প্রথমবার কালো ধানের চাষে বড় চমক
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর দুর্গাপুরে পরীক্ষামূলকভাবে কালো ধানের চাষ শুরু করেছেন দুই কৃষক। ফলন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে নতুন এই ফসল থেকে ভালো আয়ের আশা করছেন তাঁরা।
রাজশাহীর দুর্গাপুরে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে চাষ হচ্ছে কালো ধান বা ব্ল্যাক রাইস। প্রচলিত ধানের পাশাপাশি নতুন এই ফসলের আবাদ ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আগ্রহ। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, ফলন ও নির্ধারিত দাম পাওয়া গেলে প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদিত ধান বিক্রি করে ৬৪ হাজার থেকে ৭২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতে পারে। তবে উৎপাদন খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত লাভ কত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুর পৌরসভার দেবীপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সোহান ১৬ কাঠা জমিতে কালো ধানের চাষ করেছেন। অন্যদিকে, মাড়িয়া ইউনিয়নের পালি গ্রামের কৃষক আবু তালেব আবাদ করেছেন প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে। নতুন এই ধানের চাষাবাদ ও পরিচর্যায় কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
কেন কালো ধানের চাষে আগ্রহী কৃষকেরা?
সাধারণ ধানের তুলনায় কালো চালের বাজারমূল্য বেশি হতে পারে—এমন সম্ভাবনা থেকেই নতুন ফসলটি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন কৃষকেরা। তবে দুর্গাপুরে পরীক্ষামূলক এই আবাদ থেকে বাণিজ্যিকভাবে কতটা লাভ হবে, তা নির্ভর করবে ফলন, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারে ক্রেতার চাহিদার ওপর।
কৃষক আবু তালেব বলেন, “ব্ল্যাক রাইস আমাদের এলাকায় একেবারেই নতুন। তাই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে আড়াই বিঘা জমিতে চাষ করেছি। ফলন ভালো হলে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে লাভবান হতে পারব। এ উদ্যোগ সফল হলে আশপাশের অন্য কৃষকেরাও এই ধান চাষে আগ্রহী হবেন।”
বিঘাপ্রতি বিক্রি হতে পারে ৭২ হাজার টাকা
কৃষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘায় ১৬ থেকে ১৮ মণ কালো ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি মণ ধানের সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ৪ হাজার টাকা ধরা হলে হিসাবটি দাঁড়ায়—
-
১৬ মণ ধান: বিক্রি হতে পারে ৬৪ হাজার টাকায়।
-
১৮ মণ ধান: বিক্রি হতে পারে ৭২ হাজার টাকায়।
তবে এই হিসাব সম্ভাব্য মোট বিক্রির, নিট মুনাফার নয়। বীজ, জমি প্রস্তুত, সার, সেচ, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে কৃষকের হাতে কত টাকা থাকবে, তা ফলন ও প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত দামে ধান বিক্রির জন্য ক্রেতা পাওয়া যাবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কালো চালের বিশেষত্ব কী?
কালো চালের গাঢ় রংয়ের অন্যতম কারণ অ্যান্থোসায়ানিন নামের প্রাকৃতিক রঞ্জক উপাদান। এ ধরনের চালে খাদ্য-আঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকতে পারে। এ কারণে স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের কাছে কালো চালের আলাদা আগ্রহ রয়েছে।
তবে পুষ্টিগুণ বা বেশি বাজারমূল্যের সম্ভাবনা থাকলেই কালো ধানের চাষ সব এলাকায় লাভজনক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। স্থানীয় আবহাওয়া, মাটির উপযোগিতা, জাতের বৈশিষ্ট্য, ফলন এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ বিবেচনা করেই এ ধরনের ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
কৃষকদের পাশে রয়েছে কৃষি বিভাগ
দুর্গাপুর পৌরসভা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ এবং পালি ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুমিনুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে কৃষকদের জমিতে ধানের পরিচর্যা করা হচ্ছে।
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, দুর্গাপুরে প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক রাইসের আবাদ কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। নতুন ও সম্ভাবনাময় ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। এবারের ফলন, উৎপাদন খরচ ও বাজারের চাহিদা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে আবাদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সফল হলে বাড়তে পারে নতুন ফসলের আবাদ
রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রচলিত ধানের পাশাপাশি নতুন ফসলের আবাদ কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে পরীক্ষামূলক চাষ থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে হলে ফলনের স্থিতিশীলতা, উৎপাদন খরচ, চালের মান এবং বাজারে নিয়মিত চাহিদা নিশ্চিত করা জরুরি।
দুর্গাপুরের এই পরীক্ষামূলক আবাদে ফলন ও বাজারদর আশানুরূপ হলে ভবিষ্যতে অন্য কৃষকেরাও কালো ধান চাষে আগ্রহী হতে পারেন। আপাতত কৃষকদের লক্ষ্য—নতুন এই ধানের ফলন যাচাই করা এবং উৎপাদিত ফসলের উপযুক্ত বাজার খুঁজে পাওয়া।
সোহাগ/
