তবে চুক্তির ১৬তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ১০ বছর কোনো সদস্য দেশ এটি থেকে প্রত্যাহার করতে পারবে না। ১০ বছর পার হলে কোনো দেশ চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে অন্য সদস্য দেশগুলোকে কূটনৈতিক মাধ্যমে অন্তত তিন মাস আগে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
চুক্তি থেকে কোনো দেশ সরে গেলেও তার আগে সম্মত হওয়া চলমান কার্যক্রম ও প্রকল্পগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না। একইভাবে, চুক্তির আওতায় পাওয়া শ্রেণিবদ্ধ তথ্য ও নথির গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্ব প্রত্যাহার বা চুক্তির অবসানের পরও বহাল থাকবে।
চুক্তির ব্যাখ্যা বা বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সদস্য দেশগুলো আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে তা বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করবে। সংশোধন আনতে হলে মূল তিন দেশের মধ্যে আলোচনা ও সর্বসম্মতি প্রয়োজন হবে।
কবে থেকে কার্যকর হবে মক্কা চুক্তি?
চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার জন্য তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের নিজ নিজ অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। চুক্তির সচিবালয়ে সর্বশেষ অনুমোদনপত্র জমা দেওয়ার দিন থেকে এটি কার্যকর বলে গণ্য হবে।
চুক্তির মূল কপি তুর্কি, আরবি ও ইংরেজি—এই তিন ভাষায় স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনটি ভাষার পাঠই সমানভাবে প্রামাণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ভাষাগত পার্থক্য দেখা দিলে ইংরেজি পাঠকে প্রাধান্য দেওয়ার বিধান রয়েছে।
সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল লক্ষ্য তিন দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা, সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা। তবে চুক্তির বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে এর কার্যকর হওয়া, সদস্য দেশগুলোর সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যতে নেওয়া যৌথ পদক্ষেপের ওপর।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন ও প্রকাশিত চুক্তির পাঠ; তুরস্ক সরকারের সংসদে জমা দেওয়া দলিলসংক্রান্ত তথ্য।
সোহাগ/
