ঢাকা, রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

‘জীবিকার প্রয়োজনে সারা জীবন ভাঁড়ামিই করে গেলাম’

২০১৯ নভেম্বর ১৩ ২২:০০:০৯
‘জীবিকার প্রয়োজনে সারা জীবন ভাঁড়ামিই করে গেলাম’

কেমন আছেন? জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘বেঁচে আছি’। আপনি ২০১৭ সালে চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন। অভিনন্দন। কেমন লাগছে? এবার আবেগপ্রবণ হলেন প্রবীণ অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান। কান্নায় কণ্ঠ জড়িয়ে এল।

তবে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, ‘আমি তো এই পুরস্কারের যোগ্য না। নিজেরই লজ্জা লাগবে এই পুরস্কার নিতে।’ কেন যোগ্য নন আপনি? আপনি সারা জীবন আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য অবদান রেখেছেন। এবার আরও আবেগজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি যা করেছি এটা হিসাবের মধ্যে পড়ে না।

আমি তো সারা জীবন ভাঁড়ামিই করে গেলাম। অভাব ছিল। অভিনয় করে পেট চালাতে হয়েছে। এ জন্য মনের মতো চরিত্রে অভিনয় করতে পারিনি। বড় লোকের ছেলে হলে আমি আমার মনের মতো অভিনয় করতে পারতাম। কিন্তু সেটা পারিনি। ভাঁড়ামিটাই করে গেছি।’ আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু টাকার জন্যই অভিনয় করে গেছি।

এতে সৃষ্টিশীলতা ছিল না, মাথায় সব সময় খাওয়া–পরার চিন্তা ছিল। যদি আরেক জনম পেতাম তাহলে আবারও অভিনয় জগতে আসতাম। সে জীবনে পেটের চিন্তা করতে হতো না, নিজেকে উজাড় করে মনের মতো চরিত্রে অভিনয় করতাম।’ তাঁর পুরো নাম আবু তোরাব মোহাম্মদ শামসুজ্জামান।

তিনি একজন কাহিনিকার, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং অভিনেতা। এক সাক্ষাৎকারে এ টি এম শামসুজ্জামান তাঁর অভিনীত ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘বিষবৃক্ষ’, ‘বিরহ ব্যথা’ চলচ্চিত্রগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি সব সময় চেয়েছিলাম এমন সাহিত্যনির্ভর গল্পের চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে।

দুয়েকটি করেছি বটে, তবে তেমন বেশি চলচ্চিত্র পাইনি। দর্শক শুধু আমার ভাঁড়ামিই দেখে গেছে।’ এ টি এম শামসুজ্জামান বর্তমান পরিচালকদের সাহিত্যনির্ভর গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এ বছরের ২৬ এপ্রিল রাতে বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এ টি এম শামসুজ্জামান। সেদিন খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। সে রাতে তাঁকে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ টি এম শামসুজ্জামানের অন্ত্রে প্যাঁচ লেগেছিল। সেখান থেকে আন্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা।

এর ফলে খাবার, তরল, পাকস্থলীর অ্যাসিড বা গ্যাস বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং অন্ত্রের ওপর চাপ বেড়ে যায়। যার ফলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। এসব সারাতেই অস্ত্রোপচার করা হয়। সেখান থেকে কিছু জটিলতা হয়েছিল। টানা ৫০ দিন গেন্ডারিয়ার আজগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ১৫ জুন তাঁকে শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়।

বেশ কিছুদিন হাসপাতালের একটি কেবিনে ছিলেন। অবস্থার আরও উন্নতি হলে তাঁকে নেওয়া হয় রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায়। এ টি এম শামসুজ্জামানের স্ত্রী রুনী জামান প্রথম আলোকে জানান, পুরান ঢাকার বাসাটি কিছুটা সংস্কার প্রয়োজন। সেখানে রোগী থাকার মতো অবকাঠামোগত সুবিধা নেই। একটু ভালো পরিবেশ এবং হাসপাতালে আনা–নেওয়ার সুবিধার্থে এ টি এম শামসুজ্জামানকে বসুন্ধরার বাসায় নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কলকাতা গিয়েও চোখের চিকিৎসা করার কথা ছিল।

কিন্তু শরীরের অবস্থা ভালো না, তাই আপাতত কলকাতায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই ঢাকাতেই চোখের চিকিৎসা করতে হচ্ছে। রাজধানীর বসুন্ধরায় অবস্থিত আই হসপিটালের চিকিৎসক সালেহ আহমেদকে দেখানো হয়েছে। ৬ অক্টোবর এ টি এম শামসুজ্জামানের চোখে অপারেশন করা হয়। এখন স্বাভাবিক আছে চোখের অবস্থা। আপাতত স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়া করছেন।

চলাফেরাও স্বাভাবিক। শুধু দীর্ঘ সময় বসে থাকলে ওঠার সময় একটু সমস্যা হয়। তবে নিজে নিজেই চেষ্টা করেন। হাঁটাচলাও স্বাভাবিক। ৪ নভেম্বর দীর্ঘদিন পর শুটিংয়ে অংশ নিয়েছেন। ইত্যাদির একটি দৃশ্যে অংশ নেওয়ার জন্য অনুষ্ঠানটির পরিচালক হানিফ সংকেত নিজের উদ্যোগে শুটিং স্পটে নিয়ে গেছেন। কথা প্রসঙ্গে এ টি এম শামসুজ্জামান জানালেন প্রথম জীবনে তিনি হতে চেয়েছিলেন সাহিত্যিক। স্মৃতিচারণা করে তিনি জানান, স্কুল ম্যাগাজিনে লেখার উদ্দেশ্যে ‘অবহেলা’ শিরোনামে একটি ছোটগল্প ছাপা হয়েছিল।

