ঢাকা, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

‘তবলা ছাড়া গান’যেমন বর্তমান বাংলাদেশ দলও তেমন

২০১৯ নভেম্বর ১৩ ১৪:৫৪:১২
‘তবলা ছাড়া গান’যেমন বর্তমান বাংলাদেশ দলও তেমন

অবাক করা সত্য, ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের মতো তার টেস্ট পরিসংখ্যানও আহামরি নয়। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে ৬ ম্যাচে মাত্র ৬২ রান, সর্বোচ্চ ২২। আর বল হাতে উইকেট মাত্র ৪টি, সেরা বোলিং ১/১৫। টেস্ট ক্রিকেটে ৬ ম্যাচের ১০ ইনিংসে রান মাত্র ২৬০। সেঞ্চুরি নেই, সর্বোচ্চ ৮২, হাফসেঞ্চুরি এই একটিই। আর বোলিংয়ে ৬ টেস্টে ১৫ উইকেট, ৫ উইকেট একবার।

তাতে কী? তিনি যে সাকিব আল হাসান! বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। টিম বাংলাদেশের সেরা অলরাউন্ডার, সেরা পারফরমার। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরও সফলতম পারফরমার।

টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ দরজায় কড়া নাড়ছে। রাত পোহালেই ভারতের ইন্দোরের হলকার স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্ট। ম্যাচ শুরুর সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশ ভক্ত ও সমর্থকদের মনে দুটি প্রশ্ন ততই জোরালো হচ্ছে। প্রথম প্রশ্ন, কী করবে টাইগাররা? বিরাট কোহলির নেতৃত্বে পুরোশক্তির ভারতের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারবে মুমিনুল হকের দল?

দ্বিতীয় প্রশ্ন, সাকিব আল হাসানের অভাব পূরণ হবে কী? টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে সাকিব ছাড়া নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে ওঠা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সাকিব ছাড়া টেস্ট সিরিজে পরাশক্তি ভারতের মুখোমুখি হওয়া যে অনেক কঠিন। ব্যাট ও বল হাতে তিন ফরম্যাটের সমান কার্যকর সাকিব যে টেস্টে আরও বেশি দরকারি পারফরমার।

তার ব্যাট ও বল যে দীর্ঘ পরিসরের ফরম্যাটে দলের সেরা সম্পদ। এমন এক অতি কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডার পারফরমারকে ছাড়া বাংলাদেশ যে ‘তবলা ছাড়া গান’। তবলা ছাড়া উপমহাদেশীয় সঙ্গীত যেমন অচল, সাকিব ছাড়াও যে টেস্টে বাংলাদেশকে কল্পনা কঠিন।

তার অভাব পূরণ হবে কী? সাকিব কত বড় অলরাউন্ডার?- তা বিশ্ব জানে। প্রায় এক যুগ নামের পাশে কোন না কোন ফরম্যাটে আবার কখনো সব ফরম্যাটেই বিশ্ব সেরা অলরাউন্ডারের তকমা গায়ে। আর তিনি যে বাংলাদেশ দলের প্রাণভোমরা, চালিকাশক্তি- সেটাও প্রতিষ্ঠিত সত্য। সেটা নামে নয়। তার পারফরমেন্স আর পরিসংখ্যানই তা বলে দিচ্ছে।

বাড়তি কিছু ঘাটঘাটি করার দরকার নেই। টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের সেরা পারফরমারদের তালিকায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলেই বোঝা যাবে সাকিব কত ভালো পারফরমার।

আসুন এক পলক দেখে নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে টেস্টে রান তোলায় সাকিব তৃতীয় (৫৬ টেস্টে ৩৮৬২ রান। সেঞ্চুুরি ৫টি, হাফ সেঞ্চুুরি ২৪ টি)। তার ওপরে শুধু তামিম ইকবাল (৫৮ টেস্টে ৪৩২৭, সেঞ্চুুরি ৯টি, হাফ সেঞ্চুুরি ২৭টি) আর মুশফিকুর রহিম ৬৭ টেস্টে ৪০২৯ রান, ৬ সেঞ্চুরি ও ২৯ ফিফটি )।

