ঢাকা, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭

‘নীল মুকুট’ উৎসবের আগে দেশের মানুষ দেখবে: কামার আহমাদ সাইমন

২০১৯ ডিসেম্বর ২৬ ১২:১৫:০৩
‘নীল মুকুট’ উৎসবের আগে দেশের মানুষ দেখবে: কামার আহমাদ সাইমন

সিনেমা নিয়ে অস্থিরতা তাঁর একদমই পোষায় না। ‘শুনতে কি পাও!’ তাঁর প্রথম ছবি, দ্বিতীয় সন্তানের মতো। এই ছবি তাঁকে এনে দেয় বিশ্বের অন্যতম প্রামাণ্য চলচ্চিত্র উৎসব ‘সিনেমা দ্যু রিল’-এ সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার, গ্রাঁ প্রি। দীর্ঘদিন তাঁর

‘নীল মুকুট’ উৎসবের আগে দেশের মানুষ দেখবে: কামার আহমাদ সাইমন
সিনেমা নিয়ে অস্থিরতা তাঁর একদমই পোষায় না। ‘শুনতে কি পাও!’ তাঁর প্রথম ছবি, দ্বিতীয় সন্তানের মতো। এই ছবি তাঁকে এনে দেয় বিশ্বের অন্যতম প্রামাণ্য চলচ্চিত্র উৎসব ‘সিনেমা দ্যু রিল’-এ সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার, গ্রাঁ প্রি। দীর্ঘদিন তাঁর নতুন ছবির আর কোনো খোঁজ নেই। এর মধ্যে একটু একটু করে জন্মের প্রস্তুতি নিচ্ছে একটি নয়, দুটি নয়, তিনটি ছবি—‘নীল মুকুট’, ‘অন্যদিন...’ আর ‘শিকলবাহা’। তিনি কান-বার্লিন-লোকার্নোতে আমন্ত্রিত নির্মাতা। তিনি কামার আহমাদ সাইমন। সিনেমার সঙ্গে তাঁর জীবনযাপন নিয়েই সম্প্রতি কথা হলো এই নির্মাতার সঙ্গে, তাঁর বনানীর ডেরায়। ‘স্টুডিও বিগিনিং’য়ে হাজার বই, সিনেমা আর গানের মধ্যে কামার আহমাদ সাইমনের সঙ্গে চলল আলাপন।
প্রশ্ন: আপনার দ্বিতীয় ছবি ‘একটি সুতার জবানবন্দি’ মুক্তি পায় ২০১৫ সালে। তারপর প্রায় চার বছর ডুব দিয়ে আছেন, কী করলেন এত দিন?

কামার আহমাদ সাইমন: চার বছর না, বলতে পারেন প্রায় পাঁচ বছর। ২০১৪–তে আমার প্রথম ছবি ‘শুনতে কি পাও!’ মুক্তির পরই ডুব দিয়েছিলাম ‘শিকলবাহা’ আর ‘অন্যদিন...’ নিয়ে। ‘শিকলবাহা’র প্রথম স্ক্রিপ্টটা লিখেছিলাম ২০১১ সালে, তখন এর নাম ছিল ‘শঙ্খধ্বনি’। এরপর জলত্রয়ীর (ওয়াটার ট্রিলজির) দ্বিতীয় ছবি ‘অন্যদিন...’–এর (প্রথমটা ‘শুনতে কি পাও!’)শুরু ২০১৩ সালে। তখন এর স্ক্রিপ্টের প্রথম খসড়া লিখেছিলাম সানড্যান্সের জন্য। সেই বছর শুরুও করেছিলাম ছবির শুটিং, সানড্যান্সের গ্রান্ট দিয়ে। কিন্তু ২০১৪ সালে ‘শুনতে কি পাও!’ এর মুক্তি আর কানের লা ফ্যব্রিকে ‘শিকলবাহা’র আমন্ত্রণ আমার সব পরিকল্পনা বদলে দেয়। সেবার কানেই পরিচয় হয় একজন মার্কিন প্রযোজকের সঙ্গে, তাঁর সঙ্গে একটা ছবির আলোচনা অনেক দূর এগোয়। অভিবাসী ভারতীয় একজন লেখিকার ইংরেজিতে লেখা ঢাকা শহরের একটা প্লট, বইটা ছিল নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার একটা উপন্যাস। কিন্তু আমার কিছুতেই ছবির স্ক্রিপ্ট আর নামটা পছন্দ হচ্ছিল না। কোথাও একটা উত্তর-ঔপনিবেশিক ‘লুক ডাউন’ ছিল প্লটটায়।

