ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

চলচ্চিত্রে সমিতির প্রয়োজন আছে কি,তা নিয়ে অভিনেতাদের মধ্যে চরম বিতর্ক

২০১৯ অক্টোবর ২০ ১৮:১৪:১৫
চলচ্চিত্রে সমিতির প্রয়োজন আছে কি,তা নিয়ে অভিনেতাদের মধ্যে চরম বিতর্ক

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস দীর্ঘ ও গৌরবের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চলচ্চিত্র ভালোবাসতেন বলে ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল উত্থাপিত বিলের মাধ্যমে পূর্বপাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি)প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন সময় চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পীসহ অন্যান্য কলাকুশলীরা সমিতি, সংগঠন গঠন করেন। এখনও চলছে এসব সংগঠনের কার্যক্রম। চলচ্চিত্রের স্বার্থে বিভিন্ন সময় সেই সংগঠনের ব্যানারে তাদের রাজপথেও নামতে দেখা গেছে।

এই মুহূর্তে দেশীয় চলচ্চিত্র মন্দা সময় পার করছে। সিনেমা নির্মাণের সংখ্যা দিনদিন কমে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে প্রেক্ষাগৃহগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন পরই চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে রয়েছে নানান অভিযোগ। অনেকেই আঙুল তুলছেন সংগঠনগুলোর দিকে। তাদের ভাষ্য- ‘সিনেমা নেই, সংগঠন নিয়ে বেশি ব্যস্ত চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা’। আবার কেউ বলছেন, ‘সিনেমা নেই সংগঠন দিয়ে কী হবে?’।

প্রশ্ন উঠেছে- চলচ্চিত্রের স্বার্থে এই সংগঠনগুলো কতটা প্রয়োজনীয়? নাকি শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য সমিতির ব্যবহার? এসব প্রশ্নের উত্তর চলচ্চিত্রের কয়েকটি সংগঠনের নেতা ও সংশ্লিষ্ট গুণীজনদের কাছে জানতে চাওয়া হয়।

অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক সোহেল রানা বলেন, ‘চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পীসহ সবার স্বার্থ রক্ষা করতে সংগঠন দরকার। প্রত্যেক সংগঠন তাদের সদস্যদের স্বার্থে কাজ করবে। কিন্তু সমষ্টিগতভাবে এই সংগঠনগুলো চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে কাজ করবে। সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা নেই- এটা বললে ভুল হবে। অবশ্যই প্রয়োজন আছে। এ কারণেই এসব সংগঠন করা হয়েছে।’

নির্মাতা সোহানুর রহমান সোহান বলেন, ‘নির্বাচনে যখন দুটি পক্ষ থাকবে তখন এটা হবেই। তবে এর আগে পরিচালক সমিতির নির্বাচনের দিন দেখেছি সুন্দর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। আমাদের নির্বাচন থেকে সবার শেখা উচিত। আমার বিশ্বাস এবার সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশে নির্বাচন হবে। সাধারণ মানুষের কাছে শিল্পীদের যে সম্মান সেটা যেন বজায় থাকে।’
চিত্রনায়ক রুবেল বলেন, ‘শিল্পী সমিতি শিল্পীদের সমন্বয় করবে। আমরা নোংরামির মধ্যে যাব না। কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করব না। কারো মন্দ দিক তুলে ধরব না।

সব সময় চেষ্টা করব ভালো দিক তুলে ধরার। সে আমার বিপরীত প্রার্থী হলেও তাকে আঘাত করে কথা বলা যাবে না। কেউ যদি কারো স্বার্থে আঘাত করে কথা বলে তাদের অনুরোধ করব এগুলো থেকে বিরত থাকতে। শিল্পীদের সম্মান অন্যদের চেয়ে আলাদা। এই সম্মান ভালোবাসা ধরে রাখতে হবে। আমরা নিজেরাই যদি কাদা ছোড়াছুড়ি করি তাহলে জনগণের কাছে আমাদের যে শ্রদ্ধা ভালোবাসা আছে সেটি থাকবে না। নির্বাচনে ছোটখাটো ভুল হতে পারে কিন্তু তার একটা সীমা থাকতে হবে। সীমা লঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ্‌তালাও পছন্দ করেন না। কথাটি সবার মনে রাখতে হবে। বিপরীত দল নিয়ে কেউ কোনও রকম আঘাত দিয়ে মন্তব্য করবেন না। ভোটাররা তাদের যোগ্য প্রার্থী বেছে নিবে।’
চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন বলেন, ‘সংগঠনের নির্বাচন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিবে। আমরা সমিতির স্বার্থে কাজ করি। আমার বিশ্বাস শিল্পী সমিতিতে যারা নির্বাচিত হবেন তারাও সমিতির স্বার্থে কাজ করবেন।’

চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম বলেন, ‘কিছুদিন আগে পরিচালক সমিতির নির্বাচন গেছে। তার কিছুদিন পর প্রযোজক সমিতির নির্বাচন হয়েছে। এই দুটি নির্বাচনে কেউ কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে এনজয় করেছি। হারজিৎ থাকবেই। চলচ্চিত্রের মানুষ হিসেবে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আশা করি না। শিল্পীদের মন উদার, শিল্পীরা ফুলের মতো। আমি নিজেও শিল্পী সমিতির সদস্য। এবার আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান। আমার দায়িত্ব থেকে বলছি, এরকম কাদা ছোড়াছুড়ি ঠিক না। ২৫ তারিখ পর্যন্ত নির্বাচন। তারপর আমরা সবাই এক। আজকে একটা কিছু হলেই সেটি মিডিয়ায় প্রচার হয়। এরপর মানুষ যে মন্তব্য করে সেটি শুধু শিল্পীদের জন্য না, চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য অসম্মানজনক। যারা শিল্পী সমিতির প্রার্থী আছেন তাদের অনুরোধ করব সবার সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করবেন। ভোটাররা অনেক সচেতন। তারা যোগ্য নেতাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন।

তিনি আরও বলেন, একটি সমিতির জন্য নির্বাচন দরকার। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই পারবেন সিনেমা নির্মাণ করতে। চলচ্চিত্রে যে সমস্যা রয়েছে সেগুলোর সমাধান করতে। প্রতিটি সমিতিতে তিন থেকে চারশ সদস্য রয়েছে। তারা একসাথে সবাই কথা বলতে পারবে না। তাদের কথা বলার জন্য একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি লাগবে। একটা প্লাটফর্ম লাগবে। যারা নির্বাচিত হবেন তাদের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রের উন্নয়ন হবে। সিনেমার খবর নেই- কথাটি ঠিক না। সিনেমার খবর অবশ্যই আছে। এখনও অনেক ছবি হচ্ছে। যারা নির্বাচিত হবেন তাদের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে উন্নয়ন হবে। তাদের একটাই লক্ষ্য থাকবে যেন সিনেমার উন্নয়ন হয়।’

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির দুইবারের সভাপতি শাকিব খান বলেন, ‘শিল্পীকে বাঁচতে হলে কাজ দরকার। ইন্ডাস্ট্রিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সিনেমা দরকার। তাই সমিতি দিয়ে চলচ্চিত্র শিল্প টিকে থাকবে না। সিনেমার কাজ নিয়ে ভাবতে হবে। মানসম্মত কাজ দিয়ে দর্শকের মন জয় করতে হবে।’

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর বলেন, ‘যেদিন থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম নির্বাচন করব বা আমাকে যারা নির্বাচন করার জন্য উৎসাহ দিয়েছে, সেদিন থেকে শুধু চিন্তা সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন শেষ করার। কাউকে আঘাত দেয়ার মতো একটি বাক্য কখনো ব্যবহার করিনি। আমি মনেপ্রাণে চাই সুন্দর নির্বাচন হোক। যারা সেবা দিতে আসবে তারা যেন সুন্দরভাবে সমিতি পরিচালনা করে। আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো না। সেই জায়গা থেকে এটি মাথায় রেখে যেন সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচন হয়। সম্মানিত সদস্যদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সমিতি নির্বাচনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এর ছোট একটি উদাহরণ দেই। দেশে একটি অনিয়ম ছিল যৌথ প্রযোজনার নামে যৌথ প্রতারণা। সেটা বর্তমান রানিং কমিটি রাজপথে আন্দোলন করে বন্ধ করেছে। যদি কোনও সংগঠন না থাকে এ দেশে তাহলে নিয়মনীতি থাকবে না। একটি পরিবারের জন্য সমিতি গুরুত্বপূর্ণ। সমিতির স্বার্থে কাজ করায় হল মালিকরা আমাকে ছয় মাস নিষিদ্ধ করেছিল। তবে একটি কথাই বলব সমিতির গুরুত্ব অপরিহার্য।’

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান বলেন, ‘গত নির্বাচন সুষ্ঠু হবার পরও অনেক কথা হয়েছিল। আমরা সব সময় শান্তিপূর্ণ নিবার্চন চাই। শিল্পী সমিতি অরাজনৈতিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। সমিতি শিল্পীদের একটি মিলন মেলা। অনুরোধ করছি বহিরাগতদের এফডিসিতে এনে শিল্পীদের সম্মান নষ্ট করবেন না। সবাই একটি পরিবার।

সিনেমা নেই, নির্বাচন নিয়ে মাতামাতি যারা বলছেন- তাদেরও সংগঠন আছে। তাহলে বলতে পারি, তাদের সংগঠনের দরকার কী! সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। যারা এসব বলছেন তারা চায় না আমাদের সিনেমার অবস্থা ভালো হোক। তারা ভিনদেশী শিল্পীদের ছবির গুরুত্ব বেশি দিচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের রাজ্জাক, ফারুক, আলমগীর সাহেবের মতো গুণী শিল্পীদের গুরুত্ব তাদের কাছে কম। এসব কথার তীব্র প্রতিবাদ জানাই।


ঢালিউড এর সর্বশেষ খবর

ঢালিউড - এর সব খবর