নবম পে-স্কেল: বেতন নির্ধারণ শেষ, বকেয়া পাবেন কবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন পর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। নবম পে-স্কেল অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন নির্ধারণ বা ‘পে ফিক্সেশন’ কার্যক্রমের নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ২০ অক্টোবর। নতুন বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের পার্থক্য এবং বকেয়া পাওনার হিসাবও এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত করার কথা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৫ অক্টোবর থেকে আইবাস প্লাস প্লাস (iBAS++) ব্যবস্থায় পে ফিক্সেশন কার্যক্রম শুরু হয়। তবে প্রতিরক্ষা ও জুডিশিয়াল সার্ভিসের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া তখনো চলমান ছিল। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কতজনের বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি কাজের জন্য সময় বাড়ানো হবে কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য প্রয়োজন।
নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন কত?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই নতুন বেতনক্রম সাজানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
নতুন বেতনক্রমের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হার নিচে দেওয়া হলো:
গ্রেড| প্রারম্ভিক মূল বেতন
১ম| ১,৫৬,০০০ টাকা
২য়| ১,৩২,০০০ টাকা
৩য়| ১,১৩,০০০ টাকা
৪র্থ| ১,০০,০০০ টাকা
৫ম| ৮৬,০০০ টাকা
৬ষ্ঠ| ৭১,০০০ টাকা
৯ম| ৪৪,০০০ টাকা
১০ম| ৩২,০০০ টাকা
১১তম| ২৫,০০০ টাকা
১৬তম| ২১,৯০০ টাকা
২০তম| ২০,০০০ টাকা
গুরুত্বপূর্ণ: এসব বেতনহার ও নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের তথ্য সরকারি প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চূড়ান্ত সরকারি আদেশ যাচাই ছাড়া এগুলোকে নিশ্চিতভাবে কার্যকর বেতনহার হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে কি তিন মাসের বকেয়া মিলবে?
নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বর্ধিত বেতনের অংশ বকেয়া হিসেবে পাওয়ার প্রশ্ন আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পে ফিক্সেশন শেষ হওয়ার পর অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে এই বকেয়া সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বকেয়া পাওয়ার পরিমাণ সবার জন্য এক হবে না। সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর গ্রেড, আগের মূল বেতন, নতুন বেতনক্রম এবং কার্যকর হওয়ার নিয়ম অনুযায়ী পাওনার হিসাব নির্ধারিত হবে। তাই বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হলেই প্রত্যেকের হিসাবে একই অঙ্ক জমা হবে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন?
প্রতিবেদনে বেতন বৃদ্ধির অর্থ তিন ধাপে কার্যকরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তা এবং তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মীরা পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ পাবেন। দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীদের ক্ষেত্রে এই হার ৫০ শতাংশ।
দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রথম থেকে নবম গ্রেডের জন্য পার্থক্যের ৭০ শতাংশ এবং দশম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ৭৫ শতাংশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তৃতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টসহ নতুন মূল বেতনের শতভাগ কার্যকরের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে এই ধাপভিত্তিক হিসাব কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ যাচাই করা জরুরি।
পে ফিক্সেশনে যেসব তথ্য যাচাই করতে হবে
নতুন মূল বেতন নির্ধারণের সময় চাকরিজীবীদের ব্যক্তিগত ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সঠিক থাকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে আইবাস++ ব্যবস্থায় যেসব তথ্য যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও জন্মতারিখ
- বর্তমান পদবি ও বেতন গ্রেড
- চাকরিতে যোগদানের তারিখ
- ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত মূল বেতন
- আগের বেতন নির্ধারণের রেকর্ড
- পদোন্নতি, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেডসংক্রান্ত তথ্য
এসব তথ্যের কোনোটি ভুল হলে নতুন মূল বেতন বা বকেয়ার হিসাবে অসংগতি দেখা দিতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তথ্য ও দাফতরিক আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন।
নতুন বেতন বাড়লেও সব ভাতা কি বাড়বে?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯ অক্টোবর অর্থ বিভাগ শতাংশভিত্তিক প্রচলিত ভাতা নির্ধারণের বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সেখানে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট ভাতার হিসাব ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত মূল বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারণ ও প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, নতুন মূল বেতন নির্ধারিত হলেই সব ভাতা একই সঙ্গে নতুন মূল বেতনের অনুপাতে বেড়ে যাবে—এমন নয়। কোন ভাতা কখন এবং কীভাবে কার্যকর হবে, তা সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন ও বিধানের ওপর নির্ভর করবে।
প্রতিবেদনে নতুন হারে ভাতা কার্যকরের সাধারণ সময় হিসেবে ১ জানুয়ারি ২০২৮-এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ তারিখ ও ভাতার নিয়ম সরকারি প্রজ্ঞাপন থেকে যাচাই করে প্রকাশ করা উচিত।
পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় কত?
প্রতিবেদনে সরকারের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার অবসরপ্রাপ্ত ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হতে পারেন।
নতুন কাঠামো সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পেনশনভোগীদের সুবিধা বৃদ্ধি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে এমন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ভাতা এবং মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণের বিষয়ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব সুবিধার চূড়ান্ত পরিধি ও কার্যকরের সময় সরকারি আদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
এখন সরকারি চাকরিজীবীদের করণীয় কী?
পে ফিক্সেশনের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের বেতন নির্ধারণের অবস্থা জানা এবং ব্যক্তিগত ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য ঠিক আছে কি না নিশ্চিত করা। বেতন নির্ধারণে কোনো সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্ট হিসাব কার্যালয় বা দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে বর্ধিত বেতন বা তিন মাসের বকেয়া পাওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট হিসাব কার্যালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে প্রত্যাশা থাকলেও পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়া, বেতন-ভাতা কার্যকর হওয়া এবং বকেয়া অর্থ হাতে পাওয়া—এই তিনটি আলাদা বিষয়। তাই নির্দিষ্ট তারিখে অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তা ধরে না নিয়ে সরকারি ঘোষণা ও নিজের বেতন নির্ধারণের অবস্থা যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সিদ্দিকা/