যতটা না আমাদের ছবি, তার চেয়ে বেশি ‘ওদের চোখে দেখা আমাদের ছবির’ গন্ধ পাচ্ছিলাম! তাই অনেক দিন আলোচনা চললেও আমি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছিলাম। এর পরের বছর আমেরিকান দুই প্রযোজক ঢাকায়ও এসেছিলেন আমাদের স্টুডিওতে, এই নিয়ে আলোচনা করতে। এর আগে ঢাকায় একজন স্বনামধন্য প্রযোজককে ‘না’ বলেছিলাম, মঞ্চের একটা খুব ভালো নাটক নিয়ে আমাকে দিয়ে একটা পিরিয়ড ছবি (একটি নির্দিষ্ট সময়কে ধরে বানানো ছবি) বানাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পিরিয়ড ছবির যে বাজেট, সেই বাজেট ওই প্রযোজকের কাছে পাওয়া যাবে না বলেই ‘না’ করেছিলাম। আমার মনে হয়, যেকোনো স্বাধীন নির্মাতার জন্য সে কোন ছবিটাকে ‘হ্যাঁ’ বলবে আর কোনটাকে ‘না’ বলবে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।আমস্টারডামে হোটেল শিলারের ছাদে ফটোগ্রাফার নাদিন মাসের ক্যামেরায় নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন ও প্রযোজক সারা আফরিন। ছবি: সংগৃহীত
আমস্টারডামে হোটেল শিলারের ছাদে ফটোগ্রাফার নাদিন মাসের ক্যামেরায় নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন ও প্রযোজক সারা আফরিন। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: কিন্তু পশ্চিমা উৎসবগুলোতেও কি এই ‘লুক ডাউন’ থাকে না?

কামার আহমাদ সাইমন: নিশ্চয়ই থাকে। ওদের চেষ্টাই থাকে কীভাবে ওদের ধ্যানধারণা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়। একটা ঘটনা বলি, ২০১৬–র কথা। জানুয়ারিতে ‘অন্যদিন...’ নির্বাচিত হলো লোকার্নোর ‘ওপেন ডোর্স হাবের’ মূল প্রতিযোগিতার জন্য। তখন আয়োজকদের দম্ভভরেই বলতে শুনেছিলাম যে বাংলাদেশ থেকেই নাকি জমা পড়েছিল পাঁচ শতাধিক আবেদন। জানা-অজানা প্রায় কোনো নির্মাতাই নাকি বাদ যাননি। এরপর আগস্টে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দেওয়া হয় ‘অন্যদিন...’কে। লোকার্নোর পিয়াৎজা গ্রান্দায় হাজার হাজার দর্শকের সামনে। বেলা তার, আলেকজান্ডার সুখোরভ, ফাতিহ আকিন, আব্বাস কিয়ারোস্তামির মতো অনেক নামী পরিচালকের বিশ্ব অভিষেকের সাক্ষী এই পিয়াৎজা গ্রান্দা! বিশ্ব চলচ্চিত্র মঞ্চে নবীন একজন নির্মাতার অনুভূতি বোঝানো কঠিন! সঙ্গে ইউরোপের নাক উঁচু কালচারাল চ্যানেল আর্তের ইন্টারন্যাশনাল প্রিক্স ‘অন্যদিন...’–এর জন্য! সব মিলিয়ে চোখে ঘোর লাগানো একটা সময়। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই শুরু হলো অন্য এক আলোচনা। স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে ক্যামেরা, শব্দ—সব জায়গায় ইউরোপীয় কুশলী ব্যবহারের ‘সুযোগ’ নিয়ে কথা বলতে বিশেষ উৎসাহী আমার সম্ভাব্য যৌথ প্রযোজকেরা। ছবির প্রয়োজনে বিশ্বের যেকোনো পেশাদার কুশলীর সুযোগ কাজে লাগাতে আমার কোনো মানা নেই। কিন্তু একদিকে লোকার্নোর স্বীকৃতি, পিয়াৎজা গ্রান্দার সম্মাননা, অন্যদিকে যৌথ প্রযোজনা...সব মিলিয়ে চোখের সামনে এসব ‘সুযোগ’কে যখন আস্তে আস্তে ‘চাপে’

