মঙ্গলের চাঁদ থেকে ১০ গ্রাম পাথর আনবে জাপান, ফিরবে ২০৩১ সালে
নিজস্ব প্রতিবেদক: মঙ্গলগ্রহের উপগ্রহ ফোবোস থেকে পাথর ও ধূলিকণার নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করেছে জাপান। সফল হলে মঙ্গলগ্রহের উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এটি হবে বিশ্বের প্রথম অভিযান। বিজ্ঞানীদের আশা, এই মিশনের মাধ্যমে মঙ্গলের দুই উপগ্রহের উৎপত্তি এবং সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সির (জেএএক্সএ) নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানের নাম মার্স মুন্স এক্সপ্লোরেশন (এমএমএক্স)। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর জাপানের তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে এইচ-৩ রকেটের সাহায্যে মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের আগস্টে এটি মঙ্গলগ্রহের কাছে পৌঁছাবে। এরপর ফোবোস ও ডিমোস—দুটি উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করে মূল নমুনা সংগ্রহের কাজ চালাবে।
ফোবোস থেকে কীভাবে নমুনা সংগ্রহ করবে মহাকাশযান?
ফোবোস মঙ্গলের দুটি প্রাকৃতিক উপগ্রহের মধ্যে বড়টি। এর আকৃতি অনিয়মিত এবং মহাকর্ষ বল অত্যন্ত দুর্বল। ফলে সেখানে অবতরণ করা ও স্থিতিশীলভাবে নমুনা সংগ্রহ করা সহজ নয়।
এমএমএক্স মিশনে ফোবোসের পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি রোভারও ব্যবহার করা হবে। ফরাসি ও জার্মান মহাকাশ সংস্থার সহযোগিতায় তৈরি ‘আইডেফিক্স’ নামের রোভারটি সম্ভাব্য অবতরণস্থল ও ভূপ্রকৃতি বিশ্লেষণে সহায়তা করবে। এরপর মূল মহাকাশযান ফোবোসের পৃষ্ঠে অবতরণ করে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে নমুনা সংগ্রহ করবে।
সংগ্রহ করা হবে। পরিমাণে অল্প হলেও এই নমুনা বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পৃথিবীর পরীক্ষাগারে উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অতি ক্ষুদ্র কণার রাসায়নিক ও খনিজ উপাদানও বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
২০৩১ সালে পৃথিবীতে ফিরবে নমুনা
এমএমএক্স মিশনের পুরো যাত্রা প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালে মঙ্গলগ্রহের কাছে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানটি দীর্ঘ সময় ধরে উপগ্রহ দুটি পর্যবেক্ষণ করবে। নমুনা সংগ্রহের পর ২০৩০ সালের দিকে মঙ্গলগ্রহের অঞ্চল ছেড়ে পৃথিবীর উদ্দেশে যাত্রা শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩১ সালে নমুনাবাহী ক্যাপসুল পৃথিবীতে ফিরবে। ক্যাপসুলটি অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের উমেরা এলাকায় উদ্ধার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে নমুনা সংগ্রহ ও পৃথিবীতে ফেরার সময়সূচি মিশনের অগ্রগতি এবং মহাকাশযানের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে।
মঙ্গলের দুই উপগ্রহের জন্মরহস্য কি জানা যাবে?
ফোবোস ও ডিমোস কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা গ্রহবিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন। এ বিষয়ে প্রধানত দুটি ধারণা রয়েছে।
প্রথম ধারণা অনুযায়ী, অতীতে মঙ্গলের সঙ্গে বড় কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষের ফলে ছিটকে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ একত্রিত হয়ে উপগ্রহ দুটি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। দ্বিতীয় ধারণা হলো, এগুলো একসময় স্বতন্ত্র গ্রহাণু ছিল, পরে মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে তার কক্ষপথে আটকে যায়।
ফোবোস থেকে আনা নমুনার রাসায়নিক ও খনিজ গঠন বিশ্লেষণ করলে এই দুই ধারণার মধ্যে কোনটি বেশি গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণে বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেতে পারেন। নমুনার মধ্যে মঙ্গলগ্রহ থেকে ছিটকে আসা উপাদান থাকলেও তা লাল গ্রহটির অতীত সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে।
কেন এই অভিযান এত গুরুত্বপূর্ণ?
মঙ্গলগ্রহের উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা মহাকাশ গবেষণায় একটি বড় পদক্ষেপ। দূর থেকে ছবি ও তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সরাসরি নমুনা বিশ্লেষণ করলে কোনো মহাজাগতিক বস্তুর উপাদান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায়।
এমএমএক্স মিশন শুধু ফোবোসের উৎপত্তি অনুসন্ধানেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দূর মহাকাশে যাতায়াত, দুর্বল মহাকর্ষের পরিবেশে অবতরণ এবং নিরাপদে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তিও পরীক্ষা করবে। ভবিষ্যতের গ্রহ অনুসন্ধান অভিযানে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, জাপানের এই অভিযান সফল হলে মঙ্গলের উপগ্রহের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। মাত্র ১০ গ্রাম নমুনাই হয়তো বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিতে পারে সৌরজগতের জন্ম ও বিবর্তনের অজানা কিছু রহস্য।
সিদ্দিকা/
