খতিয়ানে সব ওয়ারিশের নাম নেই, অধিকার নিয়ে যা জানা জরুরি
নিজস্ব প্রতিবেদক: উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির খতিয়ানে কয়েকজন ওয়ারিশের নাম আছে, কিন্তু অন্যদের নাম নেই। বাংলাদেশে অনেক পরিবারেই এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। বিশেষ করে বাবা-মা বা পরিবারের কোনো সদস্য মারা যাওয়ার পর জমির নামজারি করতে গিয়ে এক বা একাধিক উত্তরাধিকারীর নাম বাদ পড়লে জমির ভাগ, মালিকানা ও ভবিষ্যতে বিক্রি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে খতিয়ানে নাম না থাকলেই কোনো বৈধ ওয়ারিশের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। কারা বৈধ ওয়ারিশ, কে কতটুকু জমির অংশ পাবেন এবং জমির রেকর্ড কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নির্ভর করে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের ওপর।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, নামজারি বা মিউটেশনের মাধ্যমে জমির মালিকানা পরিবর্তনের তথ্য সরকারি রেকর্ডে হালনাগাদ করা হয়। এ কারণে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশদের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
খতিয়ানে নাম না থাকলে কি জমির অধিকার হারাবেন?
সাধারণভাবে, শুধু খতিয়ানে নাম না থাকার কারণে কোনো বৈধ ওয়ারিশের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায় না। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইন অনুযায়ী ওয়ারিশ কি না এবং সম্পত্তিতে তাঁর প্রাপ্য অংশ কত, তা যাচাই করতে হবে।
ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাঁর জমিতে আইন অনুযায়ী একাধিক ওয়ারিশের অধিকার সৃষ্টি হয়েছে। পরে তাঁদের কয়েকজনের নামে নামজারি করা হলো, কিন্তু একজনের নাম বাদ পড়ল। শুধু এই কারণে বাদ পড়া ব্যক্তির সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী অধিকার শেষ হয়ে যায় না। তিনি প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী নিজের অংশ দাবি করতে পারেন।
তবে প্রত্যেক আত্মীয়ই যে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন, তা নয়। কে কতটুকু পাবেন, তা নির্ধারিত হয় মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক, প্রযোজ্য ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার আইন এবং জীবিত ওয়ারিশদের পরিচয়সহ প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে।
সব ওয়ারিশের নাম না থাকলে কীভাবে নামজারি করবেন?
প্রথমে দেখতে হবে, জমিটি কার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এসেছে, আগের খতিয়ানে কার নাম ছিল এবং বর্তমানে কার নামে রেকর্ড রয়েছে। এরপর ওয়ারিশ সনদ, দলিল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মিলিয়ে দেখতে হবে কোনো উত্তরাধিকারীর নাম বাদ পড়েছে কি না।
পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে নামজারি বা রেকর্ড সংশোধনের জন্য আবেদন করা যেতে পারে। সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে:
-
মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ সনদ
-
জমির আগের খতিয়ান ও দাগ নম্বরের তথ্য
-
প্রাসঙ্গিক দলিল ও মালিকানার ধারাবাহিকতার কাগজপত্র
-
আবেদনকারীর পরিচয়সংক্রান্ত নথি
-
প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা
-
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চাওয়া অন্যান্য কাগজপত্র
কোন নথি প্রয়োজন হবে, তা জমির অবস্থা ও আবেদনের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।
যৌথ নামজারি ও পৃথক খতিয়ান কি একই বিষয়?
না, যৌথ নামজারি এবং জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করা এক বিষয় নয়।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে একাধিক ওয়ারিশের যৌথ অধিকার থাকলে তাঁদের প্রাপ্য অংশের তথ্যসহ যৌথ নামজারির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যেতে পারে। অন্যদিকে, জমি নির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান তৈরি করতে চাইলে বণ্টনসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩বি ধারায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া স্থাবর সম্পত্তি আপসের মাধ্যমে বণ্টন, বণ্টননামা তৈরি ও নিবন্ধন এবং সেই অনুযায়ী খতিয়ান সংশোধনের বিধান রয়েছে।
তাই সব ওয়ারিশের নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং জমি ভাগ করে পৃথক রেকর্ড তৈরি করার ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া প্রযোজ্য, তা আগে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে কী করবেন?