গল্পটি পড়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে প্রশংসা করেছিলেন। রণেশ দাশগুপ্ত তাঁকে বিভিন্ন সময়ে লেখার ব্যাপারে পরামর্শদাতা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। সে সময়ের বিখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত প্রমুখের অনুপ্রেরণায় তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এসেছেন।

তিনি জানালেন সরাসরি শিক্ষক হিসেবে তিনি শওকত আলী, অজিত কুমার গুহর সান্নিধ্য পেয়েছেন। আজীবন জাতীয় পুরস্কারের জন্য নিজেকে যোগ্য মনে না করলেও এ বছর জাতীয় পুরস্কার ঘোষণার আগে তাঁর নামটিই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনে তাঁর সম্মাননার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ২০১৭ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননায় এ টি এম শামসুজ্জামান এবং অভিনেত্রী সালমা বেগম সুজাতার নাম ঘোষণা করা হয় তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে।

প্রজ্ঞাপন জারির পর চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রচার পায়, যোগ্য ব্যক্তির কাছেই যাচ্ছে ২০১৭ সালের আজীবন সম্মাননা। পর্দায় খল অভিনেতা বা চরিত্রাভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পেলেও বর্ষীয়ান শিল্পী এ টি এম শামসুজ্জামানের নানাবিধ পরিচয়।

সহকারী পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করে লেখক হিসেবে সুনাম অর্জন শেষে অভিনয়ে থিতু হন এ টি এম শামসুজ্জামান, চলচ্চিত্র নির্মাণকাজেও নিজেকে যুক্ত করেছেন বছর কয়েক আগে। ১৯৬১ সালে উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান এ টি এম শামসুজ্জামান। ১৯৬৫ সালে প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লিখেন। সে সময় এ টি এম শামসুজ্জামান বরেণ্য পরিচালক খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, সুভাষ দত্ত প্রমুখের সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করেন।

১৯৬৫ সাল থেকে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। প্রথম অভিনীত ছবি ‘ন্যায়ী জিন্দেগী’ যা শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। এ সময় তিনি ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করতেন। ১৯৭৪ সালে তিনি আমজাদ হোসেন পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘নয়নমণি’তে অভিনয়ের সুযোগ পান।

মন্দলোকের চরিত্রে অভিনয় করে এ টি এম শামসুজ্জামান তাঁর অভিনয় জীবনের টার্নিং পয়েন্টে পৌঁছে যান, ছবিটিও দর্শকপ্রিয়তা পায়। ফলে পরিচালকেরাও তাঁকে একের পর এক খলনায়ক চরিত্রে নিতে থাকেন। খল চরিত্রে তাঁর অভিনীত আরও কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো ‘অশিক্ষিত’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘স্বপ্নের নায়ক’ ইত্যাদি।

একসময় নিজেকে ভাঙেন এ টি এম শামসুজ্জামান। নেতিবাচক চরিত্রের পাশাপাশি কৌতুক অভিনেতা হিসেবেও অভিনয় করতে শুরু করেন। এখানেও সফল হন। কৌতুক অভিনেতা হিসেবে ‘যাদুর বাঁশি’, ‘রামের সুমতি’, ‘ম্যাডাম ফুলি’, ‘ভণ্ড’, ‘চুড়িওয়ালা’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করে খ্যাতি পান। এ ছাড়া ‘অনন্ত প্রেম’, ‘দোলনা’, ‘অচেনা’, ‘মোল্লা বাড়ির বউ’, ‘হাজার বছর ধরে’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রে তিনি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হন।

তাঁর অভিনীত এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ‘আলফা’ ছবিটি দেশ–বিদেশে প্রশংসিত হয়। এ টি এম শামসুজ্জামান ২০০৯ সালে প্রথম পরিচালনা করেন শাবনূর-রিয়াজ জুটিকে নিয়ে ‘এবাদত’ নামের ছবিটি। তাঁর পরিচালনার প্রথম ছবি ‘এবাদত’ একই সালে মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি অসংখ্য নাটকেও অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৬৩ সালে টিভি নাটকে তাঁর শুরু। প্রথম নাটক বিশিষ্ট টিভিব্যক্তিত্ব ও নাট্যকার আশকার ইবনে শাইখ পরিচালিত ‘লাঠিয়াল বাহিনী’।

তাঁর অভিনীত অন্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রঙের মানুষ’, ‘ভবের হাট’, ‘ঘর কুটুম’, ‘বউ চুরি’, ‘নোয়াশাল’ ইত্যাদি। পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক।

তবে এ পর্যন্ত শতাধিক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার এবং তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান আজও তাঁর শ্রেষ্ঠ অভিনয়টি করতে পারেননি বলে মনে করেন। তিনি এমন অভিনয় করে যেতে চান, যার জন্য বাংলাদেশের দর্শক তাঁকে সারা জীবন মনে রাখবে। তাঁর আশা, পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার অভিনয় জগতে ফিরবেন। মনের মতো চরিত্রে অভিনয় করবেন। আজীবন সম্মাননা পাওয়া তখনই সার্থক। এমনটাই ভাবনা, বর্ষীয়ান এই অভিনেতার।


নাটক এর সর্বশেষ খবর

নাটক - এর সব খবর