দোকান ঘর ভাড়ার চুক্তিনামা যেভাবে লিখবেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: দোকান ভাড়া নেওয়া বা ভাড়া দেওয়ার আগে লিখিত চুক্তিনামা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মৌখিক কথার ভিত্তিতে দোকান ভাড়া দিলে পরে মাসিক ভাড়া, জামানত, বিদ্যুৎ বিল, দোকান ছাড়ার নোটিশ কিংবা চুক্তির মেয়াদ নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। এসব সমস্যা এড়াতে দোকানমালিক ও ভাড়াটিয়া—উভয়ের সম্মতিতে চুক্তির শর্তগুলো লিখিতভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে দোকানঘর ভাড়ার চুক্তিনামা তৈরির সময় দোকানের ঠিকানা, মাসিক ভাড়া, অগ্রিম বা জামানতের পরিমাণ, ভাড়া দেওয়ার তারিখ, চুক্তির মেয়াদ এবং চুক্তি বাতিলের শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত। পাশাপাশি প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা, স্ট্যাম্প ও নিবন্ধনের প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
দোকান ভাড়ার চুক্তিনামায় যেসব তথ্য রাখবেন
দোকানঘর ভাড়ার চুক্তিনামা লেখার সময় নিচের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
১. দোকানমালিক ও ভাড়াটিয়ার পরিচয়
চুক্তির শুরুতে দোকানমালিক এবং ভাড়াটিয়ার পূর্ণ নাম, পিতা বা মাতার নাম, বর্তমান ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ করতে হবে। উভয় পক্ষের পরিচয় যাচাই করে নেওয়া ভালো।
২. দোকানের ঠিকানা ও বিবরণ
দোকানটি যে ভবন বা মার্কেটে অবস্থিত, তার পূর্ণ ঠিকানা, দোকান নম্বর, তলা এবং প্রয়োজনে আয়তন উল্লেখ করুন। দোকানের সঙ্গে কোনো গুদাম, অতিরিক্ত কক্ষ বা নির্দিষ্ট পার্কিং সুবিধা থাকলে সেটিও চুক্তিতে লিখে রাখা যেতে পারে।
৩. মাসিক ভাড়া ও পরিশোধের তারিখ
প্রতি মাসে কত টাকা ভাড়া দিতে হবে, কোন তারিখের মধ্যে দিতে হবে এবং কীভাবে ভাড়া পরিশোধ করা হবে—তা স্পষ্টভাবে লিখুন। নগদে ভাড়া দিলে রসিদ এবং ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবায় দিলে লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।
৪. অগ্রিম টাকা বা জামানতের হিসাব
দোকান নেওয়ার সময় অগ্রিম বা জামানত হিসেবে কত টাকা দেওয়া হচ্ছে, তা আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে। এই অর্থ ফেরতযোগ্য কি না, কোন শর্তে ফেরত দেওয়া হবে এবং বকেয়া ভাড়া বা ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে কি না, তা দুই পক্ষের সম্মতিতে লিখুন।
৫. চুক্তির মেয়াদ ও নবায়ন
চুক্তি কবে থেকে কার্যকর হবে এবং কত দিন বা বছর পর্যন্ত চলবে, তা উল্লেখ করুন। মেয়াদ শেষ হলে কীভাবে চুক্তি নবায়ন হবে, ভাড়া পরিবর্তনের নিয়ম কী এবং নবায়নের জন্য কত দিন আগে জানাতে হবে, সেটিও নির্ধারণ করা ভালো।
৬. বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য বিল
বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, সার্ভিস চার্জ, পরিচ্ছন্নতা ব্যয় এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিল কে পরিশোধ করবেন, তা স্পষ্ট করুন। দোকানের আলাদা মিটার থাকলে মিটার রিডিং ও বিল পরিশোধের পদ্ধতিও উল্লেখ করা যেতে পারে।
৭. দোকান ব্যবহারের উদ্দেশ্য
দোকানটি কী ধরনের ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা হবে, তা চুক্তিতে লিখুন। ব্যবসার ধরন পরিবর্তন, দোকানের কাঠামোগত পরিবর্তন, সাইনবোর্ড স্থাপন বা অন্য কাউকে দোকান ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে কী নিয়ম থাকবে, তা আগেই নির্ধারণ করুন।
৮. চুক্তি বাতিল ও দোকান ছাড়ার নোটিশ
কোন পরিস্থিতিতে দোকানমালিক বা ভাড়াটিয়া চুক্তি শেষ করতে পারবেন, কত দিন আগে লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং দোকান ছাড়ার সময় চাবি হস্তান্তর ও বকেয়া বিল নিষ্পত্তির নিয়ম কী হবে, তা উল্লেখ করুন। এ ধরনের শর্ত অবশ্যই প্রযোজ্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
দোকান ঘর ভাড়ার চুক্তিনামার নমুনা
নিচের নমুনাটি প্রয়োজন অনুযায়ী পূরণ করে ব্যবহার করা যেতে পারে। চূড়ান্ত চুক্তি করার আগে স্থানীয় আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর মাধ্যমে শর্তগুলো যাচাই করা ভালো।
