এলপিজির দাম ৩০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। সংগঠনটির প্রস্তাব অনুযায়ী, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ১৩৭ টাকা করা হতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান নির্ধারিত দামের তুলনায় ৩০০ টাকা বেশি।
তবে এলপিজির দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে আগামী ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করার কথা রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। শুনানি শেষে কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম কেন বাড়ানোর প্রস্তাব?
চলতি অক্টোবর মাসেই বেসরকারি খাতের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল বিইআরসি। এর পর নতুন করে মূল্য কাঠামো সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে লোয়াব।
সংগঠনটির হিসাবে, অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের প্রস্তাবিত দাম ২ হাজার ১৩৭ টাকা। বর্তমান নির্ধারিত দামের তুলনায় এটি প্রায় ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি।
লোয়াবের প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ও আমদানিসংশ্লিষ্ট প্রিমিয়াম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে ঋণের সুদ, পরিচালন ব্যয়, কোম্পানির মুনাফা এবং অন্যান্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কোন খাতে কত টাকা বাড়ানোর দাবি?
লোয়াবের প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে অপারেটরদের মুনাফা ও করপোরেট ব্যয়ের বরাদ্দে। বর্তমানে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্য এ খাতে ৩৩ টাকা ধরা হলেও তা বাড়িয়ে ১৭৩ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এ খাতে অতিরিক্ত ১৪০ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রস্তাবে—
- আর্থিক ব্যয় ৩৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২৩ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
- মজুদ ও বোতলজাতকরণ ব্যয় ১৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৭ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে।
- বন্দরে গ্যাস খালাস, ব্যাংকিং ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও বাড়িয়ে ধরার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে লোয়াবের প্রস্তাবে পরিবেশকের কমিশন এবং আমদানি পর্যায়ের ভ্যাট অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে।
অন্যান্য কোম্পানির প্রস্তাবে কী রয়েছে?
লোয়াবের পাশাপাশি এলপিজি খাতের কয়েকটি কোম্পানিও মূল্য কাঠামোর বিভিন্ন খাতে ব্যয় ও বরাদ্দ বাড়ানোর আবেদন করেছে।
মেঘনা ফ্রেশ প্রতি কেজি এলপিজির মজুদ ও বোতলজাতকরণ ব্যয় ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ করা মূলধনের ওপর বছরে ২০ শতাংশ হারে মুনাফা বা রিটার্ন বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।
ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড প্রতি কেজিতে মজুদ ও বোতলজাতকরণ ব্যয় ৮ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়, ট্রেড প্রিমিয়াম এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি লিমিটেড মজুদ ও বোতলজাতকরণ ব্যয়ের পাশাপাশি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি কেজিতে ঋণ ও অর্থায়ন ব্যয় বাবদ ৮ টাকা ১২ পয়সা এবং টার্নওভার কর বাবদ ১ টাকা ৫০ পয়সা মূল্য কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
কোম্পানিগুলোর ভাষ্য, ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকদের মজুরি, বিদ্যুৎ, সিলিন্ডার রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। এসব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মূল্য কাঠামো সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করছে।
পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর দাবি
এলপিজির পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের পক্ষ থেকেও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে বিইআরসিতে।
মেসার্স তাহের এন্টারপ্রাইজ, মা এন্টারপ্রাইজ, জামাল এজেন্সি ও উজ্জ্বল ট্রেডার্সের আবেদনে পরিবেশক পর্যায়ের কমিশন সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু কোম্পানি পরিবহন ব্যয়ের একটি অংশ পরিবেশকদের বহন করতে বলায় তাদের খরচ আরও বাড়ছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতি মাসে অন্তত একবার এলপিজির দাম সমন্বয় এবং সব কোম্পানি নির্ধারিত মূল্য অনুসরণ করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারীরা।
এলপিজির দাম কীভাবে নির্ধারণ করে বিইআরসি?
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দামের ভিত্তিতে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে আসছে বিইআরসি।
দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া, ট্রেড প্রিমিয়াম, আমদানি পর্যায়ের কর, মজুদ ও বোতলজাতকরণ ব্যয় এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বিবেচনা করা হয়।
বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সুপারিশ দেওয়ার পর তা গণশুনানিতে উপস্থাপন করা হবে। শুনানি শেষে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
অতএব, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ১৩৭ টাকা করার বিষয়টি এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। বিইআরসির সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই দামকে চূড়ান্ত বা কার্যকর মূল্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
সোহাগ/