ওয়ানডেতেও রান তোলায় তামিম শীর্ষে তামিম (২০৪ খেলায় ৬৮৯২ রান, শতক ১১ ও অর্ধশতক ৪৭)। দ্বিতীয় সাকিব ২০৬ খেলায় ৬৩২৩ রান, শতক ৯টি ও হাফ সেঞ্চুরি ৪৭টি। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে রান তোলায় সাকিব সবার ওপরে (৭৬ খেলায় ১৫৬৭)। তামিম (৭১ ম্যাচে ১৫৫৬), মাহমুদউল্লাহ (৮৩ খেলায় ১৪৩০) ও মুশফিক (৮৪ খেলায় ১২৬৫) তার পরে।

আর টেস্টে সর্বাশিক উইকেট শিকারী সাকিব (৫৬ টেস্টে ২১০ উইকেট)। ওয়ানডেতে মাশরাফির (২১৫ খেলায় ২৬৫) পরে দুই নম্বরে সাকিব (২০৬ ম্যাচে ২৬০) এবং টি-টোয়েন্টিতে ৭৬ খেলায় ৯২ উইকেট শিকার করে প্রথম সাকিব।

এমন আকাশছোয়া অলরাউন্ডিং পারফরমেন্স যার, দলে তার গুরুত্ব, প্রয়োজন ও কার্যকরিতা কতটা?- তা কি আর নতুন করে বলার ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে? নেই। সব ফরম্যাটেই সাকিব আসলে প্রধান হাতিয়ার। বাংলাদেশের শক্তির প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। কোন কোন ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি।

তারপরও টেস্টে সাকিবের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। বলতে পারেন, তিনি তো টি-টোয়েন্টি স্পেশালিস্ট। বিশ্বের প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি আসর নিয়মিত খেলেন। পারফরমার হিসেবেও বিশেষ সমাদৃত। তাকে ধরা হয় বিশ্বের অন্যতম সেরা টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডার। তা হলে টেস্টে তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বেশি কেন?

বেশি এই কারণে যে, টি-টোয়েন্টি ম্যাচের দৈর্ঘ্য খুব ছোট, ২০ ওভারের। সেখানে একজন বোলারের ৪ ওভারের বেশি হাত ঘোরানোর সুযোগ নেই। আর খুব ভালো ব্যাটিং করলেও ১২০ বলের ভিতরে ৬০-৭০ বলের বেশি ব্যাট করার সুযোগও কম। তাই বাড়তি কিছু করার অবকাশ ও ক্ষেত্রটাই সীমিত।

কিন্তু টেস্টে বিস্তর সুযোগ। একজন ব্যাটসম্যান ও বোলার উভয়েরই অনেক কিছু করার সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকে। একজন বোলার ৪ ওভার কেন, পারলে ৪০ ওভারও বল করতে পারেন। আর ব্যাটসম্যান একা ৫০-৬০ বলের বদলে দুদিন উইকেটে কাটালেও ক্ষতি নেই। কাজেই টেস্টের আয়ুষ্কাল বড়। বিশেষ কিছু করার ক্ষেত্রও অনেক বেশি। কাজেই সেখানে একজন পারফরমারের অনেক বেশি পারফরম করার এবং দলে অবদান রাখারও সুযোগ, সম্ভাবনা এবং ক্ষেত্র অনেক বেশি। ইতিহাস-পরিসংখ্যানও তাই বলছে।

একদিনের সীমিত ওভারের খেলায় সাফল্যের ক্ষেত্রে টিম পারফরমেন্সের প্রয়োজন অনেক বেশি। টেস্টে সেটা তুলনামূলক কম। একজন বা দুজন করে ব্যাটসম্যান-বোলারই দলকে টেনে নিয়ে যেতে পারেন। সেখানে বেশি ভাল খেলে দীর্ঘ ইনিংস উপহার দিয়ে সেঞ্চুুরি, ডাবল-ট্রিপল সেঞ্চুুরি হাঁকিয়ে আর আর লম্বা লম্বা স্পেলে বল করে বেশি-বেশি উইকেট শিকার করে দলকে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

ইতিহাসে এমন নজির আছে ভুুরি ভুরি। দুই ব্যাটসম্যান মাহেলা জয়বর্ধনে, কুমারা সাঙ্গাকারা আর অফস্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন-পেসার চামিন্দা ভাস মিলে শ্রীলঙ্কাকে টেস্টে বিশ্বমানের দলে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