দোকানঘর ভাড়ার চুক্তিনামা
এই চুক্তিনামা আজ __________ তারিখে নিম্নলিখিত দুই পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত হলো।
প্রথম পক্ষ (দোকানমালিক):নাম: __________________________পিতা/মাতার নাম: __________________ঠিকানা: ________________________জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য: ______________
দ্বিতীয় পক্ষ (ভাড়াটিয়া):নাম: __________________________পিতা/মাতার নাম: __________________ঠিকানা: ________________________জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য: ______________
১. দোকানের বিবরণ:দোকানের নম্বর __________, ঠিকানা __________________________। প্রথম পক্ষ উক্ত দোকান দ্বিতীয় পক্ষকে ভাড়া দিতে সম্মত হলেন।
২. মাসিক ভাড়া:দোকানের মাসিক ভাড়া __________ টাকা। প্রতি মাসের __________ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।
৩. অগ্রিম বা জামানত:দ্বিতীয় পক্ষ __________ টাকা অগ্রিম/জামানত হিসেবে প্রদান করেছেন। এই অর্থ ফেরত বা সমন্বয়ের শর্ত হবে __________________________।
৪. চুক্তির মেয়াদ:চুক্তিটি __________ তারিখ থেকে __________ তারিখ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। নবায়নের শর্ত হবে __________________________।
৫. বিল ও অন্যান্য খরচ:বিদ্যুৎ, পানি, সার্ভিস চার্জ ও অন্যান্য প্রযোজ্য বিল পরিশোধের দায়িত্ব থাকবে __________________________-এর।
৬. দোকানের ব্যবহার:দোকানটি __________________ ব্যবসার কাজে ব্যবহার করা হবে। ব্যবহার পরিবর্তন বা অন্য কাউকে ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে __________________________ শর্ত প্রযোজ্য হবে।
৭. মেরামত ও ক্ষয়ক্ষতি:দোকানের সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ, বড় ধরনের মেরামত এবং ভাড়াটিয়ার কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায়িত্ব হবে __________________________।
৮. চুক্তি বাতিল:চুক্তি শেষ বা বাতিল করার ক্ষেত্রে লিখিত নোটিশের সময়সীমা হবে __________ দিন/মাস, তবে তা প্রযোজ্য আইন ও চুক্তির বৈধ শর্তের অধীন থাকবে।
৯. বিরোধ নিষ্পত্তি:চুক্তি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজনে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
উভয় পক্ষ চুক্তির শর্তগুলো পড়ে, বুঝে এবং স্বেচ্ছায় সম্মত হয়ে স্বাক্ষর করলেন।
প্রথম পক্ষের স্বাক্ষর: __________________দ্বিতীয় পক্ষের স্বাক্ষর: _________________
সাক্ষী ১-এর নাম ও স্বাক্ষর: ______________সাক্ষী ২-এর নাম ও স্বাক্ষর: ______________
তারিখ: ______________________________
চুক্তিনামা করার আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
দোকানমালিকের মালিকানা বা ভাড়া দেওয়ার বৈধ অধিকার যাচাই করুন। চুক্তির প্রতিটি পাতায় উভয় পক্ষের স্বাক্ষর বা প্রাথমিক স্বাক্ষর রাখার বিষয়টি বিবেচনা করুন। টাকা লেনদেনের রসিদ সংরক্ষণ করুন এবং উভয় পক্ষের কাছে চুক্তির স্বাক্ষরিত কপি রাখুন।
চুক্তিতে ফাঁকা জায়গা রেখে স্বাক্ষর করা, জামানতের শর্ত অস্পষ্ট রাখা কিংবা দোকান ছাড়ার নোটিশের নিয়ম উল্লেখ না করা ভবিষ্যতে বিরোধের কারণ হতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে দোকানঘর ভাড়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ভাড়া-সংক্রান্ত আইন, চুক্তির ধরন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী স্ট্যাম্প বা নিবন্ধনের বিধান ভিন্ন হতে পারে। তাই শুধু সাধারণ নমুনা অনুসরণ না করে চূড়ান্ত চুক্তি করার আগে আইনগত প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা উচিত।
দোকান ভাড়ার চুক্তিনামা যত স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ হবে, দোকানমালিক ও ভাড়াটিয়া—দুই পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব বোঝা তত সহজ হবে। ভাড়া, জামানত, মেয়াদ, বিল, মেরামত এবং দোকান ছাড়ার নিয়ম লিখিতভাবে নির্ধারণ করাই ভবিষ্যতের অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধ কমানোর অন্যতম উপায়।

সোহাগ/