রূপান্তরিত হতে দেখলাম, আমার মধ্যে একরকম প্রতিরোধ কাজ করা শুরু করল। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখলাম, আমার স্ক্রিপ্ট আমার ভাষা, আমার ক্যামেরা আমার চোখ, আমার শব্দ আমার কান, এগুলো বেহাত হলে আমিও বেওয়ারিশ হয়ে যাব। আমার ছবি ‘আমাদের ছবি’ না হয়ে ‘ওদের চোখে দেখা আমাদের ছবি’ হয়ে যাবে, যেটা আমি কিছুতেই চাই না। সেটা এড়াতে আমাকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। মনে আছে, একবার প্যারিসের অন্যতম সংস্কৃতি কেন্দ্র জর্জ পম্পিদ্যু সেন্টারে এক সাংবাদিক ‘শুনতে কি পাও!’ দেখে প্রশ্ন করেছিলেন, আমার চলচ্চিত্র শিক্ষা কোথায়। জানতে চেয়েছিলেন, ছবিতে আমার ‘ফিকশন-ননফিকশন’ চলচ্চিত্র-ভাষার যে প্রয়োগ, সেটা কোনোভাবে ইউরোপীয় সিনেমা ভেরিতে ধারায় প্রভাবিত কি না? উত্তরে বলেছিলাম, শুধু ইউরোপে না, অন্য কোনো স্কুলেই প্রচলিত অর্থে চলচ্চিত্র শিক্ষার ‘সৌভাগ্য’

আমার হয়নি। তবে আমার ওয়ারিশান আমার লালন, আমার সুলতান, তারাশঙ্করের ‘কবি’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, আর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লাল সালু’, যাঁদের সম্পর্কে ইউরোপ একরকম অন্ধকারেই আছে। সেদিন দর্শকসারিতে বসেছিলেন প্যারিসপ্রবাসী অগ্রজ চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, মূকাভিনয়শিল্পী পার্থ প্রতিম মজুমদার, ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতসহ অনেক বাঙালি। তাঁদের মুহুর্মুহু করতালিতে বুঝেছিলাম, ইউরোপীয় জাত্যভিমানের বিপরীতে তাঁদের অবদমিত ক্ষোভ কতটা প্রবল।
প্যারিসের জর্জ পম্পিদ্যু সেন্টারে প্রশ্নোত্তর পর্বে কামার আহমাদ সাইমন। ছবি: সংগৃহীত
প্যারিসের জর্জ পম্পিদ্যু সেন্টারে প্রশ্নোত্তর পর্বে কামার আহমাদ সাইমন। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন: উৎসব নিয়ে তাহলে আপনার ভাবনা কী?

কামার আহমাদ সাইমন: এই বিষয় নিয়ে অনেক দিন ভেবেছি...আমি ছবি কার জন্য বানাই? আমি কেন উৎসবে যাই? কেন দেশে মুক্তি দেওয়ার আগে উৎসবে মুক্তি পায় আমার ছবি? আসলে ছবি নিয়ে একটা ভালো উৎসবে যেতে কার না ভালো লাগে! সোজা কথা, ভালো একটা উৎসবে ছবি গেলে আমি পরের ছবির জন্য ব্যাপক উদ্দীপনা পাই। আর কান-বার্লিন-লোকার্নোর মতো প্রতিষ্ঠিত বড় উৎসবগুলোয় যখন যাই, তখন বিশ্বের আর দশটা কাজের সঙ্গে নিজের কাজকে যাচাই করে দেখতে পারি। যেটা নির্মাতা হিসেবে আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যখন শুধু সিনেমা না...শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, স্থাপত্য, দর্শন—সবখানেই দুনিয়ার আর পাঁচজনের দশটা কাজ জানাবোঝার প্রয়োজন আছে। আমি লালনগীতি পছন্দ করি বলে লাহোরের বুললে শাহর গান শুনব না বা বাংলা আমার ভাষা বলে পাবলো নেরুদা পড়ব না, এমনতো হয় না।

উৎসবের ধারণাটাই কিন্তু এক্সক্লুসিভটি। সারা বছর যে বাজনা হয়তো আপনি নিয়মিত শুনছেন না, উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবে সেই বাজনাই রাতভর শুনছে হাজারো দর্শক, এটাই উৎসব। আমার কাছে চলচ্চিত্র উৎসব হলো আমাদের সেই উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের মতো, যেখানে প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে ছবি দেখার জন্য প্রস্তুতি নিয়েই আসেন দর্শক। তবে চলচ্চিত্র যেহেতু আধুনিকতম শিল্পমাধ্যম এবং পশ্চিমেই এর জন্ম, তাই পশ্চিমা উৎসবগুলোর সঙ্গে পূর্বের উৎসবের একটা পার্থক্য আছে। হয়তো সেটা সাময়িক, কিন্তু সেটা আছে। কলকাতার সঙ্গে কানের তুলনা তাই অবান্তর, বার্লিনের সঙ্গে বুসানের আলোচনাটা বোকামি। এখানে দুনিয়ার আর পাঁচটা বিষয়ের মতো উৎসব-অর্থনীতি, উৎসব-রাজনীতি সবই খুব প্রবল। অনেকেই আলোচনা করেন, কানে গিয়ে বাংলাদেশের একটা প্যাভিলিয়ন দিতে পারলেই আমাদের সিনেমা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। তাদের সবার প্রতি সম্মান রেখেই বলতে চাই যে এটা একটা ভুল চিন্তা। অনেকটা বইমেলার বাইরে মাটির হাঁড়িকুঁড়ির দোকান দেওয়ার মতো।

এর সঙ্গে বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের যেমন কোনো সম্পর্ক নেই, তেমনি কান উৎসবের সঙ্গে এই প্যাভিলিয়নগুলোরও কোনো সম্পর্ক নেই। উৎসব নিয়ে আমাদের সাম্প্রতিক এই অবস্থান, এই অতি উৎসাহ আমাদের সিনেমার জন্য সংকট ও সম্ভাবনা দুই-ই নিয়ে এসেছে। অনেক ভুলভাল নিম্নমানের পাড়াতো উৎসব নিয়েও মাঝেমধ্যে যে উত্তেজনা দেখি, সেটা দর্শকদের মধ্যে উৎসবে যাওয়া ছবি নিয়ে এক ভুল ধারণা তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে কাজের অভিজ্ঞতা আছে—এমন অনেকেই ছবি দেখে এসে মাঝেমধ্যে ফোন করেন। জানতে চান, ‘অমুক বা তমুক ছবিটা যে উৎসবে পুরস্কারপ্রাপ্ত আর্ট-হাউস ছবি বলে প্রচারণা চালানো হলো, সেটা কীভাবে সম্ভব?’ আরও বিব্রত হই যখন নির্মাতারাই কেউ কেউ ‘আমাদের চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার’ গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে উচ্চকিত হন!

তাঁরা হয়তো বুঝতে পারেন না যে এটা একটা উত্তর-ঔপনিবেশিক চাপ, এতে আমাদের নিজেদের হীনম্মন্যতাই প্রকাশ পায়। একরকম ব্যক্তিগত দায় থেকেই তাই ঠিক করেছি, আমার অন্তত একটা ছবি কোনো উৎসবে দেখানোর আগে দেশের দর্শকের কাছে মুক্তি দেব। যেহেতু ‘নীল মুকুট’, ‘অন্যদিন...’ আর ‘শিকলবাহা’র মধ্যে ‘নীল মুকুট’–এর সব কাজ শেষ, তাই ঠিক করেছি, কোনো উৎসবের আগে দেশেই মুক্তি দেব ‘নীল মুকুট’!


