ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বন্দুক ঠেকিয়ে নিজেকে গুলি করতে চান এই বাবা ভিডিওসহ

২০১৯ নভেম্বর ০৫ ১৮:৪৯:০৫
বন্দুক ঠেকিয়ে নিজেকে গুলি করতে চান এই বাবা ভিডিওসহ

‘একমাত্র ছেলের চোখ যায় যায় অবস্থা। ছেলের পেছনে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে কাজ বন্ধ। হাতে টাকা নেই, ভিটেমাটি বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিলাম তাও শেষ। সাতদিন ধরে ঠিকমতো খেতে পারি না। ছেলের চিকিৎসা হলেও শান্তি পেতাম। কথায় কথায় নার্সরা রাগারাগি করে, বিরক্ত হয়। সবমিলে আর নিতে পারছি না। বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে।’

মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের দোতলার সিঁড়ির সামনে এভাবেই ক্ষোভ-দুঃখ প্রকাশ করছিলেন রূপনগরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ মোস্তাকিমের (৭) বাবা মফিজুর রহমান (২৬)। পাশেই কাচের ঘরের ভেতরে (এইচডিইউ ইউনিট) চিকিৎসাধীন মোস্তাকিম। গত সাতদিন থেকে এখানেই রয়েছে সে।

গত ৩০ অক্টোবর রূপনগরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মোস্তাকিমের ডান চোখে ও ঘাড়ে কাঠের টুকরা ঢুকে যায়। এছাড়া শরীরের ২৫ শতাংশ অংশ পুড়ে গেছে তার। ডান চোখের দৃষ্টি থাকা না থাকা নিয়ে এখনও সংশয়ে চিকিৎসকরা।

মোস্তাকিমের বাবা মফিজুর রহমান বলেন, ‘ডিউটিতে মাত্র একবার আসেন ডাক্তার। এসে ওষুধ বলে দেন, আর আমরা নিয়ে আসি। একটা স্যালাইনও দেয় না। সব কিনে আনতে হয়। ডাক্তাররা মলম লিখে দেন, দিনে ৪ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকার মলম কিনতে হয়। আমার জন্ম নেয়াটাই ভুল হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর ঢাকা মেডিকেলে এলে দালাল এখান থেকে আগারগাঁওয়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে শ্যামলী, কখনও চক্ষু হাসপাতাল, কখনও শান্তিনগর, আমি একা মানুষ তিনটা হাসপাতালে ঘুরেছি। সর্বশেষ একটি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে ঢাকা মেডিকেলে আসি।’

তিনি বলেন, ‘শুক্রবার এখানে আসার পরপরই ডাক্তার আমাকে অনেক ওষুধ লিখে দেন। এরপর আমার ফরিদপুরের বাসার একটি ঘর বিক্রি করে বিকাশে ৬২ হাজার টাকা নিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাই। এখন সবই শেষ। ডাক্তাররা ভালোভাবে ট্রিটমেন্ট করছেন না, বাচ্চাটাকে ভালোভাবে দেখছেন না। এখন স্যার আমি কী করবো, আমি আর পারছি না। আমার জীবনের আর কিছু নাই, আমার মা নাই বাবা নাই, কেউ সহযোগিতা করার নাই। এখন আমি কি করবো ভাই। যদি একটা পিস্তল পাইতাম তাহলে নিজের মাথায় নিজে গুলি করে মরে যেতাম।’

‘পাঁচ থেকে সাতদিন ধরে টাকার জন্য খাবার খেতে পারি নাই। এখন কীভাবে খাবো, কীভাবে বাঁচবো স্যার। আমার শরীরেই কোনো শক্তি নাই। এখন আমি কী করবো বুঝে পাচ্ছি না স্যার,’ কাঁদতে কাঁদতে বলেন মফিজুর রহমান।

গরিব রোগীদের সাহায্যের জন্য ঢামেকের সমাজকল্যাণ কার্যালয় থেকে আর্থিক সাহায্যের জন্য একটি আবেদনপত্র দিয়ে গেছে অধিদফতরের কর্মীরা। সেই আবেদনপত্র মোস্তাকিমের বাবা গতকাল পূরণ করলেও এতে হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার, সিনিয়র স্টাফ নার্স অথবা ডাক্তারের স্বাক্ষর লাগে। তবে এই আবেদনপত্রেও স্বাক্ষর নেয়ার জন্য দুদিন ধরে ঘুরছেন মফিজুর। ডাক্তার নার্স কেউই স্বাক্ষর দিচ্ছেন না।

