এল নিনোর প্রভাবে এবার শীত কেমন হবে, জানালেন আবহাওয়াবিদ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে শীতের তীব্রতা কেমন হবে, তাপমাত্রা কতটা কমবে এবং কুয়াশা কতটা বাড়বে, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশের শীতকালেও পড়তে পারে। তবে দেশের কোন অঞ্চলে কী ধরনের পরিবর্তন হবে, তা নির্ভর করবে তখনকার সামগ্রিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর।
বাংলাদেশে আবহাওয়াগত হিসাবে ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি শীতকাল। সাধারণত দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতের অনুভূতি আগে বাড়ে। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ভোরে হালকা কুয়াশা ও ঠান্ডা আবহাওয়া দেখা যেতে পারে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শীতের অনুভূতি বাড়ার সময় আলাদা হতে পারে।
সহকারী আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ডিসেম্বরের আগে প্রকৃত শীতকাল শুরু হয় না। তবে উত্তরাঞ্চলে এর আগেই হালকা শীতের আমেজ অনুভূত হতে পারে। উত্তরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে শীতের প্রভাব তুলনামূলক আগে দেখা যায়।
আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছার ভাষ্য অনুযায়ী, এ বছর তাপমাত্রা তুলনামূলক কিছুটা বেশি থাকতে পারে। তবে কুয়াশা ও সূর্যের আলো কম থাকার কারণে শীতের অনুভূতি বেড়ে যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও আকাশ মেঘলা বা কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে এবং দিনের বেশির ভাগ সময় সূর্যের দেখা না মিললে বেশি ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। অর্থাৎ, শুধু সর্বনিম্ন তাপমাত্রা দিয়ে শীতের অনুভূতি পুরোপুরি বোঝা যায় না।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা জানান, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক আবহাওয়াগত তথ্য অনুযায়ী ডিসেম্বরেও এল নিনোর প্রভাব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তি থাকতে পারে এবং বাংলাদেশের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এল নিনোর প্রভাব সব দেশে বা সব অঞ্চলে একই রকম হয় না। বাংলাদেশের শীত, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রায় এর সুনির্দিষ্ট প্রভাব জানতে হালনাগাদ পূর্বাভাস ও পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া)-এর পূর্বাভাসে ২০২৬ সালের বাকি সময়ে এল নিনো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে নিশ্চিতভাবে বর্ণনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাস ও পরিমাপ যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো সতর্ক করেছেন, শক্তিশালী এল নিনো কিছু অঞ্চলে খরা ও অতিবৃষ্টির পরিস্থিতি তীব্র করতে পারে। একই সঙ্গে স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এল নিনো সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক ক্রিয়ায় পরিবর্তন আনে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আগে থেকেই বাড়ছে। এর সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে কিছু অঞ্চলে চরম গরমের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তবে ২০২৭ সাল বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশের কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ বা খরাসদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবার স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ঢাকাভিত্তিক জলবায়ু গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেছেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় এল নিনোর সময় দেশের কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ ও খরার মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তবে নির্দিষ্ট সময়ে বাংলাদেশে কতটি তাপপ্রবাহ হবে বা কোন এলাকায় খরা দেখা দেবে, তা নিশ্চিতভাবে জানাতে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের হালনাগাদ পূর্বাভাস প্রয়োজন। এ ধরনের তথ্য প্রকাশের সময় পূর্বাভাসের সময়সীমা ও প্রকাশের তারিখ যাচাই করা জরুরি।
শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে খরা বাড়তে পারে, আবার অন্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব কৃষি উৎপাদন, মাছের প্রাপ্যতা ও খাদ্য সরবরাহে পড়তে পারে।
দক্ষিণ আমেরিকার কিছু এলাকায় সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে আসা ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানির প্রবাহ কমে গেলে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে অ্যাঞ্চোভিসসহ কিছু মাছের প্রাপ্যতা কমার আশঙ্কা থাকে। অতীতেও শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে খরা, পানির সংকট ও খাদ্যনিরাপত্তার সমস্যার সম্পর্ক দেখা গেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করবে মৌসুমি বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, নদ-নদীর পরিস্থিতি ও কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর। তাই আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব আবহাওয়াগত তথ্য অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক রাজিব কুমার সাহার মতে, এল নিনো বন্ধ করা সম্ভব না হলেও এর সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, এল নিনো নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করা জরুরি। শীতের প্রকৃত তীব্রতা, তাপমাত্রার ওঠানামা ও বৃষ্টিপাতের ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পেতে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, শক্তিশালী এল নিনো বাংলাদেশের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এবার শীত কতটা তীব্র হবে, কুয়াশা কত দিন থাকবে কিংবা কোন অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
সিদ্দিকা/