প্রশ্ন: ‘নীল মুকুট’কে কেন অপরিকল্পিত সন্তান বলা হচ্ছে?

কামার আহমাদ সাইমন: দেখেন, প্রতিটা ছবির একটা পূর্বপরিকল্পনা থাকে, প্রস্তুতি থাকে...গণমাধ্যমেও থাকে নানান খবরাখবর, যেটা ‘অন্যদিন...’ বা ‘শিকলবাহা’কে নিয়ে আছে। কিন্তু ‘নীল মুকুট’এর ক্ষেত্রে এটা হয়েছে উল্টো। প্লেনে যাচ্ছিলাম, ইউরোপযাত্রায়ই ছিলাম...‘শিকলবাহা’ বা ‘অন্যদিন...’–এর কোনো একটা কাজে। যাত্রার শুরুতেই একটা কান্না আমাকে খুব ভাবিয়েছিল, পুরা যাত্রাটা ভেবেছি কান্নাটা নিয়ে...লম্বা সফরের পুরা সময়টা কাটিয়েছি কয়েকটা সিকোয়েন্স লিখে। তারপর বলতে পারেন, একরকম পরিকল্পনা ছাড়াই সেই সিকোয়েন্স কয়েকটার শুটিং, ‘অন্যদিন...’ বা ‘শিকলবাহা’র ফাঁকে ফাঁকেই...কিন্তু সম্পাদনার টেবিলে গিয়ে যেটা ঘটল সেটা হলো, শুটিং ফুটেজের সঙ্গে প্রথম দেখাতেই প্রেম! তারপর বছরজুড়ে অন্য দুই কাজের ফাঁকে ফাঁকে সেই ছবির সঙ্গে সহবাস এবং অতঃপর অপরিকল্পিত ছবির জন্ম! নাম তার ‘নীল মুকুট’।

প্রশ্ন: কাদের জন্য বানানো হলো ‘নীল মুকুট? এটা কি ফিকশন, নাকি ননফিকশন?

কামার আহমাদ সাইমন: সোজা বাংলায় আমি সিনেমা বানিয়েছি। ভোক্তা-বাজার মাথায় নিয়ে যদি ছবি বানাই, তাহলে সেটা কিন্তু একরকম ভোক্তাপণ্যই হবে। ছবি বানানোর সময় তাই আমি কোনো ভোক্তা বা শ্রেণি মাথায় নিয়ে বানাই না। একান্ত নিজের ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে, এই সময়ে, এই সমাজের একজন নির্মাতা হিসেবে বানানো ‘নীল মুকুট’। কিন্তু বানানোর পর মনে হয়েছে যাঁরা ‘শুনতে কি পাও!’ দেখে তৃপ্তি পেয়েছিলেন, তাঁদের মতো দর্শকদের জন্যই ছবিটা। যাঁরা ছবি দেখতে গিয়ে নায়ক-নায়িকা বা প্রচলিত অর্থে প্রেমের গল্প খোঁজেন, ছবিটা তাঁদের জন্য না। কিন্তু যাঁরা মানবপ্রেম-প্রকৃতি-রস আস্বাদন করতে চান, যাঁরা ‘সহজ মানুষ’–এর খোঁজে থাকেন, এটা তাঁদের ছবি।

আমি একটা চলচ্চিত্র–ভাষা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি, যেখানে সিনেমার প্রয়োজনে টেকনিক হিসেবে যেকোনো মিথ্যা বা সত্যকে নিজের আয়ত্তে ব্যবহার করার লোভটা আমি কিছুতেই ছাড়তে চাই না। যেটা আমি ‘শুনতে কি পাও!’তে ব্যাপকভাবে করেছি, কমবেশি ‘অন্যদিন...’ বা ‘শিকলবাহা’তেও করছি। আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘কোকার ট্রিলজি’তে যেটা তাঁর ভঙ্গি। কিয়ারোস্তামির ভাষায়, ‘একটা বড় সত্যকে সামনে নিয়ে আসার জন্য, সিনেমা হলো একগুচ্ছ মিথ্যা’। ২০১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল বেলারুশ সিভিতলানা এলেক্সেভিচকে, যাঁর কাজের মূল ভঙ্গি ছিল ননফিকশন। সাম্প্রতিক সময়ে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের আলোচিত উপন্যাস ‘একজন কমলালেবু’র ভঙ্গিও কিন্তু ননফিকশন। তাই আমি চাই, ‘নীল মুকুট’ কি ‘ননফিকশন’ নাকি ‘ফিকশন’ নাকি ‘সিনেমা’, সেটা ছবি দেখার পর দর্শকই ঠিক করুক।


প্রশ্ন: ‘অন্যদিন...’ আর ‘শিকলবাহা’র কাজ কীভাবে এগোচ্ছে, কত দূর?

