এবার শীত কেমন হবে, ঢাকায় নামতে পারে ১৫ ডিগ্রিতে
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার পর আবহাওয়ায় আসতে শুরু করেছে পরিবর্তন। গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও ভোরে দেখা যাচ্ছে হালকা কুয়াশা, আর রাতের শেষ ভাগে ও সকালে বাতাসে অনুভূত হচ্ছে শীতলতা। উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রাও কমতে শুরু করেছে। তবে আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার শীতের তীব্রতা তুলনামূলক কম হতে পারে এবং শীতের স্থায়িত্বও স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের প্রথম দিকে উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে। নভেম্বরের শেষ দিকে উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ঢাকায় শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে ডিসেম্বর থেকে। এ সময় রাজধানীর তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
কেন বাড়ছে শীতের অনুভূতি?
আবহাওয়াবিদদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নেওয়ার পর বাতাসের গতিপ্রকৃতিতে পরিবর্তন আসে। বর্তমানে উত্তর দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের অনুভূতি তুলনামূলক বেশি হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, আগামী কয়েক মাসে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। উত্তরের বাতাসের প্রবাহ বাড়লে শীতের অনুভূতিও বাড়তে পারে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় অনুভূত হচ্ছে।
সূর্যের অবস্থান পরিবর্তনের কারণেও দিনের তাপমাত্রার অনুভূতিতে পরিবর্তন আসে। বর্ষাকালে সূর্যকিরণ তুলনামূলক খাড়াভাবে পড়লেও এ সময় তা আরও তির্যকভাবে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে দিনের তাপের অনুভূতি কমতে পারে এবং রাতের শীতলতা বেশি অনুভূত হতে পারে।
ভোরে কুয়াশা, তবে কি শীত জেঁকে বসেছে?
মৌসুমি বায়ুর প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামাঞ্চলের মাঠঘাট, ফসলের জমি ও জলাশয়ের আশপাশে ভোরের দিকে হালকা কুয়াশা দেখা যেতে পারে। রাতের বেলায় ভূমির কাছাকাছি বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেলে এবং বাতাসে পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প থাকলে কুয়াশা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ঘাস ও গাছের পাতায় শিশির জমতে পারে।
তবে কুয়াশা দেখা দিলেই তীব্র শীত শুরু হয়েছে, এমনটি নয়। এ সময় সকালে শীতলতা অনুভূত হলেও দুপুরে রোদের কারণে গরম লাগতে পারে। রাতের তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকলে এবং ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ বাড়লে শীতের অনুভূতি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
মৌসুমি বায়ু বিদায় নিলেও বৃষ্টির সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হলে কিংবা বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এলে দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে।
উত্তরাঞ্চলে ১৭ ডিগ্রিতে নামতে পারে তাপমাত্রা
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবিরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নভেম্বরের প্রথম দিকে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে। নভেম্বরের শেষ দিকে কোনো কোনো এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
উত্তরাঞ্চলে শীতের প্রভাব আগে অনুভূত হওয়ার পেছনে ভৌগোলিক অবস্থান ও উত্তরের বাতাসের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া দেশের শীতপ্রবণ এলাকাগুলোর একটি। সেখানে তাপমাত্রা কমতে শুরু করলে শীতের আগমনী বার্তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামা আর শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। শৈত্যপ্রবাহ ঘোষণা করতে নির্দিষ্ট আবহাওয়াগত মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়। তাই নভেম্বরের শেষ দিকে শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনাকে আপাতত পূর্বাভাস হিসেবেই দেখতে হবে।
ঢাকায় শীত আসবে ডিসেম্বরে?
