ঢাকা, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬

অস্কারের চামড়া সাদা, জাতে পুরুষ, হাতে নেটফ্লিক্স

২০২০ জানুয়ারি ২৩ ১২:২০:০৪
অস্কারের চামড়া সাদা, জাতে পুরুষ, হাতে নেটফ্লিক্স

অস্কারের পদকটি দেখতে বড়ই নজরকাড়া। সোনালি দ্যুতিতে চারপাশ আলোকিত করে এটি। যিনি এই অস্কার–মূর্তি হাতে পান, তাঁকেও অভিজাত রঙে রাঙায় এই স্বীকৃতি। ৯২তম অস্কার আসরের মনোনয়ন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে অস্কারের ভিন্ন রূপ। মনোনয়নের

তালিকা অনুযায়ী, অস্কারের চামড়া সাদা এবং জাতে পুরুষ! আর হাতে নতুন অস্ত্র নেটফ্লিক্স। আসুন, একনজরে দেখে নেওয়া যাক এবারের অস্কার কিচ্ছা। জানাচ্ছেন অর্ণব সান্যাল নেটফ্লিক্সের প্রতাপ গত অস্কার আসরেই সবচেয়ে বড় যুদ্ধে জয়ী হয়েছিল নেটফ্লিক্স। শত শত ছবি বানালেও অস্কার কর্তৃপক্ষ পাত্তা দিচ্ছিল না। কিন্তু নেটফ্লিক্সও বসে থাকার পাত্র নয়। অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং ওয়েবসাইটটি ঠিকই আদায় করে নিয়েছিল অস্কারের স্বর্ণমূর্তি। রোমা ছবির বদৌলতে সেই যুদ্ধজয়ের কাহিনি এবার দ্য আইরিশম্যান–এর সৌজন্যে ইতিহাস গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এবারের অস্কার আসরে মোট ২৪টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে নেটফ্লিক্সের ছবি। যেকোনো একক মিডিয়া কোম্পানির জন্য এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। এরপরের স্থানেই আছে মূল ধারার চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ডিজনি, পেয়েছে ২৩টি মনোনয়ন। সনি পেয়েছে ২০টিতে। আর জোকার ছবির সৌজন্যে ওয়ার্নার ব্রাদার্স পেয়েছে ১১টি মনোনয়ন। নেটফ্লিক্সকে ইতিহাস গড়তে উৎসাহিত করেছেন মূলত মার্টিন স্করসিস। এই নন্দিত পরিচালকের তৈরি দ্য আইরিশম্যান পেয়েছে ১০ বিভাগে মনোনয়ন। ৬টি মনোনয়ন পেয়েছে ম্যারেজ স্টোরি, দ্য টু পোপস পেয়েছে ৩টি মনোনয়ন।

অ্যানিমেশন বিভাগেও ১টি মনোনয়ন পেয়েছে নেটফ্লিক্সের ব্যানারে তৈরি ক্লাউস। বাকি মনোনয়ন এসেছে দুটি ডকুমেন্টারি ছবির কল্যাণে। তবে নেটফ্লিক্সের এই সুদিন সহজে আসেনি। মূলধারার হলিউডে একসময়ের অচ্ছুত নেটফ্লিক্সই এবার চালকের আসনে আসীন হয়েছে। এবার দেখার পালা, ঠিক কয়টা ট্রফি নেটফ্লিক্সের শোকেসের ঠিকানায় যায়! পুরুষেরাই সব গোল্ডেন গ্লোবের আসর যে বিতর্কে শেষ হয়েছিল, ঠিক সেই বিতর্কের আগুনেই নতুন করে ঘি ঢেলেছে অস্কারের এবারের মনোনয়ন। পুরুষ প্রাধান্যের এক অনন্য নিদর্শন স্থাপন করেছে অস্কার।

গত আসরে নারীদের কিছুটা স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেরা পরিচালকের ক্ষুদ্র তালিকায় নারীদের অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টি কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। গত বছর নারী পরিচালকদের বেশ কিছু ছবি বক্স অফিস ও সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লুলু ওয়াংয়ের দ্য ফেয়ারওয়েল, গ্রেটা গারউইগের লিটল উইমেন, লরিন স্কাফারিয়ার হাসলারস ইত্যাদি। এর মধ্যে লিটল উইমেন যদিও ৬টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে, কিন্তু মজার বিষয় হলো, সেরা ছবি ও সেরা অভিনেতার মতো বিভাগে মনোনয়ন পেলেও ছবির পরিচালক গ্রেটা গারউইগের শিকে ছেঁড়েনি। নিন্দুকেরা বলছেন, নারী পরিচালকদের প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে অনীহাই এ ক্ষেত্রে প্রধান কারণ। কৃতিত্ব ও দক্ষতার বদলে সেখানে প্রধান বিবেচ্য হচ্ছে লৈঙ্গিক পরিচয়।

এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে বর্ণ ও লিঙ্গবৈষম্য কমাতে চেষ্টা করলেও এখনো একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস কর্তৃপক্ষের মোট সদস্যের ৬৮ শতাংশ পুরুষের দখলে। বলা হচ্ছে, এঁরাই যখন মনোনয়ন চূড়ান্তের ভোট দেন, তখন সচেতনভাবেই এড়িয়ে যান নারীদের। গত ১৩ বছরে হলিউড মোটে ৫৭ জন নারী পরিচালকের দেখা পেয়েছে। ঠিক একই সময়সীমায় পুরুষ পরিচালকের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৯১। এবার বুঝে নিন, পার্থক্য কতটা বিশাল! অথচ ওয়ান্ডার ওম্যান, ক্যাপটেন মার্ভেল, দ্য হার্ট লকার, ফ্রোজেন টুর মতো আলোচিত ও ব্যবসাসফল ছবির পরিচালনায় জড়িয়ে আছেন নারীরা। কিন্তু তারপরও ছবি পরিচালনার সুযোগই পাচ্ছেন না তাঁরা। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৮ সালের সময়সীমা হিসাবে নিলে দেখা যায়, প্রথম ছবির পর মোটে ১৩ শতাংশ নারী পরিচালক দ্বিতীয় ছবি নির্মাণ করতে পারছেন। অথচ পুরুষের ক্ষেত্রে এটি ২১ শতাংশ। অস্কারের শুরুটা হয়েছিল সেই ১৯২৯ সালে। এতগুলো বছরে মাত্র পাঁচজন নারীকে সেরা পরিচালকের তালিকায় মনোনয়ন দিয়েছে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের বিচারক তথা ভোটাররা। আর সেরা ছবি বিভাগে নারী পরিচালকদের তৈরি ছবি মনোনয়ন পেয়েছে কেবল ১৩ বার। এখন প্রশ্ন, নারীদের আর কতটা উপেক্ষা করবে হলিউড?

সাদা, সাদা অস্কারে শুভ্র গাত্রবর্ণের আধিক্য নতুন নয়। তবে ২০১৬ সালে এ নিয়ে প্রবল প্রতিবাদের ঝড় উঠলে, একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস কর্তৃপক্ষ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। গতবার কিছুটা উন্নতি হলেও এবার যেন কয়েক পা পিছিয়ে গেল একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস। ৯২তম আসরের মনোনয়নে দেখা গেছে, মনোনীত হওয়া ২০ জন অভিনেতা-অভিনেত্রীর মধ্যে ১৯ জনই শ্বেতাঙ্গ। নিন্দুকেরা বলছেন, শুধু গায়ের রং ও লিঙ্গের ভিন্নতার কারণেই নাকি হাসলারস ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করেও মনোনয়ন তালিকায় নাম ওঠাতে পারেননি জেনিফার লোপেজ। এর কারণ—বিচারকদের সাদা রঙে হারিয়ে যাওয়ার মানসিক প্রবণতা।

সমালোচকেরা বলছেন, একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস কর্তৃপক্ষের বর্ণ ও লিঙ্গবৈষম্য না করার অঙ্গীকার এবার দারুণভাবে হোঁচট খেয়েছে। এই সংস্থার সদস্য প্রায় ৯ হাজার। এঁদের ভোটেই মনোনয়ন ও পুরস্কারগ্রহীতা চূড়ান্ত হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই সদস্যরাই বের হতে পারছেন না সাদা রঙের মোহ থেকে। তাঁরা হয়তো ভাবছেন, শ্যামলা ও কৃষ্ণবর্ণের মানুষের অভিনয় ও ছবি নির্মাণের দক্ষতা নেই! ৯২তম আসরে সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া ৯টি ছবির ৪টির কাহিনিই ভীষণভাবে সাদা মানুষের, সাদা সমাজের। অন্য বর্ণের সেখানে গুরুত্ব নেই।

এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস কর্তৃপক্ষের সদস্যদের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ ছিল শ্বেতাঙ্গের বাইরে অন্য গাত্রবর্ণের। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৬ শতাংশ। কিন্তু প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে লড়াইয়ে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত—এই প্রশ্ন থাকছেই। ভূত নেই, আছে খলনায়ক ঐতিহাসিকভাবেই ভূতদের খুব একটা পাত্তা দেয় না অস্কার কর্তৃপক্ষ। ঐতিহ্য ধরে রেখে এবারও কোনো বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পায়নি ভৌতিক কোনো ছবি। অথচ গত বছর মুক্তি পেয়ে ভালো ব্যবসা করেছে মিডসোমার, আস ও হেরেডিটারির মতো ভয়ের ছবি।

একই সঙ্গে চলচ্চিত্র সমালোচকদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছে এসব ছবি। কিন্তু এসব ছবিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয়কে আমলেই নেয়নি একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস কর্তৃপক্ষ। একই অবস্থা কমিক বই থেকে তৈরি সুপারহিরোদের ছবির বেলায়। সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী বা সেরা ছবির তালিকায় সুপারহিরোদের স্থান মেলেনি; যা একটু মান রেখেছেন ‘জোকার’ জোয়াকিন ফিনিক্স। তাঁর কল্যাণেই হিথ লেজারের পর এই প্রথম কোনো কমিক চরিত্রের অস্কার জেতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

নায়কের বদলে তাই খলনায়কেই ভরসা রাখতে হচ্ছে কমিকপ্রেমীদের! মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে সমালোচনার যে রোল উঠছে, তা সামনের দিনগুলোয় বাড়তেই থাকবে। এই বিতর্ক ৯ ফেব্রুয়ারি অস্কার আসরের চূড়ান্ত আয়োজনে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।


হলিউড এর সর্বশেষ খবর

হলিউড - এর সব খবর