কামার আহমাদ সাইমন: ‘শিকলবাহা’র শুটিং শেষ করেছিমাত্র। ‘অন্যদিন...’–এর কাজ ‘শিকলবাহা’র চেয়ে অনেক এগিয়ে। ২০১৬–তে দুটি ছবিকে লা লোকার্নো নিল। একটা ছিল জ্যঁ লুক গদারের কান উৎসবে পুরস্কারজয়ী ছবি ‘দ্য ইমেজ বুক’, আরেকটা আমার ‘অন্যদিন...’। কিন্তু এগুলো যতই প্রণোদনা দিক না কেন, এর মধ্যে একরকম আত্মতৃপ্তিতে ভোগার ঝুঁকি আছে। দেশে ফিরে তাই আবার ডুব দিলাম ‘অন্যদিন...’–এর শুটিংয়ে। পকেটে তখন অনুদানের প্রথম কিস্তি, মাত্র ১৫ লাখ টাকা। এই রকম একটা সময় বার্লিন থেকে এল সুখবর,

‘শিকলবাহা’কে ওরা নির্বাচিত করেছে ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ডের জন্য। কিন্তু শর্ত, ছবি শেষ করতে হবে দুই বছরের মধ্যে। যেটা আমার পক্ষে মানা অসম্ভব। কারণ, আমার মনে হয় ভোক্তাপণ্য হিসেবে বানানো সিনেমা ছাড়া কোনো সিনেমাই এক্সক্লুসিভলি তিন বছরের নিচে বানানো সম্ভব না। এক বছর পর দ্বিতীয়বার ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ডের জন্য ‘শিকলবাহা’র নাম ঘোষণা করে বার্লিনালে। তারপর অনুদান আর বার্লিনালের এই টাকা দিয়ে মূল শুটিংয়ের কাজটা এই বছরই শেষ করেছি।

প্রশ্ন: কবে দেশের মানুষ ‘নীল মুকুট’ ছবিটি দেখতে পারবে?

কামার আহমাদ সাইমন: খুব শিগগির সেন্সরে পাঠানোর পরিকল্পনা আছে।


প্রশ্ন: গত ১০ বছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কী পরিবর্তন দেখলেন?

কামার আহমাদ সাইমন: নির্মাতা হিসেবে আমার চলচ্চিত্রযাত্রা ২০১২ সাল থেকে, মূলত তারেক মাসুদের চলে যাওয়ার পর থেকে। সেই থেকে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করেছি। প্রথমত, ঢাকার ভোক্তা-চলচ্চিত্রের বাজার অনলাইনে চলে গেছে। দ্বিতীয়ত, সিনেমার বাইরেও হাজারটা অনলাইন কনটেন্ট, যেমন ইউটিউব চ্যানেল থেকে টিকটক ভিডিও, ফেসবুক লাইভ মানুষের অডিও-ভিজ্যুয়াল আমোদের এনতার আয়োজন চারপাশে। সংস্কৃতি কারখানার উৎপাদক আর ভোক্তা দুটিই সাধারণ্যে, একাকার। গণমানুষের বিনোদনের সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে খুব দ্রুত! তৃতীয়ত, ভালো ছবির অভাব, সিনেমা হলের পরিবেশ, যানজট, মোবাইল-ইন্টারনেটের বিস্তার, বিশ্বায়নের হাত ধরে আমাদের মগজের সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়ন, যার ফলে

