দেউলিয়ার পথে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার আরও গভীরভাবে পড়ছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি কয়লা ও এলএনজি আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে সরকারের ওপর লোকসানের চাপও বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের হিসাব ধরা হয়েছিল। তবে জ্বালানি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করেছেন।
তেল-গ্যাসেও বাড়ছে লোকসান
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিপুল লোকসানের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক হিসাবে, মার্চ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বর্তমানে সংস্থাটির দৈনিক লোকসান প্রায় ৮৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, বেশি দামে এলএনজি আমদানির কারণেও পেট্রোবাংলার ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
কয়লার দামেও চাপ
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি করে। ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা কয়লার সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জাহাজভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। ফলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে আগের তুলনায় বেশি খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে।
এদিকে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও বাংলাদেশে সরবরাহ কমেছে। রেলপথে কয়লা পরিবহনে জটিলতা ও বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে কয়লা সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমিয়েছে কেন্দ্রটি। ফলে বাংলাদেশ দিনের বিভিন্ন সময়ে চুক্তির ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
গ্যাস সংকটে ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা
দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহে সংকট থাকায় ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পিডিবির কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর সরকারের লোকসান কিছুটা কমার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই হিসাব এখন আবারও বদলে যেতে পারে।
এর আগে বিদ্যুৎ খাতে জমে থাকা বকেয়া এবং জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা এবং জ্বালানি আমদানির চাপ সরবরাহ ব্যবস্থাকেও কঠিন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সাশ্রয়ের পরামর্শ বিশেষজ্ঞের
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকার ও জনগণ উভয়কেই জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।
তার মতে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়লেও আগামী কয়েক মাস শিল্পকারখানা সচল রাখতে বেশি দামে তেল ও এলএনজি আমদানি করতে হতে পারে। তবে শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমলে পরিকল্পিতভাবে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে জনগণের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আমদানিনির্ভরতা, কয়লা ও জ্বালানির বাড়তি দাম এবং বিদ্যুৎ খাতের জমে থাকা আর্থিক চাপ একসঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পিডিবির লোকসান আরও বাড়ার পাশাপাশি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়তে পারে।
সোহাগ/