রাজধানী ঢাকায় শীতের অনুভূতি উত্তরাঞ্চলের তুলনায় দেরিতে বাড়তে পারে। আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবিরের মতে, ডিসেম্বর থেকে ঢাকায় শীতের প্রভাব স্পষ্ট হতে পারে। এ সময় তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এটি সম্ভাব্য পূর্বাভাস, নিশ্চিত তাপমাত্রা নয়। প্রকৃত তাপমাত্রা নির্ভর করবে বাতাসের দিক ও গতি, আকাশের অবস্থা এবং অন্যান্য আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর।
ঢাকার ঘনবসতি ও নগরায়ণের কারণেও শহরের তাপমাত্রা আশপাশের খোলা এলাকার তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। ফলে উত্তরাঞ্চলে শীতের অনুভূতি বাড়লেও রাজধানীতে একই সময়ে সমান মাত্রায় ঠান্ডা নাও পড়তে পারে।
এবার কি উষ্ণ শীত হবে?
আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবিরের মতে, এবার দেশে ‘ওয়ার্ম উইন্টার’ বা তুলনামূলক উষ্ণ শীতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাঁর ব্যাখ্যায়, এল নিনোর প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা ডব্লিউএমওর ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি পূর্বাভাসেও অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ অঞ্চলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে আঞ্চলিক পূর্বাভাস দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকার শীতের তীব্রতা বা স্থায়িত্ব নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
উষ্ণ শীতের অর্থ এই নয় যে কোথাও তীব্র ঠান্ডা পড়বে না। মৌসুমের সামগ্রিক তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে কোনো কোনো এলাকায় ঠান্ডা পড়তে পারে। তাই শীতের প্রকৃত চিত্র বুঝতে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করা প্রয়োজন।
শীতের স্থায়িত্ব কি ৯০ দিনের কম হবে?
বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কে শীতকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবিরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার শীতের অনুভূতির স্থায়িত্ব ৯০ দিনের কম হতে পারে।
এখানে শীতকাল ও শীতের অনুভূতির স্থায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শীতের মৌসুম থাকলেও পুরো সময়জুড়ে একই মাত্রার ঠান্ডা নাও থাকতে পারে। তাপমাত্রা, বাতাসের গতিপ্রকৃতি ও আবহাওয়ার অন্যান্য উপাদানের পরিবর্তনে কোনো সময় শীত বেশি, আবার কোনো সময় কম অনুভূত হতে পারে।
তাই এবার শীতের স্থায়িত্ব কম হবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানতে মৌসুমজুড়ে পর্যবেক্ষণ ও হালনাগাদ পূর্বাভাসের প্রয়োজন হবে।
শীতে বৃষ্টি বাড়বে কি?
উষ্ণ শীত হলেই বৃষ্টি বাড়বে বা কমবে—এমন সরাসরি সম্পর্ক নেই। শীতকালে বৃষ্টির সম্ভাবনা নির্ভর করে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের পরিস্থিতি, বাতাসের প্রবাহ এবং আর্দ্রতার ওপর।
আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবিরের ব্যাখ্যায়, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা আবহাওয়াব্যবস্থা ও বাতাসের প্রভাবে দেশে শীতকালে বৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা মেঘ নিয়ে এলে বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
অন্যদিকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মৌসুমি পূর্বাভাসে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অংশে বৃষ্টিপাতের ধরনে ভিন্নতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে এ আঞ্চলিক পূর্বাভাস থেকে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট জেলায় কবে বৃষ্টি হবে, তা বলা যায় না।
সব মিলিয়ে এবার শীতের চিত্র কেমন হতে পারে?
মৌসুমি বায়ুর বিদায়, উত্তরের বাতাসের প্রবাহ এবং ভোরের কুয়াশা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নভেম্বরের শুরুতে উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে, মাসের শেষ দিকে কোথাও কোথাও শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং ডিসেম্বরে ঢাকায় শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে।
তবে এবার শীত সামগ্রিকভাবে উষ্ণ হবে কি না, কত দিন স্থায়ী হবে এবং কোন এলাকায় কতটা তীব্র হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য হালনাগাদ আবহাওয়ার তথ্য প্রয়োজন। আপাতত ভোরের কুয়াশা ও উত্তরের বাতাস শীতের আগমনী বার্তা দিলেও প্রকৃত শীতের চিত্র নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোর আবহাওয়ার ওপর।
সোহাগ/
