ঢাকা, বুধবার, ২২ জানুয়ারি ২০২০, ৯ মাঘ ১৪২৬

দহনের দিনে ‘গহীনের গান’

২০১৯ ডিসেম্বর ১৫ ১১:৪০:০৫
দহনের দিনে ‘গহীনের গান’

‘অন্দরমহল’, ‘মানবজনম’, ‘নিঃসঙ্গ নক্ষত্র’ বা ‘নির্বাসন’–এর মতো ‘গহীনের গান’ও সাদাত হোসাইনের বইয়ের নাম। তবে এই বই পড়ার বই না, এই বই বড় পর্দায় দেখার বই, শোনার বই। এই ‘বই’ একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য মিউজিক্যাল সিনেমা। তবে এই সিনেমা

আবার সেই সিনেমা নয়, যেখানে নায়ক পিটিয়ে তক্তা বানাবেন ভিলেনদের আর নায়িকা সুইজারল্যান্ডের টিউলিপবাগানে শিফনের শাড়ি পরে নাচবেন। সেসবের কিছুই নেই এই সিনেমায়। তবে? যে প্রথমগুলো ‘গহীনের গানে’–এর সাক্ষী ‘সাম পিপল ফিল দ্য রেইন, আদারস জাস্ট গেট ওয়েট’। মুষলধারে বৃষ্টি ঝরে। কিছু মানুষের হৃদয় আর্দ্র হয়, আর কিছু মানুষ শুধুই ভিজে যায়। বব মার্লে বড্ড হৃদয়বান মানুষ ছিলেন। তাঁর বিশাল হৃদয় স্পর্শ করেছে সাদাত হোসাইনকেও। তাই জীবনের প্রথম ছবিতে তিনি বলেছেন, গানই জীবন, জীবন গল্প, তাই গল্পই গান। জানা আর বোঝা এক কথা নয়। প্রয়োজন আর প্রিয়জন আলাদা।

সাদাত হোসাইনের কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনায় তৈরি হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য মিউজিক্যাল চলচ্চিত্র ‘গহীনের গান’। দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর অভিনয় করেছেন এই চলচ্চিত্রে। ছোট পর্দার অভিনয়শিল্পী তুলনা আল হারুনের প্রথম চলচ্চিত্র। চিত্রগ্রাহক বিদ্রোহী দীপনের প্রথম কাজ। লিয়ন রোজারিওর প্রথম সম্পাদনা। আর বাংলা ঢোল প্রতিষ্ঠানটির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রযোজনা। এত প্রথমকে সঙ্গী করে যাত্রা শুরু হলো, ভয় করছে?

সাদাত হোসাইন অকপটে জানিয়েছেন, তাঁর ভয় করছে। ২০ ডিসেম্বর যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের দিনের মতোই ভয় করছে। লেখক যেভাবে নির্মাতা হলেন সে অনেককাল আগের কথা। সাদাত হোসাইন তখন লেখক বা নির্মাতা কিছুই হননি। তিনি তখন মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার কয়ারিয়া গ্রামের কেবলই এক বালক, যে বালক বৃহস্পতিবারে অবস্থাসম্পন্ন প্রতিবেশীর সদ্য কেনা সাদাকালো টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখে ‘উচ্ছন্নে’ যেতে চায়। কিন্তু সে জন্য তো কর্তার কথামতো সুপারিগাছ থেকে সুপারি পাড়তে হবে। শীর্ণ শরীরে অনেক চেষ্টার পর কেবল হাত–পা ছিলে গেল। গাছের সুপারি গাছেই রইল। সেদিন বেড়ার ওপাশ থেকে ১১ বছরের সেই বালক কেবল শুনেছিলেন।

আর চোখ বন্ধ করে সবটা কল্পনা করে নিয়েছিলেন। তারপর থেকে যখনই সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করেছে, মনের দরজা–জানালা খুলে দিয়েছেন। কল্পনায় দেখতে পেয়েছেন সবটাই। এই ঘটনার দুই দশক পর যখন সেই ছেলেটা নিজের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বোধ’ (২০১৩) বানালেন, তখন সেখানে কোনো কথা ছিল না, ছিল কেবল দৃশ্য। তিনি আরেকটা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানালেন, ‘দ্য সুজ’ (২০১৬)। তারপর তিনি বানালেন প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য লিজেন্ড সৈয়দ আব্দুল হাদী’। সেই ছবি দেখে দর্শকসারিতে বসা সাবিনা ইয়াসমীন নির্মাতা সাদাত হোসাইনকে খুঁজে বের করে জড়িয়ে ধরলেন। এর আগেও ছবি তুলে, ছবি বানিয়ে নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন সাদাত হোসাইন।

কিন্তু সেই মুহূর্তে, সেই প্রথম তাঁর মনে হয়েছিল, পারবেন তিনি। বই লেখা আর ‘বই’ বানানোর তফাত কোথায়? বাংলাদেশে এই মুহূর্তে তরুণদের ‘ক্রেজ’ লেখক সাদাত হোসাইন। বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায় তাঁর অটোগ্রাফের জন্য শত মানুষের দীর্ঘ লাইন হয়। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে তাঁর কথা শোনার জন্য নয় দিন আগে সব টিকিট ‘সোল্ড আউট’ হয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার হাতেও তাঁর পা থাকে মাটিতেই। সেই বই লেখক যখন ‘বই’ (চলচ্চিত্র) বানান, তখন কী হয়?