মুম্বাই-তামিল রিমেকেও ধস। এত সবকিছুর পরও যখন কোনো দর্শক ছবি দেখতে যাচ্ছে, তখন সে সিনেমা হলের সামষ্টিক উপলব্ধির বাইরে ছোট পর্দায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দিকেই ঝুঁকছে বেশি। যেভাবে এগোচ্ছে, মনে হচ্ছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশি দু–একটা প্ল্যাটফর্মই এককভাবে ভোক্তা-চলচ্চিত্রের বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। যেখানে নামকাওয়াস্তে এক-দুটি দেশি ছাড়া বাকি সিংহভাগ বিদেশি ছবিই চলবে। তবে কলকাতার নির্মাতাদের মধ্যে ইদানীং একটা চেষ্টা লক্ষণীয়। গত কয়েক বছর তাঁরা হলিউড-বলিউড-তামিল রিমেকের বাইরে নিজেদের গল্প বলার একটা বাজারি কায়দা খুঁজছেন। সেটার মূল ভিত্তি যেহেতু কলকাতার মধ্যবিত্ত দর্শক–চাহিদা, তাই আন্তর্জাতিক উৎসব নিয়ে তাঁদের তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। এখন দেখার বিষয় তাঁদের এই চেষ্টা আসলেও কোথাও গিয়ে দাঁড়ায় কি না।

আর যদি দাঁড়ায়ও, ঢাকার নির্মাতাদের সেটা কতটুকু প্রভাবিত করে বা আদৌ কোনোভাবে করে কিনা...সেটা একমাত্র সময়েই বলা যাবে। এদিকে ঢাকার আর্ট-হাউস সিনেমার অবস্থাও কিন্তু বেহাল। হাতের মোবাইল থেকে ট্রাফিক সিগন্যালের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, সব জায়গায় অডিও-ভিজ্যুয়াল বোমাবর্ষণ। আমাদের মন-মগজ আর চোখ-কানের বারোটা বেজে গেছে। সামাজিক মাধ্যমগুলোয় চলা নিরন্তর অসম্পাদিত বাহাস, সব মিলিয়ে ইন্টেলেকচুয়াল বিনোদনের ফরম্যাট পুরোপুরিই চ্যালেঞ্জড। তার ওপর আমরা যারা পোস্ট-৭১ জেনারেশন ছবি বানানোর চেষ্টা করছি, তারা অনেকটাই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। এটা আমাদের আগের প্রজন্মে হয়নি। তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল, মোর্শেদুল ইসলাম, আবু সাইয়ীদ, গোলাম রব্বানী বিপ্লব, জাহিদুর রহিম অঞ্জন—এঁরা সবাই কিন্তু চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ফসল।

সময়ের সঙ্গে তাঁদের নিজেদের একটা রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছিল, যার প্রকাশ ঘটেছে তাঁদের চলচ্চিত্রে। খোঁজ নিলে দেখবেন, আশির দশকের যুগপৎ কবিতা উৎসব আর শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। দুটিরই প্রেক্ষাপটে ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলন। অন্যদিকে, স্বাধীন নির্মাতাদের এখন সবচেয়ে বড় সংকট—কীভাবে, কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর মুনাফা বা স্বার্থ রক্ষার দায় না নিয়ে ছবি বানাবেন। সেই অর্থে এখন প্রায় কোনো নির্মাতাই আর স্বাধীন নন। এমনকি উৎসবমুখী যে নতুন প্রজন্মও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার আগে উৎসব নিয়ে ভাবে, ভাবে কী বানালে উৎসবগুলা খাবে!

রাজনৈতিকভাবে অসচেতন আমাদের এই কলোনাইজড মগজ এই মুহূর্তে ঢাকার আর্ট-হাউস চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সবচেয়ে বড় সংকট। তবে এই হেজিমনির বাইরে একদম আনকোরা একটা প্রজন্মকে তৈরি হতে দেখছি। চলচ্চিত্র নিয়ে যারা শুধু উৎসাহীই না, এই নিয়ে রীতিমতো পড়াশোনা করছে দেশে-বিদেশে। সেই নতুনের জন্য আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে, তবে খুব বেশি দিন মনে হয় না।


সাক্ষাৎকার এর সর্বশেষ খবর

সাক্ষাৎকার - এর সব খবর