একইভাবে সাকিব বল ও ব্যাট হাতে সমান নৈপুণ্য দেখিয়ে টেস্টে বাংলাদেশকেও গত প্রায় এক যুগ ধরে টেনে নিয়ে চলেছেন। টেস্টে বাংলাদেশের যত বড় সাফল্য, তার প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ ভাগেরই রুপকার সাকিব। কখনো বল হাতে, আবার কোনো সময় ব্যাটিংয়ে। বাংলাদেশের টেস্ট জয় সিরিজ বিজয় মানেই সাকিবময় সাফল্য।

কী নেই তার? সেঞ্চুরি, ডাবল সেঞ্চুুরি দুই'ই আছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তামিম আর মুশফিক ছাড়া যে কৃতিত্ব নেই আর কোনো টাইগার ব্যাটসম্যানের। সর্বাধিক উইকেট শিকারীই শুধুৃ নয়, এখন পর্যন্ত টেস্টে ১৮ বার সাকিব ৫ বা তার বেশি উইকেট শিকারি। দুইবার ম্যাচে ১০ বা ততোধিক উইকেট পেয়েছেন।

একজন অলরাউন্ডার পারফরমারের টেস্টে যা কিছু করার আছে, সাকিব এরই মধ্যে তা দেখিয়ে নিজেকে ইয়ান বোথাম, ইমরান খান, কপিল দেবের সারিতে নিয়ে গেছেন। একই টেস্টে সেঞ্চুুরি আর উভয় ইনিংসে ৫ বা তার বেশি উইকেট নিয়ে ম্যাচে ১০ উইকেট শিকারের বিরল কৃতিত্বটাও রয়েছে তার। কাজেই টেস্টে খুব ভাল মানের পারফরমার মানে সাকিবের মত অতি কার্যকর অলরাউন্ডার হতে পারেন বোলিং ও ব্যাটিংয়ের ‘তুরুপের তাস’।

এ ফরম্যাটে সাকিবের বোলিংটা অনেক বেশি দরকারি। প্রতিপক্ষকে অলআউট করতে হলে এক বা দুইজন অতি কার্যকর বোলার খুব প্রয়োজন। সেই কাজে সাকিবের চেয়ে কার্যকর তো প্রশ্নই আসে না, সাকিবের ৬০ শতাংশ মানের কার্যকর বোলারও নেই বাংলাদেশে।

কাজেই ভারতের সঙ্গে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে সাকিবকে অনেক বেশি মিস করবে বাংলাদেশ। সত্যি কথা বলতে, ভারতের বোলারদের বারুদ মাখা বোলিংয়ের বিপক্ষে শুধু টেকনিক, ধৈর্য্য, মনোযোগ আর মনোসংযোগই যথেষ্ঠ নয়। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা আর বুক ভরা সাহস, যা আছে সাকিবের।

ক্লোজ ইন ফিল্ডাররা যখন স্লিপ, গালি, সিলি পয়েন্ট, সিলি মিড অফ আর ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ছাতার মত ঘিরে রাখবে- ঐ সময় ব্যাটিং টেকনিক আর টেম্পরমেন্টের চেয়ে প্রচন্ড মনোবলই হয় সব থেকে বড় সহায়। সেটা বাংলাদেশে সাকিবের চেয়ে ভাল আর বেশি নেই কারো। প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের নানা ধরনের ফাঁদে ফেলে আউট করার কৌশলটাও তারই সবচেয়ে ভাল জানা। কখনো টেনে, কোনো সময় সোজা ডেলিভারি ছুড়ে, আবার কখনোবা ফ্লাইটে বৈচিত্র আনার পাশাপাশি বাড়তি টার্ন দিয়ে উইকেট দখল করা যাবে- তার চেয়ে ভাল জানা নেই কারোই।

ফলে ভারতের ক্ষুরধার পেস আর স্পিন ঘূর্ণির বিপক্ষে সাহসী ও প্রচন্ড মানসিক দৃঢ়তাসম্পন্ন ব্যাটসম্যান সাকিব এবং বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, চেতেশ্বর পুজারার মত ঝানু উইলোবাজদের বিপক্ষে অভিজ্ঞ ও দক্ষ স্পিনার সাকিবকে যে খুব বেশি মনে পড়বে।


খেলাধুলা এর সর্বশেষ খবর

খেলাধুলা - এর সব খবর