উত্তরে সাদাত হোসাইন বলেন, ‘বই লেখার সময় আমি আমার কল্পনার জগৎকে কলমের ডগায় এনে সীমাহীন স্বাধীনতা দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু সিনেমা নির্মাণের সময় মনে হয়, ঢাকা শহরের যানজটে আমি একটা বেঙ্গল টাইগারকে কীভাবে হাঁটাব? আমাকে তো কল্পনাকে অ্যারেঞ্জ করতে হবে। তাই কল্পনার লাগাম টেনে ধরতেই হয়।’ ‘গহীনের গান’–এর জন্মের কিছু কথা এই ছবির জন্য লেখক হয়েছেন নির্মাতা, গায়ক হয়েছেন নায়ক। আছে নয়টি গান। যে গানগুলো সাতটা মানুষের জীবনের সঙ্গে জুড়ে হিজল, জারুল আর সোনালু ফুলের মালা বানিয়েছেন সাদাত হোসাইন আর তাঁর পুরো দল। উল্লেখ্য, এগুলো কিন্তু এই ‘লেখক কাম নির্মাতা’র প্রিয় ফুল। সাধারণত গল্পের প্রয়োজনে গানের আবির্ভাব ঘটে। আর এখানে ঘটনা উল্টো।

গানের প্রয়োজনে শব্দমালা বুনে বুনে ডালপালা মেলে হয়েছে গল্প। ২০১৭ সাল থেকে চলছে এই ছবি নির্মাণের প্রক্রিয়া। তারপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শুটিংয়ের মাঝে ‘না বলা অতিথি’ হয়ে এল ঘূর্ণিঝড় তিতলি। গেল সব ভন্ডুল হয়ে। দেশের কিংবদন্তি অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম তো প্রথমে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে মুখের ওপর ‘না’ বলে দেন। তারপর চিত্রনাট্য পড়ে জানান, কাজটা করবেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, সবটা পড়ে কিছু সংশোধনও করালেন। সরিষার তেল মেখে বৃষ্টিতে ভিজে অভিনয় করতে গিয়ে ৮৪ বছর বয়সী এই অভিনেতা রীতিমতো ‘নীল’ হয়ে যান।

ওই একাকী বৃদ্ধের সংকট বুঝেছিল একটা একাকী গান, ‘ও বাবা আমার হাতটা একটু ধর, বুড়ো মানুষ গায়ে ভীষণ জ্বর’। কী আছে ‘গহীনের গান’–এ? না, মারমার কাটকাট অ্যাকশন নেই। নেই তথাকথিত নায়ক কিংবা নায়িকা। নায়কের এক ঘুষিতে ধুলো উড়িয়ে দশটা গাড়ি উড়ে যাওয়া তো দূরের কথা, একটা সাইকেলও উল্টে পড়ে না। নেই রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। তবে কী আছে? আছে জীবনের গল্প। আছে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা। আছে শিল্পসত্তা আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংঘাত আর অন্তর্দ্বন্দ্ব। আছে একাকিত্বের যন্ত্রণার গগনবিদীর্ণ নিঃশব্দ চিৎকার। আছে সম্পর্কের অলিগলি খোঁজা কিছু একান্ত মুহূর্ত। যে অনুভূতি সময়ের অভাবে অব্যক্তই থেকে গেছে, বলা হয়েছে সেসব কথাও। আছে নয়টি গান। পরিচালকের দাবি, গানগুলো স্পর্শ করবে দর্শকদের।

সংলাপগুলো বুকের খুব গভীরে কোনো একটা কোণে পৌঁছে ‘মানে’ তৈরি করে নেবে। দর্শক হল থেকে বেরিয়ে হইহইয়ের ভেতর হয়তো ভুলে যাবেন অনেক কিছু। তবে নির্জন কোনো দিনে, খুব একাকী বিকেলে যখন জানালা দিয়ে ঝুম বৃষ্টি নামবে, সেদিন চায়ের কাপ হাতে আবার মনে পড়ে যাবে সবকিছু। এই ছবিতে মূল সাতটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন সৈয়দ হাসান ইমাম, আসিফ আকবর, তমা মির্জা, তানজিকা আমিন, আমান রেজা, কাজী আসিফ রহমান, তুলনা আল হারুন। আরও আছে শিশুশিল্পী আরশ ও মুগ্ধতা।

সংগীত পরিচালনা করেছেন তরুণ মুন্সী ও অনেকে। সাদাত হোসাইনের মতে, এই সিনেমা কেবল সিনেমা নয়, এই সিনেমা প্রবল দহনের দিনে বুকের গহীনের গান। ২০ ডিসেম্বর মুক্তি পাবে সাদাত হোসাইনের নতুন ‘বই’, আসিফ আকবরের নতুন গান, আর সৈয়দ হাসান ইমামসহ পুরো দলের নতুন ছবি ‘গহীনের গান’। আর দর্শকের রায় জানিয়ে দেবে, এই পরীক্ষায় তাঁরা সবাই মিলে পাস করতে পারলেন কি?


সঙ্গীত এর সর্বশেষ খবর

সঙ্গীত - এর সব খবর