খতিয়ানে নিজের নাম নেই জানতে পারলে তাড়াহুড়া করে বিরোধে জড়ানোর পরিবর্তে প্রথমে জমির রেকর্ড ও মালিকানার কাগজপত্র যাচাই করুন।
১. আগের ও বর্তমান খতিয়ান সংগ্রহ করুন: জমির দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং রেকর্ডে কার নাম রয়েছে, তা মিলিয়ে দেখুন।
২. ওয়ারিশ সনদ যাচাই করুন: মৃত ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশ কারা, তা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ করুন।
৩. নামজারির নথি দেখুন: আগে নামজারির আবেদন হয়ে থাকলে আবেদন, আদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথির কপি সংগ্রহ করুন। এতে নাম বাদ পড়ার কারণ বোঝা সহজ হতে পারে।
৪. প্রয়োজনীয় আবেদন করুন: ভুল বা অসম্পূর্ণ রেকর্ডের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে নামজারি বা রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করুন। কোনো আপত্তি বা বিরোধ থাকলে প্রযোজ্য শুনানি ও সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।
৫. জটিল বিরোধে আইনগত পরামর্শ নিন: উত্তরাধিকার, মালিকানা বা জমির বণ্টন নিয়ে বিরোধ থাকলে জমির কাগজপত্র নিয়ে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নিন। পরিস্থিতি অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার প্রয়োজন হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, নামজারিতে বাদ পড়া ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা, রেকর্ডের ভুল সংশোধন এবং জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি সব সময় একই প্রক্রিয়ায় হয় না।
কয়েকজন ওয়ারিশের নামে খতিয়ান থাকলে কি তাঁরা পুরো জমি বিক্রি করতে পারবেন?
কয়েকজন ওয়ারিশের নামে খতিয়ান তৈরি হয়েছে বলেই তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো জমির একক মালিক হয়ে যান না। জমিতে অন্য বৈধ ওয়ারিশের অংশ থাকলে সেই অংশের অধিকারও বিবেচনায় নিতে হবে।
সাধারণভাবে, একজন সহমালিক নিজের আইনগত অংশ হস্তান্তর করতে পারেন, তবে অন্য সহমালিকের অংশ হস্তান্তরের অধিকার তাঁর আছে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়। জমির বণ্টন, নিবন্ধিত বণ্টননামা, দলিলের বিবরণ এবং আদালতের কোনো আদেশ থাকলে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫৩সি ধারায় জমি বিক্রির ক্ষেত্রে সর্বশেষ খতিয়ানে মালিক বা উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকের ক্ষেত্রে তাঁর পূর্বসূরির নাম থাকার বিষয়ে বিধান রয়েছে। তাই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি বা কেনার আগে শুধু বর্তমান খতিয়ান নয়, মালিকানার ধারাবাহিকতা ও প্রযোজ্য আইনি শর্তও যাচাই করা জরুরি।
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ হলে কী হবে?
জমি ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে। সব সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশ সম্মত হলে আইন অনুযায়ী বণ্টননামা তৈরি ও নিবন্ধনের মাধ্যমে জমি ভাগ করার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
কিন্তু কোনো ওয়ারিশ অন্যদের প্রাপ্য অংশ অস্বীকার করলে, জমি এককভাবে দখলে রাখলে অথবা মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি জটিল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দলিল, খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদ ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে আইনগত পদক্ষেপ নির্ধারণ করা উচিত। পরিস্থিতি অনুযায়ী বাটোয়ারা মামলা, স্বত্ব ঘোষণার মামলা বা অন্য উপযুক্ত প্রতিকার প্রয়োজন হতে পারে।
নিজেরা জোর করে জমি দখল করা বা অন্য ওয়ারিশদের অধিকার উপেক্ষা করে পুরো জমি বিক্রির চেষ্টা করলে বিরোধ আরও বাড়তে পারে।
জমির ওয়ারিশসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে যা মনে রাখবেন
উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়ার পর সব বৈধ ওয়ারিশের পরিচয় ও প্রাপ্য অংশ যাচাই করুন। নামজারি করার সময় সঠিক তথ্য দিন এবং আবেদন ও আদেশের কপি সংরক্ষণ করুন। জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে প্রয়োজনীয় বণ্টন ও নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খতিয়ান জমির রেকর্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও একে একমাত্র ও চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দলিল, উত্তরাধিকার, জমির বণ্টন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি একসঙ্গে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সারকথা: সব ওয়ারিশের নাম খতিয়ানে না থাকলেই তাঁদের অধিকার শেষ হয়ে যায় না, আবার খতিয়ানে নাম থাকা ব্যক্তিরাই পুরো জমির মালিক হয়ে যান না। জমির প্রকৃত মালিকানা ও প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ করতে হবে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন, দলিল এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের ভিত্তিতে।
সরকারি তথ্য যাচাইয়ের লিংক:
নোট: এটি সাধারণ তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন। নির্দিষ্ট জমির মালিকানা বা উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে আইনগত পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সোহাগ/
