নামজারি করতে কত দিন লাগে, আবেদন করার আগে যা জানা প্রয়োজন
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি কেনার পর কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো নামজারি। জমির নতুন মালিকের নামে সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করার এই প্রক্রিয়াকে অনেকে মিউটেশন বা খারিজও বলে থাকেন। তবে নামজারির আবেদন করলেই সঙ্গে সঙ্গে কাজ শেষ হয় না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই, ভূমি অফিসের প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনে শুনানির মতো ধাপ পার হতে হয়।
তাই নামজারির আবেদন করার আগে কত দিন সময় লাগতে পারে, কোন কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে এবং আবেদন আটকে গেলে কী করবেন, তা জানা জরুরি।
নামজারি করতে কত দিন সময় লাগে?
বাংলাদেশে নামজারি নিষ্পত্তির সময় আবেদনটির ধরন, জমির কাগজপত্রের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন সাধারণত সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে পাঠানোর নির্দেশনাও রয়েছে। তবে এটি পুরো নামজারি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সময়সীমা নয়।
পুরোনো ভূমি প্রশাসন নির্দেশিকায় মহানগর এলাকায় নামজারি-জমাভাগ নিষ্পত্তির জন্য ৬০ কার্যদিবস এবং অন্যান্য এলাকায় ৪৫ কার্যদিবসের উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব সময়সীমা পুরোনো নির্দেশনার অংশ। বর্তমানে আপনার এলাকার আবেদন কোন সময়সীমায় নিষ্পত্তি হওয়ার কথা, তা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা সরকারি ই-নামজারি পোর্টাল থেকে যাচাই করে নেওয়া ভালো। ভূমি প্রশাসন নির্দেশিকা মনে রাখতে হবে, কার্যদিবস আর ক্যালেন্ডার দিনের হিসাব এক নয়। কাগজপত্রে ঘাটতি, মালিকানা নিয়ে বিরোধ কিংবা অতিরিক্ত তদন্তের প্রয়োজন হলে প্রক্রিয়ায় আরও সময় লাগতে পারে।
নামজারির আবেদন করার আগে যেসব কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন
আবেদনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে পার্থক্য থাকতে পারে। সাধারণভাবে নিচের নথিগুলো প্রস্তুত রাখা উপকারী:
-
জমির দলিল: ক্রয়, দান বা হস্তান্তরের মাধ্যমে জমি পেলে সংশ্লিষ্ট দলিলের কপি।
-
আগের খতিয়ান: জমির পূর্ববর্তী রেকর্ড বা খতিয়ানের কপি।
-
জাতীয় পরিচয়পত্র: আবেদনকারীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য।
-
ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য: প্রযোজ্য ক্ষেত্রে হালনাগাদ কর পরিশোধের প্রমাণ।
-
ওয়ারিশ সনদ: উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলে প্রয়োজনীয় উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি।
-
প্রাসঙ্গিক অতিরিক্ত কাগজপত্র: জমির ধরন ও মালিকানা হস্তান্তরের পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্যান্য দলিল বা প্রমাণ।
সব আবেদনে একই তালিকার প্রতিটি কাগজ লাগবে, এমন নয়। আবেদন জমা দেওয়ার আগে সরকারি ই-নামজারি পোর্টাল বা সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় নথির তালিকা নিশ্চিত করে নিন।
অনলাইনে নামজারির আবেদন করবেন যেভাবে
নামজারির আবেদন করার জন্য সরকারি ই-নামজারি ব্যবস্থা ব্যবহার করা যায়। আবেদনের সময় জমির তথ্য, আবেদনকারীর পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে দিতে হবে।
আবেদনের ধাপগুলো হলো:
১. সরকারি ই-নামজারি পোর্টালে প্রবেশ করুন।
২. আবেদনকারীর তথ্য ও জমির বিবরণ নির্ভুলভাবে পূরণ করুন।
৩. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্দেশনা অনুযায়ী সংযুক্ত করুন।
৪. নির্ধারিত আবেদন ও নোটিশ জারির ফি পরিশোধ করুন।
৫. আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্ত নম্বর ও রসিদ সংরক্ষণ করুন।
৬. আবেদনটির অবস্থা নিয়মিত অনুসরণ করুন এবং ভূমি অফিস থেকে অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্র চাওয়া হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিন।
সরকারি পোর্টাল: https://mutation.land.gov.bd/
নামজারির আবেদন আটকে গেলে কী করবেন?
আবেদন জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় কোনো অগ্রগতি না হলে প্রথমে আবেদন নম্বর দিয়ে অনলাইনে অবস্থা যাচাই করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে আবেদনটি কোন পর্যায়ে আছে, তা জেনে নিন।
কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে ঠিক কোন নথি প্রয়োজন, তা স্পষ্টভাবে বুঝে নিন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথম আদেশে প্রয়োজনীয় দলিলের ঘাটতি থাকলে তা উল্লেখ করে আবেদনকারীকে কাগজপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাধারণত সাত কার্যদিবস বা পরিস্থিতি অনুযায়ী যুক্তিসংগত সময় দেওয়া যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা আবেদন নামঞ্জুর হলে শুধু মৌখিক তথ্যের ওপর নির্ভর না করে লিখিত আদেশ ও নামঞ্জুরের কারণ জেনে নিন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
নামজারির আগে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
নামজারির আবেদন করার সময় দলিল, খতিয়ান ও জমির দাগ নম্বরের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি। নামের বানান, জমির পরিমাণ কিংবা মালিকানার ধারাবাহিকতায় অসংগতি থাকলে আগে থেকেই বিষয়টি যাচাই করুন।
এ ছাড়া ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন করা, প্রয়োজনীয় নথি অসম্পূর্ণ রাখা এবং আবেদন নম্বর বা ফি পরিশোধের রসিদ সংরক্ষণ না করা থেকে বিরত থাকুন। আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির আশায় অননুমোদিত ব্যক্তি বা দালালের ওপর নির্ভর না করে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
নামজারি করতে কত দিন লাগবে, তার নির্দিষ্ট উত্তর নির্ভর করে আবেদন ও জমির পরিস্থিতির ওপর। সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা এবং আবেদনটির অগ্রগতি অনুসরণ করলে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো সম্ভব।
জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ বা দলিলের তথ্যের অসংগতি থাকলে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সোহাগ/