মফিজুর রহমান বলেন, ‘ফর্মটি গতকাল দিয়ে কয়েকবার জমা নিতে এসেছে। কিন্তু নার্সরা এতে স্বাক্ষর দিচ্ছে না। আমি নার্স ও ডাক্তারের কাছে স্বাক্ষর চাইলে একজন আমাকে বলেছে, ‘তোমাগো লেগা কি বইস্যা থাকি নাকি?’ পূরণ করে বসে আছি, কেউ স্বাক্ষর দেয় না। আমাদের এখানে কোনো লোকজন নাই, লোকজন থাকলে ঠিকই স্বাক্ষর করতাম। গত ৭-৮ দিন হয়ে গেছে এখনও বাবুটার (মোস্তাকিম) চোখ ভালো মতো দেখে নাই ডাক্তাররা। আর কী বলবো?’

এ বিষয়ে ঢামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এমন তো হওয়ার কথা নয়। স্বাক্ষর না দেয়ার কথা নয়। আমার ওখানে অনেক লোক আছে কেউ তো কিছু বলেনি। আমি খোঁজ নিচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সে (মফিজুর রহমান) বলেছে অনেক টাকার ওষুধ কিনেছে, আমার তা মনে হয় না। বার্নের মলমের অতো দাম না।’

মফিজুরের হাতে থাকা রসিদগুলোতে দেখা যায়, গত ৩১ অক্টোবর তাকে ১৭০৩ টাকা, একই দিন ৪২৮৫ টাকা, ১৫২০ টাকার ওষুধ আনতে দেয় ঢামেক কর্তৃপক্ষ। কয়েকজন রোগী জানিয়েছেন, এসব ওষুধ ঢামেকে থাকলেও এগুলো দেয়া না দেয়া নার্সদের ওপর নির্ভর করে। এছাড়া এ পর্যন্ত ৪২০০ টাকা দিয়ে চার ব্যাগ প্লাজমাও কিনতে হয়েছে। সব মিলিয়ে হাত একেবারেই খালি হয়ে গেছে মফিজুরের।

তিনি আরও বলেন, ‘টাকা আমি জীবন দিয়ে হলেও জোগাড়ের চেষ্টা করছি। তবুও ছেলেটা ভালো ট্রিটমেন্ট পেলে শান্তি পেতাম। ছেলের সেবায় থাকা অধিকাংশ নার্সই ট্রেনিং নেয়। তাদের কাছে কোনো সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করলে ‘ছ্যাঁত’ করে ওঠে। তাদের ডাকলে চিৎকার করে বলে, ‘এতো ঘন ঘন ডাকতে হয় কেন?’ মুখ বন্ধ রাখি, তাও যদি ছেলেটার চিকিৎসা হয়। কিন্তু সবমিলে খুবই হতাশ লাগছে। মরে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে।’

মফিজুর রহমানের বাড়ি ফরিদপুরের সালথা উপজেলার থানার সোনাপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে। আট বছর বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের এক বছর পর জন্ম নেয় মোস্তাকিম। স্ত্রী সন্তানকে রেখে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। গত আড়াই মাস আগে তাদের ঢাকায় এনে রূপনগরের শিয়ালবাড়ি বস্তিতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে ওঠেন তিনি।

রূপনগরের মোনা প্লাস্টিক নামে একটি বোতল তৈরির কারখানায় ৭ হাজার ৩০০ টাকা মাসিক বেতনে চাকরি করতেন মফিজুর। ফরিদপুরে তার বাড়িতে দুটি টিনের ঘর ছিল। একটি থাকার, আরেকটিতে ছিল ঢেঁকি। ছেলের ওষুধ কিনতে শুক্রবার ৬২ হাজার টাকায় থাকার ঘরটি বিক্রি করেন মফিজুর। ভাইয়ের কাছ থেকে বিকাশে টাকা নেন। পাশাপাশি পুলিশের একজন এসপি এবং এক অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে ১১ হাজার টাকা সাহায্য করেন। তবে বর্তমানে কোনোভাবেই ছেলের ওষুধপত্র কিনতে পারছেন না তিনি।

