‘নিজের ভেতরের মহিষাসুরকে দমন করুন’, অষ্টমীতে বার্তা
নিজস্ব প্রতিবেদক: দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমীতে ঢাকার বনানীতে পূজামণ্ডপে অঞ্জলি দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। এ সময় তিনি বলেছেন, দুর্গাপূজার প্রকৃত শিক্ষা হলো নিজের অহংকার বিসর্জন দেওয়া এবং মানুষের ভেতরে থাকা অশুভ চিন্তা ও হিংসাত্মক প্রবণতাকে দমন করা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপে সস্ত্রীক উপস্থিত হয়ে অঞ্জলি দেন ভারতীয় হাইকমিশনার। নিজের উপস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি এখানে ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে আসিনি। পরিবারের একজন সদস্য ও ভক্ত হিসেবে এসেছি।”
অঞ্জলি দেওয়ার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, পূজায় অঞ্জলি দেওয়ার প্রকৃত অর্থ হলো নিজের অহংকার ঈশ্বরের চরণে বিসর্জন দেওয়া এবং নিজেকে সমর্পণ করা।
তিনি বলেন, মানুষের ভেতরের অশুভ ও হিংসাত্মক চিন্তাভাবনাই প্রতীকী অর্থে মহিষাসুর। দৈনন্দিন জীবনে মানসিক হিংসা ও কুচিন্তা দমন করে নিজের ভেতরের এই ‘মহিষাসুর’কে পরাজিত করাই পূজার প্রকৃত শিক্ষা।
উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। তাঁর মতে, উৎসবের দিনে তৈরি হওয়া এই প্রীতি ও সম্প্রীতির পরিবেশ সারা বছর বজায় থাকা প্রয়োজন।
পূজামণ্ডপের প্রতিমা ও কারুকার্যের প্রশংসা করে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ—উভয় জায়গাতেই অসাধারণ শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এই ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন উৎসব শিল্পীদের নিজেদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। মণ্ডপের শিল্পকর্ম দেখে তিনি আনন্দিত হয়েছেন বলেও জানান।
সোমবার দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমী উপলক্ষে ঢাকার বনানীর গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপে সকাল থেকেই ভক্তদের সমাগম ঘটে। পুষ্পাঞ্জলি, সন্ধিপূজা ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ এলাকা।
মণ্ডপের পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী জানান, পঞ্জিকা ও শাস্ত্রীয় সময়সূচি অনুসারে সকালে মহাষ্টমীর পূজা সম্পন্ন হয়। এরপর ভক্তরা দেবী দুর্গার চরণে ফুল ও বেলপাতা অর্পণ করে পুষ্পাঞ্জলি দেন। এ সময় ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি, কাঁসর-ঘণ্টা ও মন্ত্রোচ্চারণে ভক্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মহাঅষ্টমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন সন্ধিপূজা। প্রচলিত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে দেবী দুর্গা চামুণ্ডা রূপে চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেন। সেই ঘটনাকে স্মরণ করে সন্ধিপূজায় বিশেষ উপাচার ও প্রদীপ প্রজ্বালনের আয়োজন করা হয়।
পুরোহিত হৃদয় চক্রবর্তী বলেন, মহাঅষ্টমীতে দেবীর দশ হাতে থাকা দিব্য অস্ত্রের বিশেষ পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। অশুভ শক্তির বিনাশ ও সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীকী বার্তা এই পূজার সঙ্গে যুক্ত।
গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় গোপাল রায় জানান, মহাঅষ্টমী উপলক্ষে সকাল থেকেই পূজামণ্ডপে বিপুলসংখ্যক ভক্তের উপস্থিতি ছিল। কয়েক ধাপে অঞ্জলি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
তিনি আরও জানান, পূজামণ্ডপে ভিড় থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন আয়োজকেরা।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। প্রতিবছর শরৎকালে দুর্গোৎসব ঘিরে ভক্তদের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ, আনন্দ ও মিলনমেলার পরিবেশ তৈরি হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের দুর্গাপূজায় ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। এরপর সপ্তমী ও মহাঅষ্টমীর পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মঙ্গলবার নবমীর পূজা এবং বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হওয়ার কথা রয়েছে।
দেবীর আগমন ও গমনের বাহন নিয়ে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসও দুর্গোৎসবের আলোচনার অংশ। তবে উৎসবের মূল বার্তা হিসেবে অশুভ চিন্তা ও হিংসা পরিহার করে মানুষের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার আহ্বানই গুরুত্ব পেয়েছে এবারের মহাঅষ্টমীর আয়োজনে।
সিদ্দিকা/
