সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কি ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে
নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা এবং অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (এফআইআই) ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সৌদি অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে এসব সংকটের অর্থ এই নয় যে যুবরাজের ক্ষমতা হারানো আসন্ন।
হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বিমানবন্দরকে ঘিরে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর রিয়াদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলনটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘মরুভূমির দাভোস’ নামে পরিচিত সম্মেলনটি সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং যুবরাজের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
সম্মেলন স্থগিত হওয়া সৌদি আরবের জন্য কেবল একটি আয়োজন পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে দেশটির ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় তৈরি হওয়া ঝুঁকিরও ইঙ্গিত দেয়।
হুথিদের মোকাবিলায় কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে রিয়াদ
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের সংঘাতে জড়িত। কিন্তু সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও হুথিদের পুরোপুরি পরাজিত করা সহজ হয়নি। সংঘাত আরও বাড়লে সৌদি আরবকে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের খরচ ও নিরাপত্তাঝুঁকি বহন করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, সমঝোতার পথে এগোলে ইয়েমেনে হুথিদের প্রভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সামরিক অভিযান, প্রতিরক্ষা জোরদার এবং কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সৌদি নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু সীমান্ত ও অবকাঠামোর নিরাপত্তাই নয়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনায় বাড়ছে চাপ
মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি আরব ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির মাধ্যমে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনোদন ও অন্যান্য খাতে অর্থনীতি সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে প্রভাব পড়তে পারে। নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও সতর্ক হতে পারে।
এফআইআই সম্মেলন স্থগিত হওয়ায় সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে নতুন বাধা তৈরি হয়েছে। তবে একটি সম্মেলন পিছিয়ে যাওয়াকে পুরো অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি ব্যর্থ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা নিয়েও প্রশ্ন
সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তবে আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত রিয়াদের স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মূল বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে সৌদি আরবকে একাধিক দিক থেকে নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলা করতে হতে পারে।
এ কারণে সৌদি আরবের জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং তার সুফল পাওয়া সময়সাপেক্ষ।
তাহলে কি ক্ষমতা হারাতে পারেন মোহাম্মদ বিন সালমান?
সৌদি যুবরাজের সামনে একাধিক গুরুতর চ্যালেঞ্জ থাকলেও তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা আসন্ন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত প্রমাণ মূল বিশ্লেষণে নেই।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ নিরাপত্তা সংকট ও অর্থনৈতিক চাপকে তাঁর নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। তবে রিয়াদে কর্মরত কয়েকজন কূটনীতিকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুবরাজের ক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি সুসংহত। সম্ভাব্য চাপ ও অসন্তোষ থাকলেও সংগঠিতভাবে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি রয়েছে—এমন প্রমাণও তুলে ধরা হয়নি।
অতীতে ইয়েমেন যুদ্ধ, কাতারের সঙ্গে বিরোধ এবং সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিক সমালোচনার মতো সংকটের মুখেও পড়েছিলেন যুবরাজ। বর্তমানে তাঁর ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আগের তুলনায় বেশি কেন্দ্রীভূত বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ক্ষমতা সুসংহত থাকা মানেই বর্তমান সংকটের প্রভাব নেই, এমন নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি বজায় রাখাই এখন সৌদি নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা।
সৌদি আরবের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়তে পারে, বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, সৌদি যুবরাজ এখন চাপের মুখে থাকলেও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত বা আসন্ন বলে দাবি করার সুযোগ নেই। তাঁর নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপথ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।
সোহাগ/