মোস্তাকিম ঢামেক বার্ন ইউনিটের দ্বিতীয় তলার এইচডিইউতে ভর্তি। বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন মোস্তাকিমের শরীর ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। চোখটি ব্যান্ডেজ করা থাকলেও এর দৃষ্টির বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করেনি ঢামেক কর্তৃপক্ষ।

মোস্তাকিম ছাড়াও ঢামেকে আরও ছয়জন চিকিৎসাধীন। তারা হলেন- গ্যাস বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদ (২৯), মিজান (৬), স্থানীয় বাসিন্দা ও রিক্সাচালক জুয়েল (২৫), জান্নাত (২৫), জনি (১০) এবং সিয়াম (১১)।

তাদের মধ্যে ঢামেকের অর্থোপেডিক্স বিভাগের ১০১ নম্বর ওয়ার্ডে পুলিশের হেফাজতে চিকিৎসা চলছে আবু সাঈদের। বিস্ফোরণে তার ডান হাতের আঙুল থেঁতলে গেছে, পেট ঝলসে গেছে, পায়েও আঘাত রয়েছে। তার বেডে সার্বক্ষণিক একজন পুলিশ থাকে।

একই ওয়ার্ডের ১২ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে রিকশাচালক জুয়েল। গত ৬ দিন মাটিতে শুয়ে চিকিৎসা নেয়ার পর গতকাল সোমবার তাকে বেড দেয়া হয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে জুয়েলের হাত ভেঙে হার গুঁড়ো হয়ে গেছে। মঙ্গলবার দুপুরে তার অপারেশন শুরু হয়েছে।

ছেলের চিকিৎসার বিষয়ে জুয়েলের মা জুলেখা বলেন, ‘এতদিন যা হয়েছে হোক কিন্তু এখন আমাদের বড়ই টাকার প্রয়োজন। প্রথমে একজন এসে চিকিৎসার জন্য ৫ হাজার টাকা দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে আর কেউ কোনো সাহায্য দেয়নি। ছেলে দিন আনে দিন খায়, তার রিকশা চালানো বন্ধ। টাকা না থাকলে ওষুধ কিনতে পারবো না। আমাদের সাহায্য দরকার, দয়া করে সাহায্য করুন।’

ঢামেকের সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন জান্নাতের ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে তার দেহের বিভিন্ন স্থানে হালকা-মাঝারি আঘাত লেগেছে।

বিস্ফোরণে চিকিৎসাধীন জনির মুখ ও দাঁতের মাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলে আনার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে নেয়া হয়েছিল ঢাকা ডেন্টাল কলেজে। সেখান থেকে চিকিৎসা শেষে আবার ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়।

জনির চিকিৎসার বিষয়ে তার বাবা সুলতান বলেন, এতদিন এখানে চিকিৎসা করে আগামীকাল চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললো। এরপর আবার মিরপুর ১৪ নম্বরের ঢাকা ডেন্টাল কলেজে নিয়ে যেতে বলেছে। আমরা গরিব বলে এখানে তেমন চিকিৎসা পাচ্ছি না। নার্সদের ডাকলে আসে না, রাগ দেখায়, বিরক্ত হয়। ডাক্তার আসে, দেখে যায়। একটার বেশি আরেকটা কথা বলা যায় না, বিরক্ত হয়।’

চিকিৎসক নার্সদের অবহেলা ও প্রাপ্য সেবা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢামেক পরিচালক বলেন, ‘একজন রোগী আসলে আমরা তাকে ভর্তি করি, বেড দেই, চিকিৎসা ও ওষুধ দেই। এটাই হচ্ছে প্রোসেস। যারা আছে সবাইকে একই প্রক্রিয়ায় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যিনি মাটিতে চিকিৎসা পেয়েছেন, নিশ্চয়ই তার চেয়ে গুরুতর কেউ বেডে চিকিৎসা নিয়েছে এমনটা ধরে নিতে হবে। আমরা তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিচ্ছি।’

গত ৩০ অক্টোবর রূপনগরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ৭ জন নিহত হয়েছে। আহত ও দগ্ধ হয়েছে কমপক্ষে ২৫ জন। বর্তমানে ৭ জন ঢামেকে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

সিলিন্ডার বিস্ফোরণের সময় হতাহতের ঘটনায় গ্যাস বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদকে (৩০) প্রধান আসামি করে বিস্ফোরক আইনে মামলা করেছে পুলিশ।


জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর