ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

টিভি নাটকে একাত্তর

২০১৯ ডিসেম্বর ১২ ১৪:২৪:৩৬
টিভি নাটকে একাত্তর

মুক্তিযুদ্ধের নাটক নিয়ে এ সময়ের ধারণাটা একটু অন্য রকমভাবে ভাবার সময় এসেছে বৈকি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবার ভেতরে এমনভাবে প্রথিত আছে সেই '৭১-পূর্ব এবং পরের প্রজন্ম সবার জন্য। আমরা কেউ নিজেদের জন্মক্ষণ দেখিনি, তাই বলে কি আন্দোলিত করে না সেই সময়টা

আমাদের? ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, চাইলেও তো আর কেউ নিজের জন্ম ইতিহাস ভুলতে পারে না। যদিও আজকাল আমাদের টেলিভিশন বাক্সটা বছরে একবার জন্মদিন পালনের মতো করেই মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করতে পারলে খুশি হয়। যেমনটা রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের মতো। এ ক্ষেত্রে অবশ্য বছরে বেশ কয়েকবারই আমাদের স্বাধীনতার কথা নিয়ে কাজ করতে হয়। কিন্তু এই স্বাধীনতার গল্পগুলো মাত্র কয়েকটা দিন আর স্লোগান যুদ্ধে সীমাবদ্ধ করে নাটক করার দিন বদলানোর সময় হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে আরও গভীরে কাজ করার আছে।

যেমন তখনকার প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল মুক্তিযুদ্ধ, তেমনি এখনও কি আমাদের জীবন থেকে একটা দিনের জন্য সরিয়ে রাখা সম্ভব এই অধ্যায়? বাজেট-স্বল্পতার এই দুর্দিনে যুদ্ধের শুটিং করতে গিয়ে একটা রেপ্লিকা দৃশ্য তৈরি করে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ আছে কি? সত্যি কথা বলতে, ১৯৭১ দেখাতে গেলে জানতে হয় আরও আগে থেকে।

সেই দেশভাগ, '৫২-এর ভাষা আন্দোলন, '৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান সবকিছু নিয়েই তো স্বাধীন দেশের জন্য সোচ্চার হয়েছিল বাঙালি। তবে কেন নাটক করার জন্য শুধু যুদ্ধের অংশটুকু ধরতে হবে? তাছাড়া যা যা ঘটেছিল, সেটা জানার জন্য ইন্টারনেটের একটা বাটন কি এখন যথেষ্ট নয়? আর এই প্রজন্ম তাদের স্বপ্নও যেন দেখে পরাবাস্তব এক পৃথিবীর সঙ্গে মিলিয়ে। তাদের কাছে এই তথ্য-উপাত্তগুলো খুব দূরের নয়। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমাদের বারবার করে তাদের মনে করিয়ে দিতে হয়েছে নিজের ইতিহাসকে জেনে নিতে। সে দায় তাদের ওপর দিই কী করে?

একটা দীর্ঘ বন্ধ্যত্ব সময় যে আমরা পার করে এসেছি ১৯৭৫ সালের পর। তাহলে একটা অনুর্বর সময় পার করে আসা এই প্রজন্ম কী ভাবছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে, সেটাও তো নাটকে আসার কথা। বর্তমান পৃথিবীতে বাংলাদেশের ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ যেখানে স্বীকৃত, সেখানে বরং আমাদের নাটকে থাকা উচিত কিছু মনস্তাত্ত্বিক গল্প। মুক্তিযুদ্ধ থেকে দূরে সরিয়ে ফেলার গল্প অথবা যে গল্প এত দিন বলতে দেওয়া হয়নি, সেই গল্প।

'৭১ সালে বন্দুক নিয়ে যুদ্ধের সঙ্গে রয়েছিল আরও কিছু মানবিক যুদ্ধ। যে যুদ্ধটা বাইরে থেকে দেখা যায়নি, অথচ রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে অন্তর্গত জগতে। আজ প্রায় ৫০ বছর পরও রয়ে গেছে সেই ক্ষতের দাগ। এখন সময় এসেছে তাদের সেই ক্ষত মুছে দেওয়ার। আর কিছু না হোক, একটা কি দুটি নাটক দেখে যদি এতটুকুও মনে হয় তার ভেতরের কান্নাটা খুঁজে পাচ্ছে, তবে ক্ষতি কি আছে?

তবে এ ক্ষেত্রে নাটকের জন্য দরকার খুব ভালো পাণ্ডুলিপি, যেটা আজকাল টেলিভিশন নাটকের জন্য অপ্রয়োজনীয় করে ফেলা হচ্ছে। কখনও-সখনও বড় বাজেটের চেয়ে গভীর থেকে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব করে কাজ করাটা জরুরি। নয়তো হালের এক দিন কি বড়জোর দু'দিনে নাটক তৈরির যে প্রতিযোগিতা চলছে, সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের নাটককে বাদ রেখে দর্শকের উপকার করা উচিত।

তাই বলে একেবারেই যে ভালো কিছু নাটক হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। তাহলে থাকুক না টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের নাটক অল্প কিছু মাত্র। ঈদের নাটকের মতো সংখ্যার প্রতিযোগিতায় না হয় আমরা মুক্তিযুদ্ধটাকে রাখলাম না।


নাটক এর সর্বশেষ খবর

নাটক - এর সব খবর